আলিপুরদুয়ারের আদিবাসী অধ্যুষিত পানিঝোড়া : বাংলার প্রথম বইগ্রাম

কমাত্র শিক্ষাই পারে তমসা ঘুচিয়ে দিতে। অদম্য সংগ্রামের প্রতীক নেলসন ম্যান্ডেলার কথা ধার করে বলতে হয়, শিক্ষা হল এমন এক হাতিয়ার যার সাহায্যে পৃথিবীকে পাল্টে ফেলা সম্ভব। এমনই এক বদলে দেওয়ার ব্রত নিয়েছে ‘আপনকথা’ নামের একটি সংগঠন। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সহযোগিতা করছে আলিপুরদুয়ার জেলা প্রশাসন। কর্মযজ্ঞ চলছে পানিঝোড়ায়।

রাভাভাতখাওয়ার পানিঝোড়া-ই সম্ভবত বাংলার প্রথম বইগ্রাম (First Book Village in Bengal)। মহারাষ্ট্রের ভিলার ও কেরলের পেরুকালেমের পর পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার পানিঝোড়ায় তৈরি হয়েছে বইগ্রাম (Panijhora Book Village), বাংলায় প্রথম তথা ভারতের তৃতীয় বইগ্রাম এটি। বইকে ঘিরে আশায় বুক বাঁধছে গোটা পানিঝোড়া।

মহারাষ্ট্রের ভিলার ও কেরলের পেরুকালেমের পর পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার পানিঝোড়ায় তৈরি হয়েছে বইগ্রাম, বাংলায় প্রথম তথা ভারতের তৃতীয় বইগ্রাম এটি।

বইগ্রামের সম্পাদক পার্থ সাহা বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “ভারতের যে দুটি বইগ্রাম রয়েছে, তারা কমিউনিটি লাইব্রেরি নির্ভর। সেখানকার বইগ্রামের উদ্দেশ্য আলাদা আর বাংলার বইগ্রামের উদ্দেশ্য আলাদা।” পার্থ দমনপুর হাই স্কুলের শিক্ষক। পার্থই সতীর্থদের কথা জানালেন, ‘আপনকথা’ সংগঠনের সভাপতি লোক সংস্কৃতি গবেষক ও লেখক মঙ্গলত্ন প্রমথনাথ, পানিঝোড়া গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জিত বর্মন বইগ্রাম গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। গ্রামবাসীদের মধ্যে পারুল মিনজ, শিবানী টোপ্পো, ফ্রান্সিস টোপ্পো, রুনা নার্জিনারিরা এগিয়ে এসেছেন। আলিপুরদুয়ার ও জেলার বাইরের মানুষ নানাভাবে সাহায্য করেছেন। আলিপুরদুয়ার জেলা প্রশাসন ও জেলাশাসক আর বিমলার তরফেও মিলেছে সহযোগিতা। পশ্চিমবঙ্গে আলিপুরদুয়ার জেলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আলিপুরদুয়ারের উত্তর মেন্দাবাড়িতে ছড়িয়ে রয়েছে রাভাদের ঐতিহ্যবাহী তাঁত ও অন্যান্য। এখন সাড়া জাগানো এই বইগ্রাম নিয়ে গ্রামবাসীদের মনে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে।

