
বাংলার কৃষিমহলে আগ্রহ ফিরছে পুরোনো চাষে
ভারতের খাদ্য-সংস্কৃতির অভিন্ন অঙ্গ চাল, বাংলার (Bengal's) তো বটেই। সত্যিকারের বাঙালির জন্য, ভাত (Rice) শুধু একটি খাদ্যশস্য নয়, আবেগ। বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে গরম ভাতের গন্ধ। এর ইতিহাস দীর্ঘ। সেকারণেই হয়তো স্রেফ ‘স্মৃতি’ হয়ে যেতে যেতে আজও বারবার আমাদের জীবনের সঙ্গে জাঁকিয়ে বসে আছে নানা রকমের ভাত। পান্তাভাত, পেঁয়াজ, আগুন ঝাল লঙ্কা আর নুন।গরম ভাত, আলুভাজা আর ঘি। পোলাও আর মাংস। ধান (Paddy) উৎপাদন, তা থেকে চাল তৈরি, নানা পদের রান্না ও পরিবেশন, এই সবই আমাদের শিল্পবোধ ও জীবনরসে জারিত। হারিয়ে-যাওয়া জীবনের গল্প, যা সাহিত্য (Literature), গান (Song), ছবি (Drawing), লোককথার (Folklore) মধ্যে থেকে গিয়েছে।
এক সময় ৫০০০ প্রজাতির ধান (Paddy) ছিল। তার মধ্যে বর্তমানে তিন হাজার প্রজাতির ধানের কোনও অস্তিত্বই নেই। কোনও রকমে দু’হাজার প্রজাতির ধান টিকে রয়েছে। এদের মধ্যে আবার হাতেগোনা কয়েকটি প্রজাতি ছাড়া বাকিদের দেখাও মেলে না। দেশি ধান বলতে এক কথায় প্রাচীনকালের ধানকে বলা যায়। কৃষি দফতর সূত্রে জানা যায়, এ রাজ্যে আমন চাষে প্রায় ৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে দেশি ধানের চাষ হয়। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলায় কালোনুনিয়া (Kalanunia), মালশিরা (Malshira), উত্তর দিনাজপুরে তুলাইপাঞ্জি (Tulaipanji) ও কাটারিভোগ (Kataribhog), বর্ধমান-বাঁকুড়া-বীরভূম ও হুগলিতে গোবিন্দভোগ (Gobindabhog), বাদশাভোগ (Badsahbhog), রাধাতিলক (Radhatilak), উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় হোগলা (Hogla), তালমুগুর (Talmugur), দুধেশ্বর (Dudherswar), কেরালাসুন্দরী (Keralasundari) ও বহুরূপী (Bahurupi) ধানের চাষ হচ্ছে। অন্যান্য জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে দেশি ধানের চাষ হয়।
দেশি ধান বলতে এক কথায় প্রাচীনকালের ধানকে বলা যায়। কম সময়ে বেশি ফলন পাওয়ার জন্য চাষিরা এক সময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন দেশি ধানের চাষ থেকে। অন্য ধানের চাষে ফলন বেশি। ফলে দামও মেলে বেশি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদা বদলাচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ছবিটা বদলাচ্ছে। জীবনযাত্রার বদল হচ্ছে মানুষের। খাবারের পরিমাণের থেকে পুষ্টিমূল্য নিয়ে ভাবার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এই পরিস্থিতিতে ফের দিন ফিরেছে দেশি চালের। পুষ্টিমূল্য বেশি থাকায় ফের চাহিদা বাড়ছে এই চালের। ভাল দাম মেলায় এই চাষে আগ্রহ ফিরছে চাষিদেরও। আর সেকারণেই বাঙালির হেঁশেলে কদর ফিরে পাচ্ছে ‘রাধাতিলক’ (Radhatilak)।
চিরাচরিত আমন ধানের পাশপাশি সুগন্ধি ধানচাষে চাষিদের উৎসাহ জোগাচ্ছে রাজ্যের কৃষি দফতর। চাষিদের পছন্দের চাষের পাশপাশি রাধাতিলক-এর মতো ঐতিহ্যবাহী ধানের চাষে আগ্রহ বাড়ানোর কথা চাষিদের বলছেন কৃষি আধিকারিকরা। শুধু শুকনো উৎসাহ নয়, চাষের জন্য বীজও দিচ্ছে কৃষিদফতর। পূর্ব বর্ধমানের এক কৃষকের মতে, বেশ কয়েক বছর হল তাঁরা আমনের সঙ্গে রাধাতিলক চাষ করছেন। ভাল দাম মেলায় এই চাষে আগ্রহ ফিরছে চাষিদেরও। রাধাতিলকের ফলনও হয় ভালো। রোগ, পোকার আক্রমণও কম। সহজপাচ্যও। এই চালে রয়েছে প্রোটিন, জিঙ্ক, ভিটামিন বি-১, বি-২, বি-৩।
অনলাইন বিপণি ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এর অরিজিৎ সেন বলছিলেন, “এখন আমন ধানের পাশাপাশি গোবিন্দভোগ, রাধাতিলক চাষে উৎসাহ দেখাচ্ছেন কৃষকরা। আমাদের স্টোরে সারা বছরই এই চাল পাওয়া যায়, চাহিদাও রয়েছে যথেষ্ট। সম্পূর্ণভাবে কীটনাশক বিহীন গোবিন্দভোগ চাল সরাসরি শান্তিপুরের কৃষকদের থেকে আমরা সংগ্রহ করি, আইআইটি খড়গপুর ল্যাব থেকে এর গুণমান যাচাই করে নেওয়া হয়। তাই গ্রাহকরাও চোখ বন্ধ করে ভরসা করেন।”
রাধাতিলক একটি ‘আতপ’ ধানের জাত। ছোটোদানা, সুগন্ধযুক্ত এবং খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ। রাধাতিলক নিয়ে কৃষ্ণ এবং রাধাকে ঘিরে একটি অদ্ভুত লোককাহিনিও প্রচলিত রয়েছে। রোজ বদলাচ্ছে মানুষের খাদ্যাভ্যাস। রোজকার খাবারের তালিকায় বাড়ছে ‘ঝুঁকিহীন’ খাবারের সংখ্যা। বাজারে, মলে খোঁজ বাড়ছে জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত শাক-সব্জির।
(রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়া রাধাতিলক সরাসরি বাংলার কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’-এ। সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন)
