পানিহাটির গোবিন্দ হোম : আজও অসহায় মেয়েদের আশ্রয় রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত হেরিটেজ বাড়িটি

ঙ্গা-তীরে একটি করে বাগানবাড়ি রাখা উনিশ-বিশ শতকের বিত্তবানদের ‘ট্রেন্ড’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তেমনই একটি বাগানবাড়ি ছিল পেনেটির গোবিন্দ হোম বা গোবিন্দ কুমার হোম। নিছক বাগানবাড়ি হিসেবেই এর পত্তন, কিন্তু সময়ের অদ্ভুত সমাপতনে এ বাড়ি আর অবসর যাপনের ঠিকানা পরিচয়ে আটকে নেই। ইতিহাস ভিড় করেছে এখানে। রাজ্যের হেরিটেজ তকমাও পেয়েছে বাড়িটি।

বাগানবাড়িটি ছিল উনিশ শতকের কলকাতার প্রখ্যাত ব্যাবসায়ী রামদুলাল দে সরকারের পুত্রদের। বাড়িটির নাম ছিল মোক্ষধাম। এই রামদুলালের ছেলেরাই কলকাতার ইতিহাসে ছাতুবাবু, লাটুবাবু নামে পরিচিত ছিলেন। তা সেই মোক্ষধাম গোবিন্দ হোম হল কী করে? এই গল্প শুনেছিলাম সোদপুর অঞ্চলের এক প্রবীণ নাগরিক তথা শিক্ষকের কাছে। তিনি আড়ালে থাকতে চান, তাই ওঁর কথার সম্মানার্থে নামটি দিচ্ছি না।

ওপার বাংলার ময়মনসিং জেলার শেরপুরের জমিদার গোবিন্দ কুমার চৌধুরী, ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮৬-তে মোক্ষধাম বাড়িটি কেনেন। গোবিন্দ কুমারের পুত্র, গোপাল দাস চৌধুরী ১৯২৮ সালের ২৯ মার্চ বাড়িটিতে দুস্থ মহিলাদের জন্য একটি আশ্রম গড়ে তোলেন। নাম দেন গোবিন্দ কুমার হোম। এখনও এখানে আবাসিকরা থাকেন। ২ ডিসেম্বর, ২০০৫-এ বাড়িটি হেরিটেজ তকমা পায়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে বাড়িটির সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে।

আমি যখন ক্ষেত্র-সমীক্ষার কাজে গিয়েছিলাম, শুরুতেই বাধা পাই। জানানো হয়, ‘এটা মেয়েদের আশ্রম। বিনা অনুমতিতে প্রবেশাধিকার নেই’, কথাগুলো যিনি বলেছিলেন তিনি সম্ভবত গোবিন্দ হোমের প্রহরী বা রক্ষী হবেন। যাওয়ার পথে অটোচালক বলেছিলেন, ‘ও গোবিন্দ হোম যাবেন? ওটা রবীন্দ্রনাথের বাড়ি।’ আম সোদপুর-পানিহাটিবাসীর কাছে বাড়িটি রবীন্দ্রনাথের বাড়ি বা বাগান বাড়ি হিসেবেই পরিচিত।

গোবিন্দ হোমের ভিতর রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ-মূর্তি

গোবিন্দ হোম নিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণা

কিন্তু, আদতে কী? কীভাবে এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন কবি?

রবি ঠাকুর, তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ ও ‘ছেলেবেলায়’ এই বাড়ির কথা লিখেছেন। এ বাড়িতে তিনি চারবার এসেছিলেন। জোড়াসাঁকোর বাইরে প্রথমবার, এ বাড়িতেই পা রেখেছিলেন। সেই অর্থে পেনেটির গোবিন্দ হোম ছিল কবির প্রথম বহিঃযাত্রা। কবির তখন ১১ বছর বয়স। কলকাতায় ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে তাঁরা এলেন পানিহাটিতে। দোতলার একটি ঘরে ১৮৭২ সালের মে মাস থেকে টানা ৪৮ দিন কাটিয়ে গিয়েছিলেন কবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনস্মৃতিতে এ নিয়ে লিখছেন, ‘একবার কলিকাতায় ডেঙ্গু জ্বরের তাড়ায় আমাদের বৃহৎ পরিবারের কিয়দংশ পেনেটিতে ছাতুবাবুদের বাগানে আশ্রয় লইল। আমরা তাহার মধ্যে ছিলাম। এই প্রথম বাহিরে গেলাম। গঙ্গার তীরভূমি যেন কোন পূর্বজন্মের পরিচয়ে আমাকে কোলে করিয়া লইল।’ ১৮৯৫ সালের ৫ জুলাই ভাইঝি ইন্দিরাদেবীকে কবিগুরু চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘ছেলেবেলায় পেনেটির বাগানে থাকতুম। পাশে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির থেকে দিনরাত্রির মধ্যে তিন-চারবার করে নহবত বাজত। আমার তখন মনে হত, আমি বড় হয়ে স্বাধীন হওয়া মাত্রই একটা এইরকম নহবত রাখব।’