প্রায় তিন বছরের পরিশ্রম সফলতার মুখ দেখেছে ২০২৪ সালের অগাস্টে। অনুষ্ঠানিকভাবে বইগ্রামের উদ্বোধন হয়েছে ২০২৪ সালের ৩১ অগাস্ট। পার্থ জানালেন, “কাজ চলছিল প্রায় তিন বছর ধরে। যখন পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলে বদলি হয়ে আসি, তখন দেখি শুধু পানিঝোড়াতেই স্কুলছুট পড়ুয়ার সংখ্যা সতেরো জন। তাদের ফের স্কুলমুখী করতে গিয়ে কাজ শুরু হয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের সমস্যা শোনার চেষ্টা করি। আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় আমরা ছোটো ছোটো পনেরোটা কর্ণার লাইব্রেরি তৈরি করি। তারপর শুরু হল ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি। আমার নিজের গাড়িকে ভ্রাম্যমান লাইব্রেরিতে পরিণত করি। আমাদের সংগঠন রয়েছে ‘আপনকথা’। আপনকথা সংগঠনের পক্ষ থেকে পনেরো দিন পর পর আমরা ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি নিয়ে গ্রামে যেতাম। ওরা বই নিত। এই লাইব্রেরির কর্মসূচির নাম ‘আলোকবর্তিকা’। পরবর্তীকালে বইগ্রাম তৈরি হল। এখন বইগ্রামে আরও পনেরোটা ছোটো লাইব্রেরি রয়েছে। বাড়িতে বাড়িতে ছোটো লাইব্রেরি রয়েছে। একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার তৈরি হয়েছে। তাতে তিনটি আলমারি আছে, একটিতে রয়েছে গ্রামের বাচ্চাদের বিভিন্ন ক্লাসের ‘রেফারেন্স’ বই (অ্যাকাডেমিক বই)। অন্য দুটিতে আছে যথাক্রমে চাকরির পরীক্ষার বই ও অবসর বিনোদনের জন্য নন-ফিকশন, ফিকশন বই।”

গ্রামে এখন পড়ুয়ার সংখ্যা ৬৫-৭০ জন। তারা বিভিন্ন ক্লাসে পড়ে। আলিপুরদুয়ার জেলা পুলিশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিনামূল্যে কোচিং চালু করার কথাও ভাবা হচ্ছে। আপাতত পানিঝোড়া বইগ্রামকে পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে নেওয়া হয়েছে।

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ঘন জঙ্গলের মধ্যে থাকা পানিঝোড়া, আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম। আটটি জনজাতির মানুষ থাকেন সেখানে। অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয় এবং আর্য, ভারতের চার বংশের মানুষই থাকেন পানিঝোড়ায়। পানিঝোড়ার নৃতাত্ত্বিক গুরুত্ব অপরিসীম। সেখানে বইয়ের দোকান তো দূরস্থ, কোনও দোকানই নেই। পার্থড় কথায় বইগ্রামের মূল উদ্দেশ্য, “ওরা (পড়ুয়ারা) বইটা দেখুক। বিভিন্ন রকম বই দেখে বড়ো হোক। তার জন্যেই কমিউনিটি লাইব্রেরি গড়ে তোলা।”

গ্রামের সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষ প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া (ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার), এদের শিক্ষামুখী করা ও বইমুখী করাই বইগ্রামের উদ্দেশ্য বলে জানা যায়। কারণ এই অঞ্চলের বাচ্চারা একটু পড়াশোনা করার পরই বিভিন্ন রকম কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। কেউ দোকানে কাজ করতে ঢুকে পড়ে, কেউ কেউ শ্রমিক হিসাবে অন্যত্র কাজ করতে চলে যায়। এটাকে আটকে, তাদের বইমুখী করা বইগ্রামের মূল লক্ষ্য। যাতে তারা শ্রমিকে পরিণত না হয় বা পাচার না হয়ে যায়। মানবপাচার রোখার চেষ্টাও করছে বইগ্রাম।

নানান কর্মসূচি রয়েছে বইগ্রামের। ফি রবিবার পড়ুয়াদের নিয়ে বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। পার্থবাবুরা যার নাম দিয়েছেন ‘মজার মুলুক’। যে, যা বই পড়ল তা নিয়ে খেলার ছলে, মজার ছলে আলোচনা হয় মজার মুলুকে। কোন বই পড়া হল, বইয়ের কোনটা ভালো লেগেছে এসব নিয়েই কথা বলে পড়ুয়ারা। পার্থ বলছিলেন, “ওরা আসে গল্প করে। নিজের মতো গল্প বলে। ওরা গল্প তৈরি করে। ছবি আঁকে। কেউ আঁকতে পারলে আমরাই রং পেন্সিল দিয়ে দিই। পাশাপাশি রয়েছে কম্পিউটার শেখার ক্লাস, স্পোকেন ইংলিশের ক্লাস। স্বাধীনতার এত বছর পর বইগ্রামের উদ্যোগের মাধ্যমে পানিঝোড়ায় কম্পিউটার এসেছে। খেলাধুলো ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আছে। এগুলোর প্রতি আগ্রহ তৈরি এবং ওদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্যে যাবতীয় কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।”

