কাগজে লেখা ‘অটাম ফ্লাশ’, যাদবপুরের ইংরেজি আর প্রফেসর সজনী কৃপালিনী মুখার্জি

প্রফেসর সজনী কৃপালিনী মুখার্জি সম্প্রতি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন

বেশি নয়, মাত্র কুড়িটি বছর আগে উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি বিষয়ের দুটো করে পেপার পড়তে হত। দুশো নম্বরের পুরো বিষয়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হত সকাল দশটা থেকে দুপুর একটা অবধি প্রথম পেপার। একঘণ্টা বিরতির পর দুপুর দুটো থেকে পাঁচটা অবধি দ্বিতীয় পত্র। সব বিষয়ের বেশিরভাগ প্রশ্নই ব্যাখ্যামূলক। চার-পাঁচ পাতা উত্তর লেখা ছিল বাঞ্ছনীয়। এখন ভাবলে মনে হয় ওটা ছিল পুরোপুরি অন্য এক যুগ। আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গ বোর্ডের স্কুলে পড়তাম তাদের ইংরেজি অন্তত নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে ছিল দ্বিতীয় ভাষা। ইংলিশ 'বি'। আমি কোনওদিন ভাবিনি এই দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি নিয়ে স্নাতক হব। কিংবা পরবর্তীকালে মাস্টার্স করবো তাও আবার ভালো নম্বর নিয়ে।

১৯৯৮-৯৯ সাল নাগাদ একটি ইংরেজি দৈনিকে পনেরো দিন অন্তর একটা কলাম পড়তাম- অটাম ফ্লাশ। লেখক সজনী কৃপালিনী মুখার্জি। এমনিতে এই দৈনিকের যে-কোনও লেখা পড়তে ডিকশনারি নিয়ে বসতে হত। কিন্তু 'অটাম ফ্লাশ' যেন ছিল টাটকা বাতাস।

কেন ভাবিনি? কারণ, এই ইংরেজিকে কখনও আপন মনে হয়নি। ইংরেজি সবার মাঝে সম্মান দিত ঠিকই, ভদ্রলোকেরা বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে কৌলিন্য বজায় রাখেন কিন্তু আমার, যখন বড়ো হয়ে উঠছি, কিছুতেই মনে হত না ইংরেজি পছন্দের কোনও বিষয়। তবে ইংরেজি চর্চা করতাম। আমাদের ছাত্রজীবনটা কোনও 'ইনফরমেশন'-এর যুগ নয়। যখন মাধ্যমিক দিলাম তখন হাতে হাতে মোবাইল আসা শুরু হচ্ছে। তার আগে ইন্টারনেট ছিল কম্পিউটারের সঙ্গে। ইন্টারনেট চালু করতে অনেক সময় লাগত। তার ওপর ভীষণ রকম ধীর। আমাদের পড়াশোনা মোবাইলে নয়, বই পড়ে করতে হত। লাইব্রেরি ছুটতে হত। আর ইংরেজি পড়তে লাগত প্রাত্যহিক একটা ইংরেজি খবরের কাগজ। সব বাঙালি বাড়িতেই তখন বোধ করি ইংরেজি কাগজ নেওয়া হত ইংরেজি শিখতে। বলতে দ্বিধা নেই সেটা একটা বাধ্যকতার শেখা। মনের আনন্দের নয়। ইংরেজি জানলে সমাজে সম্মান বাড়ে, চাকরির বাজারে অনেক দরজা খুলে যায় তাই ইংরেজি জানতে চাওয়াটা আমাদের কাছে একটা বাধ্যতামূলক শিক্ষা ছিল। পার্ট অফ স্পিচ, টেন্স, ভয়েস, ন্যারেশন আর ট্রান্সফরমেশন অফ সেন্টেনসেসের সঙ্গে আমরা ইডিয়ম আর প্রোভার্ব পড়তাম। আর একটা চালু কথা ছিল 'ডিকশনারি পড়ো'। তাতে 'ভোকাবুলারি' বাড়বে। লেটার লেখা, এসে লেখা, রিপোর্ট লেখা, নোটিস লেখা মায় টেলিগ্রাম লেখা অবধি আমাদের শিখতে হয়েছে। কিন্তু যতই ইংরেজি লিখতে শিখি না কেন এবং ভালো নম্বরও পাই, ইংরেজি বলতে কেমন আটকে আটকে যেত। সেটা কাটাতে কী করতাম? আরও বেশি করে ইংরেজি বই, পত্রপত্রিকা আর দৈনিক কাগজ পড়তাম।

