নোনা দ্বীপের পাঠশালা : সুন্দরবনের গোসাবায় বিনামূল্যে মেয়েদের শিক্ষা

সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের বাসিন্দা উত্তম সর্দারের পাঁচ মেয়ে। একদিন শিক্ষক একটি ধারাপাত বই কিনতে বলেন। এরপর উত্তম সর্দার ফতোয়া জারি করেন, “কাল থেকে আর পড়তে যেতে হবে না।”

আবার ওই এলাকার স্বামী পরিত্যক্তা শ্যামলী মণ্ডলের ‘দিন আনি দিন খাই’ দশা। নিজের বাচ্চা মেয়েকে শিক্ষিত করার ভাবনা তাঁর মাথাতেও আসে না। বলেন, “খেতেই পাই না, পড়াবো কী করে?”

অভাব অনটনে থাকা এরকম পরিবারের মেয়েদের তাহলে শিক্ষালাভের কী হবে? – এই প্রশ্নটা নিজেকে করেছিলেন গোসাবার বাসিন্দা সৌমিত্র মণ্ডল।

প্রায় দেড় বছর যাবৎ সুন্দরবনের প্রত্যন্ত নয়টি দ্বীপের প্রান্তিক বাসিন্দারা তাঁদের কন্যাসন্তানদের এই পাঠশালায় (ওরফে ফ্রি কোচিং হাব) পড়ার জন্য পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বর্তমানে এখানে ৪৮ জন ছাত্রী পড়াশুনো করে।

সৌমিত্র মণ্ডল সমাজসেবামূলক কাজের জন্য সুন্দরবনের পরিচিত মুখ। কোভিড ও তার পরবর্তীকালে তিনি প্রান্তিক এলাকায় অক্সিজেন সরবরাহ করেছেন। এখনো সে কাজে তিনি ব্রতী। সমাজে অবদান রাখার জন্য সৌমিত্র নানা পুরস্কার পেয়েছেন। কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীর সহযোগিতায় তিনিই এবার গড়ে তুলেছেন নোনা দ্বীপের পাঠশালা।

গোসাবা ব্লকের ন’টা দ্বীপে মেয়েদের জন্য আলাদা কোনও স্কুল নেই। তাই এদের জন্যই গড়ে তোলা হয়েছে ‘নোনা দ্বীপের পাঠশালা’। প্রায় দেড় বছর যাবৎ সুন্দরবনের প্রত্যন্ত নয়টি দ্বীপের প্রান্তিক বাসিন্দারা তাঁদের কন্যাসন্তানদের এই পাঠশালায়  (ওরফে ফ্রি কোচিং হাব) পড়ার জন্য পাঠিয়ে দিচ্ছেন। বর্তমানে এখানে ৪৮ জন ছাত্রী পড়াশুনো করে।

পাঠশালার হাত ধরেই বাল্যবিবাহ, নারীপাচারের হাত এড়িয়ে সুন্দরবনের প্রান্তিক শিশুরা এখন শিক্ষালাভের পথে এগিয়েছে। আপাতত নার্সারি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির বালিকারা পাঠশালার ছাত্রী। ভবিষ্যতে মাধ্যমিক অব্দি মেয়েরা যাতে এখানে পড়ার সুযোগ পায়, সে চেষ্টা করছেন সৌমিত্র। প্রকৃতির মধ্যে উন্মুক্ত পরিবেশে পড়ুয়ারা যাতে বিজ্ঞান বিভাগ ও ইংরেজির জন্য ডিজিটাল লার্নিং এর সুযোগ পায়, সে নিয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সৌমিত্র জানান, নির্ভয়া ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন এবং কিছু শুভানুধ্যায়ী মানুষের সহায়তায় পাঠশালার খরচ নির্বাহ হয়। বিভিন্ন অনুদানে এখন কম্পিউটার লার্নিং সেন্টার খোলার চেষ্টা চলছে।

পাঠশালার হাত ধরেই বাল্যবিবাহ, নারীপাচারের হাত এড়িয়ে সুন্দরবনের প্রান্তিক শিশুরা এখন শিক্ষালাভের পথে এগিয়েছে। আপাতত নার্সারি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির বালিকারা পাঠশালার ছাত্রী।

বঙ্গদর্শন.কম-কে পাঠশালার প্রাণপুরুষ সৌমিত্র বলেন, “আমার লক্ষ্যই ছিল গ্রামের দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের স্কলারশিপ দেওয়া। এ লক্ষ্যেই এগোতে গিয়ে মনে হল, মেয়েদের শিক্ষার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।”

পড়ুয়াদের ৭০ শতাংশ আদিবাসী এলাকা থেকে আসে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা পড়ুয়াদের সংখ্যাই পাঠশালায় অধিক। তাই তাদের শিক্ষার উপকরণ অর্থাৎ স্লেট, বই, খাতার খরচ পাঠশালার কর্তৃপক্ষ বহন করে। এমনকী  মেয়েদের পুষ্টির জন্য সপ্তাহে একদিন ডিমসেদ্ধ দেওয়া হয়।

পাঠশালায় নিত্যদিনের ব্যবহারের জন্য স্লেট, পেন্সিল, বইপত্র রাখা থাকে। দরিদ্র পড়ুয়ারা সেখানে এসে ব্যবহার করে। বলতে গেলে গড়ে উঠেছে পড়ুয়াদের লাইব্রেরি। আবার সপ্তাহের একটা নির্দিষ্ট দিনে গল্পের বই পড়ানো হয়। গল্প পড়ার বিনিময়ে পড়ুয়ারা টিফিন পায়। এভাবে রামায়ণ, মহাভারত, মহাপুরুষের জীবনী পড়ানো হয় তাদের।

অন্ধকারের মধ্যে আলো জ্বালাচ্ছেন সৌমিত্র। শিক্ষার পথে আনার চেষ্টা করছেন চেতনা। এক এক করে ইট গেঁথে তৈরি করছেন ইমারত। হেতাল, সুন্দরীদের দেশে এই ইমারত লাইটহাউসের মতো পথ দেখাক, এমনই স্বপ্নে ঘুম ভাঙছে নোনা দ্বীপের!

Written by