কৃষ্ণনগরের নদী কনক্লেভে নদী বাঁচানোর শপথ আর শিকড়ের খোঁজ

“কী আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর?…”
-সৈয়দ শামসুল হক 

নদী বাস্তবিক, আবার প্রতীকও। শিল্প, সংস্কৃতি জড়ানো গোটা আধুনিক মানবসভ্যতার ভিত্তি হলো নদী। আর বাংলা তো চিরকালই নদীমাতৃক অঞ্চল। তার গ্রাম ও শহরজীবন, জীবিকা, অভ্যেস আর কৃষ্টির ভিতর দিয়ে বয়ে গেছে নদী- গঙ্গা, পদ্মা, ভাগীরথী, চূর্ণি, মাথাভাঙা, জলঙ্গি, ইছামতি, মাতলা…। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার বিবর্তন আর বাধাহীন উন্নয়নের চাপে নদীগুলি, যত দিন যাচ্ছে, ক্রমশই শীর্ণকায়া হয়ে আসছে। নদীপাড়ের ভূমিক্ষয়, জলদূষণ, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, পরিবেশ বদলের কারণে নদীর নাব্যতা হ্রাস, নদীর জল শুকিয়ে যাওয়া, নদীর মজে যাওয়া, আর বর্ষাকালে নদীর পাড় ভেঙে অগুনতি মানুষের মৃত্যুর খবর প্রায়ই জায়গা করে নেয় খবরের পাতায়। তবুও নদীর পুনরুজ্জীবন-এর ইস্যু মূলস্রোতে আসতে গিয়েও বারবার থমকে যায়। তারই মধ্যে নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন অনেকে। এমনই একটি সংগঠন হলো জলঙ্গি নদী সমাজ (Jalangi River Society)। যারা বহুবছর ধরে কাজ করে আসছেন জলঙ্গি নদীকে বাঁচাতে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক নদী দিবস-এ তাঁরা আয়োজন করেছিলেন নদী কনক্লেভ ২০২৩ (River Conclave 2023)। নদিয়ার কৃষ্ণনগর শিশু উদ্যান প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই কনক্লেভটি।

সংগঠনের পক্ষ থেকে ডঃ কৌশিক সরকার বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “এই কনক্লেভের উদ্দেশ্য একাধিক। নদী যাঁদের জীবিকার মাধ্যম, যেমন মৎসজীবী, কৃষিজীবী তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরা। নদী এবং তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। তাঁদের মতামত শোনা। প্রশাসনকেও সমস্যাগুলি সম্পর্কে অবহিত করানো। আর বিভিন্ন অঞ্চলের নদীগুলি বাঁচানোর জন্য লড়াই করতে থাকা বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো।” বর্তমানে জলঙ্গি নদীর অন্যতম বড়ো সমস্যা কালোজল। কৌশিক জানালেন যে, জলঙ্গি নদীর বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে (জুন মাসের প্রথম থেকে জুলাই পর্যন্ত) কালো হয়ে যাচ্ছে বিগত চার বছর ধরে। ফলে মারা যাচ্ছে নদীর মাছ। মৎসজীবীরা সমস্যায় পড়ছেন। তার কারণ নির্ধারণ করতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের  বিশেষজ্ঞদের আহ্বান করা হয়েছে। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে কমিটিও।

ঐদিন সকাল ১১টা থেকে ৪টে পর্যন্ত চলেছে এই অনুষ্ঠান। মৎসজীবী, কৃষিজীবীরা তুলে ধরেছিলেন তাঁদের সমস্যার কথা। তাঁরা গানও বেঁধেছিলেন, যাতে ধরা ছিল তাঁদের দৈনন্দিন যাপনের কথা। শিল্পী সুব্রত বসু এসেছিলেন তাঁর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। সেই গানের কথাগুলিকে ছবির মাধ্যমে তুলে ধরেন তিনি। ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্ব। একেবারে শেষে ছিল ‘আমাদের কথা’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। সেখানে নদীর পুনরুজ্জীবন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন তাঁদের কাজকর্মের খতিয়ান তুলে ধরেন। কৌশিকবাবু বলেন, “নদীর পুনরুজ্জীবন, নদীকেন্দ্রিক সামাজিক ইস্যুগুলি নিয়ে যে কাজ সারা বাংলা জুড়ে চলছে, সেই সংক্রান্ত একটা খতিয়ান তৈরি করা এবং সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। সেই লক্ষ্যে আমরা খানিকটা হলেও সফল হয়েছি।”