এমনই সম্ভবত আটানব্বই-নিরানব্বই সাল নাগাদ একটি ইংরেজি দৈনিকে পনেরো দিন অন্তর একটা কলাম পড়তাম- অটাম ফ্লাশ। লেখক সজনী কৃপালিনী মুখার্জি (Professor Sajni Kripalani Mukherjee)। এমনিতে এই দৈনিকের যে-কোনও লেখা পড়তে ডিকশনারি নিয়ে বসতে হত। কিন্তু 'অটাম ফ্লাশ' যেন ছিল টাটকা বাতাস। এত ঝরঝরে, এত মুচমুচে আর মাঝে মাঝে এমন হাস্যরসের ঝলক যে পড়ার নেশা হয়ে গিয়েছিল। এবং ওই প্রথম দরকারের পড়ার বাইরে ইংরেজি ভাষাকে ভালোবাসা শুরু। সজনী কৃপালিনী মুখার্জি বার্ধক্যের নানা রং নিয়ে লিখতেন ওই কলাম। কখনও খেলাধুলা নিয়ে। আমি ক্লাস এইট-নাইনে পড়ি তখন, কোনও বিষয়ই আমার আগ্রহের নয় কিন্তু পড়তে অপূর্ব ভালো লাগত। তারপর মাধ্যমিকে ইংরেজিতে লেটার পেলাম, অনার্স নিয়ে আশুতোষ কলেজে ডিরেক্ট অ্যাডমিশনও হয়ে গেল।

আমি যে সরকারি আবাসনে থাকতাম সেখানকার ছেলেমেয়েরা ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়েছে, ডাক্তার হয়েছে, সরকারি অফিসের বড়ো পদেও গিয়েছিল। কিন্তু আমার আগে একজনই ইংলিশ অনার্স পড়েছিল। তবে বিষয় কঠিন লাগায় মাঝপথে ইংলিশ ছেড়ে বাংলা অনার্স নিয়েছিল সে। সুতরাং, ইংরেজিতে স্নাতক হতে আর তাও দক্ষিণের প্রেসিডেন্সি আশুতোষ কলেজে ভর্তি হয়ে আমার মধ্যে একটু অহংকারী ভাব আসছিল। কিন্তু সে অহংকার চুরমার হয়ে গেল যখন কলেজ শুরু হল। ইংরেজি যতই ভালো লিখতে পারি, বলি তো থেমে থেমে; অন্যদিকে আমার সহপাঠীরা কেউ সাউথ পয়েন্ট, কেউ সেন্ট জেমস, কেউ নব নালন্দা, কেউ ফিউচার ফাউন্ডেশন, কেউ লোরেটো, কেউ বালিগঞ্জ শিক্ষাসদন- তারা একেবারে ঝড়ের গতিতে ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। এমন ইংরেজি বলা ছেলেমেয়েগুলো শুনলাম যাদবপুরে অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে পায়নি! কী আশ্চর্য আমার ভুবনে তখনও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বলে যে খোদ কলকাতাতেই কোনও প্রতিষ্ঠান আছে, তার হদিশ ছিল না। সূত্র ছিল শুধু একটিই- অটাম ফ্লাশ আর প্রফেসর সজনী কৃপালিনী মুখার্জি।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর উদ্যোগ ছিল অকল্পনীয়। সেই সময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে তিনি ব্রেল, অডিও-বুক চালু করেছিলেন তার জুড়ি আজও মেলা ভার।