দ্বিতীয়বার কবি এখানে আসেন ১৯১৯ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে, সঙ্গে ছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ। তখন তাঁর বয়স ৫৮ বছর। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে নাইটহুড উপাধি ত্যাগের সিদ্ধান্ত ও সে’সংক্রান্ত চিঠি এখানে বসেই লেখা হয়েছিল বলে শোনা যায়। তারপর ১৯২৮ নাগাদ গড়ে ওঠে আশ্রম। আশ্রমের এক মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ১৯৩৩ সালের ৫ মার্চ রবিঠাকুর এই বাড়িতে তৃতীয়বারের জন্য এসেছিলেন। তখন তিনি ৭২ বছরের বৃদ্ধ। ভাগ্নী স্বর্ণকুমারীর মেয়ে সরলা দেবী চৌধুরানি সেবার সঙ্গে ছিলেন। সেই সময় আশ্রমের ঘাটের কাছে একটি আম গাছ বপন করেছিলেন। গাছটি আজও রয়েছে। এরপর ১৯৩৪ সালের ৮ আগস্ট ‘বাসন্তী কটন মিল’ উদ্বোধন উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ এই বাড়িতে শেষ তথা চতুর্থবারের মতো এসেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনস্মৃতিতে এ নিয়ে লিখছেন, ‘একবার কলিকাতায় ডেঙ্গু জ্বরের তাড়ায় আমাদের বৃহৎ পরিবারের কিয়দংশ পেনেটিতে ছাতুবাবুদের বাগানে আশ্রয় লইল। আমরা তাহার মধ্যে ছিলাম। এই প্রথম বাহিরে গেলাম। গঙ্গার তীরভূমি যেন কোন পূর্বজন্মের পরিচয়ে আমাকে কোলে করিয়া লইল।’

এই বাড়ি আরও এক ইতিহাসের সাক্ষী, নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়ি না থাকলে হয়তো রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রাণকেন্দ্র গড়ে উঠত গোবিন্দ হোম-ই। ১৮৯৮ সালে স্বামী বিবেকানন্দ কয়েকজন শিষ্যদের সঙ্গে গোবিন্দ হোম পরিদর্শনে এসেছিলেন। এ বাড়িতে থেকে গিয়েছেন সুকুমার রায়ও, তিনি তখন অসুস্থ। সঙ্গে ছিল ছোট্ট ‘খোকা’, সত্যজিৎ রায়। সে’কথা সত্যজিৎ আকাশবাণীর ‘আমার বাবা’ অনুষ্ঠানে নিজে বলেছিলেন। বলেছিলেন, গঙ্গায় স্টিমার দেখার স্মৃতির কথা।

এ তো গেল ইতিহাস, কিন্তু এখন কেমন আছে গোবিন্দ হোম?

আবাসিকরা থাকেন। প্রতি বছর পঁচিশে বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিন মহাসমারোহে পালিত হয় এখানে। পানিহাটি পুরসভা অগ্রণী উদ্যোগ নেয়। নাচ, গান, আবৃত্তি, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় দিনটি পালিত হয়। করোনার কারণে দু-বছর সে অনুষ্ঠানে আড়ম্বর হয়নি। ২০২৩-এও পালিত হয়েছে রবীন্দ্রজয়ন্তী। বাগান, বাড়ি, গাড়ি বারান্দা, গঙ্গার ঘাট সব মিলিয়ে মনোরম পরিবেশ। রয়েছে রবীন্দ্রনাথের মূর্তি। গোবিন্দ হোম নিয়ে কথা বলেছিলাম, শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি স্থানীয়,  ইতিহাস চর্চা করেন। গোবিন্দ হোমের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “পানিহাটি পৌরসভার আনুকূল্যে গোবিন্দ হোমের কিছু অংশের সামগ্রিক সংস্কার করা হয়েছে।” সেই সঙ্গে তিনি একটি আবেদনও করছেন, “ভবিষ্যতে গোবিন্দ কুমার হোম-সহ হেরিটেজ স্থানগুলির ঐতিহ্যকে সকলের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে একটি গ্যালারী করা হলে খুব ভালো হবে বলে আশা রাখি।”

গোবিন্দ হোমের হেরিটেজ পাওয়া নিয়ে আম পানিহাটিবাসীর মত প্রসঙ্গে তিনি জানালেন, “হেরিটেজ শব্দের অর্থ হল ঐতিহ্যবাহী স্থান। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধূলি ধন্য গোবিন্দ কুমার হোম ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে হেরিটেজ স্বীকৃতি লাভ করে। এলাকার পূর্ব প্রজন্ম গোবিন্দ কুমার হোম এবং তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্ব জানলেও বর্তমানের অনেকেই জানেন না পানিহাটিতে কবিগুরু এসেছিলেন। সেটি জানলেও জানেন না কোথায় এসেছিলেন। তাই পানিহাটির ৫টি ঐতিহ্যবাহী স্থান সমন্ধে এবং তাঁর ঐতিহ্য সকলের কাছে পৌঁছে দিতে হবে বলে আমি মনে করি।”

তথ্য ঋণ: 

জীবন স্মৃতি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বামী বিবেকানন্দ বাণী ও রচনা নবম খণ্ড
সত্যজিৎ রায়ের আমার বাবা শীর্ষক বেতার সাক্ষাৎকার : আকাশবাণী
ফের সাজল পেনেটির বাগান বাড়ি – এই সময়
জল পড়ে পাতা নড়ে’র বাড়িতে আজ রবি স্মরণ – বর্তমান পত্রিকা

বিশেষ কৃতজ্ঞতা শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।

ছবিঃ https://panihatimunicipality.in/

https://wbhc.in/home/place_details

Written by