এরই মাঝে দেখানো হয় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের তথ্যচিত্র শিকড়। ১ ঘণ্টা ৬ মিনিটের এই তথ্যচিত্রে পরিচালক তুলে ধরেছেন নদিয়ার তেহট্টের জনজীবনকে। আগেকার আর এখনকার তেহট্টের জনজীবনের বদল আর সেই বদলের বাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া জলঙ্গি নদী এই তথ্যচিত্রের মূল উপজীব্য। পরিচালক বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “আমার পৈতৃক ভিটে তেহট্টে। সেখানকার মানুষের জনজীবন, তার পরিবর্তন, সেই জীবনে নদীর প্রভাবকে নস্ট্যালজিক ভাবে ক্যামেরায় ধরতে চেয়েছি এই তথ্যচিত্রে। গ্রামজীবনের উৎসব, শোক, আচার-অনুষ্ঠান অনেককিছুই তো নদীকে ঘিরে। আর বেশিরভাগ মানুষেরই কোনও না কোনওভাবে জীবনের শিকড় রয়ে গেছে কোনও না কোনও গ্রামে, যে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কোনও না কোনও নদী। সেটাকেই ফিরে দেখতে চাওয়ার নামই ‘শিকড়’।” প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের সঙ্গে জলঙ্গি নদী সমাজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করে এই তথ্যচিত্র প্রদর্শনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরিচালক জানান, “ওঁরা বহুদিন ধরে জলঙ্গি নদীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছেন। বর্তমানে এই নদীর অবস্থা ভালো নয়। নদী সরু হয়ে এসেছে। অনেক জায়গায় জল দূষিত হয়ে গেছে। এই সময়ে এই ধরনের উদ্যোগ খুবই বেশ ভালো লেগেছে।” তিনি নিজেও উপস্থিত ছিলেন কনক্লেভে।

জলঙ্গি নদী সমাজ লড়াই শুরু করেছিলেন নয় দফা দাবীকে সামনে রেখে। তার মধ্যে প্রশাসনের সহযোগিতায় এবং সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ইতিমধ্যেই পূরণ করতে পেরেছেন চারটি দাবীকে। তার মধ্যে নদী থেকে বাঁধাল তুলে দেওয়ার ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে দাবি করলেন কৌশিকবাবু। তাঁর কথায়, “নদীর একটি বিস্তৃত অংশে বাঁধাল দেওয়া হত। অর্থাৎ নদীতে বাঁশের বড়ো বড়ো খুঁটি পুতে তাতে মাছ ধরার জাল লাগিয়ে রাখা। যাতে নদীর মাছগুলি সেই জালে আটকা পড়ে। এরফলে মৎসজীবীদের প্রবল অসুবিধায় পড়তে হয়েছিল। এই কাজ করত এলাকার এক প্রভাবশালী। সঙ্গে চলত মৎসজীবীদের হুমকি দেওয়া, তাঁদের জাল, নৌকার ক্ষতি করা।” জানা গেল, এরফলে মৎসজীবীদের দৈনিক আয় ছ’সাতশো টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছিল চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ টাকায়। কৌশিকদের সংগঠন তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে পাল্টা লড়াই শুরু করেন। তাঁদের নিয়ে সাইকেল র‍্যালি, পদযাত্রা করা হয়। সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হয়। প্রশাসনকে জানানো হয়। এরপর প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রায় ৪০-এর উপর বাঁধাল তুলে ফেলা হয় নদীগর্ভ থেকে। কৌশিক তৃপ্ত গলায় জানালেন, “এখন নদীতে আর একটাও বাঁধাল নেই।” কৃষ্ণনগরে পুজোর পর নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জনের ফলে দূষণ ছিল প্রতি বছরের ঘটনা। সেই ঘটনা নিয়ে প্রশাসনের কাছে দরবার করেন তাঁরা। এরপর স্থানীয় প্রশাসন বিসর্জনের পরে ক্রেন দিয়ে নদী থেকে প্রতিমা তুলে ফেলার ব্যবস্থা করেছে। এছাড়া তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জলঙ্গি নদীর স্বাস্থ্যপরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁরা স্কুল পড়ুয়াদেরকে নদী সম্পর্কে সচেতন করার জন্য ক্লাসের আয়োজন করেন প্রতি শনিবার। আরও বিভিন্নভাবে চলে সচেতনতা প্রসারের কাজ।

কৌশিক জানালেন, “পরিবেশ সুস্থ না থাকলে মানুষও বাঁচবে না। তাই নদী, জলাশয়, জীবজন্তুদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। আমরা সেই উদ্দেশ্যেই কাজ করছি। নদী কনক্লেভ তারই একটা অঙ্গ।” তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রশাসনকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। ফোনে জানালেন, “আমাদের দাবিগুলি পূরণ করার জন্য প্রশাসনকে আরও একবার অসংখ্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। আশা করছি, প্রশাসন আমাদের বাকি ইস্যুগুলিকেও মান্যতা দেবে।”

নদী বয়ে যায়। বইতে বইতে শুকিয়ে আসে একদিন। একদিন ছোট্টো গ্রামের গাছতলা, মাঠ, দোকানের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মিঠে জলের ধারার জায়গায় পড়ে থাকে শুকনো খাত, আর নদীর পাড়ে বসে থাকা ছোট্টো ছেলেটা বড়ো হয়ে নদী থেকে আরও দূরে সরে যায়। আশা করা যায়, কৌশিকবাবুদের এই উদ্যোগ মরা গাঙে আবার বান আনবে। শুকনো খাতে আবার খেলবে জোয়ার-ভাঁটা, আরও একবার ঢেউ খেলবে বাংলার গ্রাম্য সংস্কৃতি, অভ্যেস, জীবিকা আর মানবজমিনে।

Written by