ইংরেজি অনার্স পড়তে গিয়ে বুঝলাম আমাদের কলেজে যতই ভালো লেখাপড়া হোক না কেন আসলে আমরা ঠিক উৎকর্ষের কেন্দ্রে নই। ইংরেজির যে অ্যাকাডেমিক চর্চা সেটা প্রেসিডেন্সি আর যাদবপুরেই হয়ে থাকে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকেও শিক্ষিত ফ্যাকাল্টি যাদবপুরে আছে। কিন্তু তাঁদের কাছে পড়ার সৌভাগ্য তো আমাদের হবে না। তবে কথা তো বলতে পারব! আমি তাই বন্ধুর বাড়ির ল্যান্ডলাইন থেকে মাঝে মাঝেই ফোন লাগাতাম যাদবপুরের ইংরেজি বিভাগ-এ। বলতাম, 'ইস দিস জেইউ ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট?' অন্য দিক থেকে ভেসে আসত, 'ইয়েস! ইট ইজ়। আমি জিজ্ঞেস করতাম, 'ক্যান আই টক টু প্রফেসর সজনী মুখার্জি প্লিজ?' উত্তর পেতাম, 'শি রিটায়ার্ড লং ব্যাক। এনি মেসেজ ফর হার? উই ক্যান কনভে!' আমি ফোন কেটে দিতাম। প্রফেসর মুখার্জির মুখটা পর্যন্ত দেখিনি। তাঁর ওই একপক্ষ কালের কলাম পড়ে ইংরেজি ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু একবারও কি সে-কথা তাঁকে জানানো হবে না? বলা হবে না, আপনার ভুবনজোড়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আমি একলব্য কোনও? সেটা বলতে পেরেছিলাম কলেজ পাশ করে স্কুলে চাকরি পেয়েছি যখন, সেই সময়।

তিনি একবারেই ফেসবুকে আমার বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করেছিলেন। তখনও মেসেঞ্জার আসেনি। ফেসবুকের মেসেজে আমার তাঁকে শিক্ষক হিসেবে মেনে চলার কথা বলেছিলাম। তিনি আনন্দ পেয়েছিলেন। বলেছিলাম আমাকে পড়াবেন? তিনি বলেছিলেন পড়ানো যে ছেড়ে দিয়েছি বহু বছর। তুমি একদিন এসো। কোনওদিন যাওয়া হয়নি তাঁর বাড়ি কিন্তু নিয়মিত পড়তাম তাঁর ফেসবুকের পোস্টগুলো। কী অনন্যসাধারণ লেখা সব! আর মিষ্টি, মিষ্টি সব ছবি। তাঁর একটা হাসিভরা মুখের ছবি খুব সুন্দর। দেখে মনে হত এই মানুষটা জীবনে কীভাবে আনন্দে থাকতে হয় সেই রহস্য জেনে গেছেন। এই কখনও তিনি শেয়ার করলেন যাদবপুরে তাঁর সহকর্মীদের পুরোনো একটা ছবি যেখানে শীলা লাহিড়ী চোধুরী সম্বন্ধে সুপ্রিয়া চৌধুরী লিখছেন, 'শীলাদি ইজ় টোটালি, ব্রেথটেকিংলি গ্ল্যাম!', তো আরেকটা ছবি শেয়ার করলেন তাঁর শাশুড়ি-মায়ের। কিংবা ফুলের ছবি যা অধ্যাপক স্যমন্তক দাসের দেওয়া গাছে ফুটেছে। দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রতিরোধেও লিখতেন ছোটো ছোটো লেখা।

অক্সফোর্ড ফেরত যাদবপুরের প্রফেসর সজনী কৃপালিনী মুখার্জি যেমন জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন, তেমনই কিছু ব্যাপারে ছিলেন যুগমানব। পরে জেনেছি প্রতিবন্ধী শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর উদ্যোগ ছিল অকল্পনীয়। সেই সময় যাদবপুরে যেভাবে তিনি ব্রেল, অডিও-বুক চালু করেছিলেন তার জুড়ি আজও মেলা ভার।

প্রফেসর সজনী কৃপালিনী মুখার্জি সম্প্রতি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। আফসোস রয়ে গেল তাঁর সঙ্গে আমার কখনও দেখা হল না। তাঁর বৃত্তের আমি কেউ নই, ছিলামও না, কিন্তু তাঁর মৃত্যু বড্ড নাড়া দিয়ে গেল। তিনি যেন আমারও প্রফেসর ছিলেন। এমন যদি কখনও হত সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বেড়া ভেঙে দেওয়া হত আর যে-কোনও শিক্ষার্থী যে-কোনও অধ্যাপকের ক্লাস করতে পারত তাহলে তো আমারও কোনওদিন সকলের প্রিয় সজনীদির কাছে পড়া হত! 'তোমারি পরশরাগে চিত্ত হল রঞ্জিত/ এই তোমারি মিলনসুধা রইল প্রাণে সঞ্চিত।'

Developed by DXDasia