গ্রামে এখন পড়ুয়ার সংখ্যা ৬৫-৭০ জন। তারা বিভিন্ন ক্লাসে পড়ে। আলিপুরদুয়ার জেলা পুলিশের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিনামূল্যে কোচিং চালু করার কথাও ভাবা হচ্ছে। আপাতত পানিঝোড়া বইগ্রামকে পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে নেওয়া হয়েছে। অন্তত এক বছর চলার পর দ্বিতীয় পদক্ষেপের চিন্তাভাবনা করবেন পার্থ ও তাঁর সতীর্থরা।

পানিঝোড়ায় ৪৮ জন প্রবীণ মানুষ রয়েছেন, যাঁদের একেবারেই অক্ষরজ্ঞান নেই। তাঁদের অন্তত নিজেদের নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা লেখা শেখানোর লক্ষ্যে ব্রতী হয়েছেন পার্থবাবুরা। তাঁদের স্লেট দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই আট জন লেখা শিখেও ফেলেছেন। এই কাজে গ্রামের ২৬ জন স্বেচ্ছাসেবক আছে। যারা উঁচু ক্লাসে পড়ে, তারাই শিক্ষক হয়ে প্রবীণদের শেখাচ্ছে। জীবনের প্রান্তসীমায় এসে যাঁরা প্রথম নিজেদের নাম লিখতে শেখা; কুল বাহাদুর ছেত্রি, নিমলি মারাথ সহ এমন পাঁচজন প্রবীণ মানুষের হাতে বইগ্রামের উদ্বোধন হয়েছে। তাঁরা নিজেদের নাম লেখা স্লেট ধরে দাঁড়িয়ে বইগ্রামের শুভারম্ভ করেছেন।

একই সঙ্গে গোটা গ্রামকে সাজানো হচ্ছে। গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে বইকে কেন্দ্র করে স্লোগান লেখা হয়েছে। স্লোগান লেখার ক্ষেত্রে তিনটি ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, বাংলা, ইংরেজি ও (স্থানীয় ভাষা) সাদ্রি। কেবল বাড়ি নয়, বাড়ির সামনের দেওয়ালকে ব্যবহার করা হয়েছে স্লোগান লেখার জন্য। পাশাপাশি প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে বইকে ‘থিম’ হিসাবে বেছে নিয়ে ছবি আঁকা হয়েছে।

ইতিমধ্যে গ্রামজুড়ে ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। পার্থ আশাবাদী, পাঁচ বছর পর গোটা গ্রাম ফুলের গাছে ভর্তি হয়ে যাবে। গ্রামের প্রতিটা বাড়ির সামনে রয়েছে ডাস্টবিন। গ্রামবাসীরা এখন প্লাস্টিক ডাস্টবিনেই ফেলেন। সবুজ ও পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসাবে পানিঝোড়াকে গড়ে তোলা হচ্ছে। এই গ্রামের যুব সমাজ পুরোপুরি তামাক মুক্ত। আলিপুরদুয়ার প্রশাসন শীঘ্রই অনুষ্ঠানিকভাবে এই গ্রামকে তামাক মুক্ত গ্রাম হিসাবে ঘোষণা করতে চলছে। বইকে কেন্দ্র করে পর্যটন গড়ে উঠেছে। বইপ্রেমী মানুষেরা বিভিন্ন সময় আসছেন। চারটে হোম-স্টে রয়েছে পানিঝোড়ায়। গ্রামের মানুষেরা হোম-স্টেগুলো চালান।

কার্যত বইকে ঘিরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এক প্রান্তিক এলাকা। শিক্ষার আলো পৌঁছাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি, পরিবেশ সচেতনতার বার্তাও পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। পর্যটন ব্যবসা উজ্জীবত হচ্ছে। মানুষের অর্থের সংস্থান হচ্ছে। স্কুলছুট আর মানবপাচারের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসছে পানিঝোড়া। গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা; যারা শ্রমিকে পরিণত হত, তারা এখন বই তুলে নিচ্ছে হাতে। ইংরেজিতে কথা বলা শিখছে। নাচ, গান করছে, ছবি আঁকছে। এক কথায় শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটছে। সত্যি সত্যি এ যেন স্বপ্নউড়ানের রূপকথা।

Written by