নাথিং লাইক পারসেপোলিস : কলকাতায় নতুন ‘ইন্টিমেট’ থিয়েটার প্রযোজনা

র্তমান কলকাতা কেন্দ্রিক থিয়েটারের দুটি অন্যতম প্রধান সমস্যা বাংলা ছাড়া অন্যান্য ভাষার নাটক প্রায় না অভিনয় করা (দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে) এবং প্রসেনিয়ামের বাইরে সেভাবে বেরোতে না পারা (এ ক্ষেত্রেও দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে)। প্রথম সমস্যা বা সমালোচনার ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে বাংলা এবং থিয়েটার দুটিই ‘প্রান্তিক’ ভাষা এবং শিল্প, তারা যদি একত্রিত হয়ে কোথাও বেঁচে থাকার চেষ্টা করে, তাহলে সমস্যা কোথায়? কোথাও সমস্যা নেই, কিন্তু যে লোক রোজ ডাল-ভাত খায় আর কোনো একদিন যদি সে ওয়েটিং সস পাস্তা খায়, তাহলে খারাপ কিছু হয় না বরং একটু স্বাদ বদল হয়, পরিচয় ঘটে নতুন জিনিসের সঙ্গে। দ্বিতীয় সমস্যার ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, কেন? বাঙালিই তো দেশকে থার্ড থিয়েটার শিখিয়েছে। শিখিয়েছে মানলাম, কিন্তু নিজে শিখেছে কি?

 

একটি ব্যতিক্রমী কাজ ‘নাথিং লাইক পারসেপোলিস’ (Nothing Like Persepolis)। এই নাটকের ভাষা ইংরেজি, কিন্তু ব্যাপ্তি বিশ্বজনীন। নাটকটির মূলে আছে মারজান সাত্রাপির গ্রাফিক মেমোয়ার ‘পারসেপোলিস’, শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ এবং আমাদের চারপাশে টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত যে যুদ্ধ, সেই সবকিছুই।

কলকাতার থিয়েটারের বাবুরা বোয়াল, বাদল বা সাফদার যতই আওড়াক বা যতই কালো পাঞ্জাবি আর লাল ওড়না নিয়ে বছরের কোনো একটি সময়ে লাফালাফি করুক, দিনের শেষে তারা মাথায় রাখেন সেই মান্য প্রসেনিয়াম থিয়েটারকেই। থার্ড মানে যে কেবল মুক্তমঞ্চ না, অঙ্গন মঞ্চও বটে, থিয়েটার যে কেবল প্রসেনিয়াম নয়, স্পেস স্পেসিফিক, অল্টারনেটিভ, গ্যারাজ, ইন্টিমেট থিয়েটার ইত্যাদি বিভিন্নভাবে থিয়েটার হতে পারে বা হওয়া সম্ভব, বাঙালি এটা জানেন, কিন্তু মানেন না, মানতে চান না। তবে কেউই কি মানেন না? সেরকমটা কিন্তু নয়। প্রথমেই দু-একটি ব্যতিক্রমের কথা বলেছিলাম, তেমনই একটি ব্যতিক্রমী কাজ ‘নাথিং লাইক পারসেপোলিস’ (Nothing Like Persepolis)। এই নাটকের ভাষা ইংরেজি, কিন্তু ব্যাপ্তি বিশ্বজনীন। নাটকটির মূলে আছে মারজান সাত্রাপির গ্রাফিক মেমোয়ার ‘পারসেপোলিস’, শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ’ এবং আমাদের চারপাশে টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত যে যুদ্ধ, সেই সবকিছুই। নাটকটি সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার লেক অঞ্চলে আরবান থিয়েটার প্রজেক্ট-এ অভিনীত হয়। কেমন হল এই নাটক?

নাটকটির ঘটনাস্থলে একটি সার্কাসের তাঁবু, যেখানে তিনজন লাল নাখওয়ালা ক্লাউন যুদ্ধবিরতির মাঝে তাদের খেলা দেখাতে এসেছে। এই তিনজন কারা? এঁরা কি ক্লাউন? না এঁরা ম্যাকবেথের উইচ? বিভিন্ন টুকরো টুকরো মুহূর্তের কোলাজ এই নাটক। এমন অনেক কথা বলা হয় যা হয়তো আমাদের জানা, কিন্তু আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে সেগুলো ভুলে যাই বারবার। এই নাটক কথা বলে লিঙ্গ রাজনীতি নিয়ে, সমাজনির্দিষ্ট ‘প্রথম’ এবং ‘দ্বিতীয়’ লিঙ্গের বিভেদ নিয়ে, এই নাটক কথা বলে শান্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা যুদ্ধ নিয়ে। কোনো একটি একরৈখিক আখ্যান এই নাটকে নেই, যা আছে, সেগুলো অজস্র টুকরো ছবি ও এক আজব খেলার উপাখ্যান। নাটকটিতে তিনটি ক্লাউনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সৃষ্টি শুক্লা, স্বস্তিকা সেন এবং মৌক্তিকা সেন। নাটকটির নাটককার এবং নির্দেশক সৌরভ আর. নাথ।

 

হাজারও সমালোচনার মধ্যেও ‘নাথিং লাইক পারসেপোলিস’ একটি সৎ প্রচেষ্টা। স্পেসের ব্যবহার, ফোর্থ ওয়াল ভাঙা, অল্টারনেটিভ ন্যারেশন প্রভৃতি বিভিন্ন সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এই প্রযোজনার মধ্যে।

নাটকটি কিছু ক্ষেত্রে বাদল সরকারের অঙ্গনমঞ্চের যে চিন্তা বা বক্তব্য, সেটিকে অনুসরণ করে। দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন এমনকি অংশগ্রহণের পর্যায়ে চলে আসে এই নাটক। বারবার অভিনেতারা ভেঙে দেন ফোর্থ ওয়াল। ইন্টিমেট স্পেসে থিয়েটারের যে মজা, সেটি ভরপুর পরিমাণে আছে এই নাটকে। অজস্র ছোটো-বড়ো প্রপ বা এলিমেন্ট ব্যবহার হয় এই নাটকে, যার মধ্যে এক বিশেষ ধরনের (সম্ভবত শিশুদের খেলনা) প্রজেক্টারের ব্যবহার বিশেষভাবে দাগ কাটে। তবে নাটকটা কি একেবারেই নিখুঁত? নাটকটির প্রথম অসুবিধা আবহ প্রক্ষেপণ, সেই দিকটায় আরও একটু বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল। অভিনেতারা চেষ্টা করেছেন যথোপযোগী অভিনয় করার, তবে চরিত্রের আরও গভীরে তাঁরা মনোনিবেশ করতে পারলে আরও অসামান্য উপস্থাপনা মঞ্চস্থ হতে পারত। কিছুক্ষেত্রে অভিনেতাদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াও সেভাবে দানা বাঁধেনি। কেবল এলইডি টুনি লাইট আর ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে অভিনয় করার সিদ্ধান্তটি ভালো। নাটকে অনেক এলিমেন্ট ব্যবহারের কথা আগেই বলা হয়েছে, সেটি কিছুক্ষেত্রে একটু বেশিই মনে হয়, এই ব্যাপারে সংযত হওয়া যেত। নাটক শেষের পরে নাচের বিষয়টিও বাদ দেওয়া যায়, তাতে দর্শকদের নাটকটি সম্পর্কে একাগ্রতা কিছুটা বিঘ্নিত হয় বলে মনে হয়।

 

তবে হাজারও সমালোচনার মধ্যেও ‘নাথিং লাইক পারসেপোলিস’ একটি সৎ প্রচেষ্টা। স্পেসের ব্যবহার, ফোর্থ ওয়াল ভাঙা, অল্টারনেটিভ ন্যারেশন প্রভৃতি বিভিন্ন সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এই প্রযোজনার মধ্যে, আগামীদিনে এই দলের থেকে আরও উন্নত এবং আরও উচ্চমানের প্রযোজনার অপেক্ষায় থাকতেই পারেন দর্শক।

___________
নাটক: নাথিং লাইক পারসেপোলিস | নাটককার ও নির্দেশক: সৌরভ আর. নাথ | অভিনয়: সৃষ্টি শুক্লা, স্বস্তিকা সেন, মৌক্তিকা সেন

Written by