
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভূত উন্নতি করেছে। নিয়মিত গবেষণা ও প্রয়োগের ফলে নিত্যনতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে চলেছে। কিন্তু তাতে ব্রাত্য হয়ে যায়নি বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি। হোমিওপ্যাথ, আয়ুর্বেদের মতো শাস্ত্র আজও অনেক মানুষকে নীরোগ করে তুলছে। সার্বিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাচ্ছে যোগ। মডার্ন মেডিসিন যাঁরা প্র্যাকটিস করেন, তাঁদের অনেকের মনেই বিকল্প চিকিৎসার বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এই ভাবনার বিপরীতে ভিন্ন ধারায় চিকিৎসায় আস্থা রাখেন কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. প্রতীম সেনগুপ্ত (Dr Pratim Sengupta)।
মডার্ন মেডিসিনের পাশাপাশি পরম্পরাগত পদ্ধতিতে রোগ নির্মূল করার পক্ষপাতী তিনি। এই পথে এগিয়ে তিনি শুধু কিডনি চিকিৎসার স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়েননি, জাতীয় ক্ষেত্রে স্বীকৃত পুরস্কার পেয়েছেন। কিডনি কেয়ার সোসাইটি (The Kidney Care Society)-র তিনি অন্যতম প্রাণপুরুষ। ইউটিউবে তাঁর অনেক দর্শক, ফলোয়ার। জাতীয় চিকিৎসক দিবস (National Doctor’s Day)-এ ডা. সেনগুপ্ত বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত।
যোগাভ্যাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চান ডাঃ সেনগুপ্ত
অ্যালোপ্যাথ, হোমিওপ্যাথ, এভাবে আলাদা করে দেখলে হবে না। আসলে দরকার সিমপ্যাথি। আমাদের বেঁচে থাকাটা বহুমাত্রিক। তাই মানুষকে ভালো রাখার জন্য আধুনিক মেডিসিন যেমন দরকার, তেমনই আয়ুর্বেদ দরকার।
আপনি চিকিৎসকের পেশায় এলেন কেন?
ডা. সেনগুপ্ত : আমার চিকিৎসক হওয়ার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন বাবা। তিনি বলতেন, ভালো চিকিৎসক হয়ে উঠতে হবে। পরিবারে আমি বংশ পরম্পরায় চিকিৎসক হিসেবে চতুর্থ প্রজন্ম। বাবা চিকিৎসক ছিলেন। আমার দাদু ছিলেন হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক। প্রপিতামহ আয়ুর্বেদ চিকিৎসক। সুতরাং ডাক্তারি আমাদের জিনে আছে।
অ্যালোপাথের পাশাপাশি আপনি অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতিকেও গুরুত্ব দেন। কেন?
ডা. সেনগুপ্ত : অ্যালোপ্যাথ, হোমিওপ্যাথ, এভাবে আলাদা করে দেখলে হবে না। আসলে দরকার সিমপ্যাথি। আমাদের বেঁচে থাকাটা বহুমাত্রিক। তাই মানুষকে ভালো রাখার জন্য আধুনিক মেডিসিন যেমন দরকার, তেমনই আয়ুর্বেদ দরকার। আকুপ্রেশার, আকুপাংচার, ফিজিওথেরাপি সাইকোথেরাপি, রেইকি, যোগ এমন কত পন্থা রয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষকে ভালো রাখা যায়। আধুনিক মেডিসিন বা অ্যালোপাথ সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু তারও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। সেগুলি অন্যান্য পদ্ধতির সাহায্যে পূরণ করা সম্ভব। যোগে এমন অনেক জিনিস ভালো হয়, যা আধুনিক মেডিসিনের দ্বারা হয় না।
তার মানে অ্যালোপাথি, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ এসবের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই।
ডা. সেনগুপ্ত : বিরোধ কেন থাকবে! চিকিৎসক হিসেবে প্রত্যেকেরই লক্ষ্য মানুষের যন্ত্রণা লাঘব করা। সেটা যে কোনও ধরনের সিস্টেম অফ মেডিসিনের মাধ্যমে করা যেতে পারে। সুফল পেলে সেই পদ্ধতিকে স্বাগত জানানো উচিত। সেটা হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, যাই হোক না কেন।
আমাদের মতো গরিব দেশে কীভাবে সকলের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা করা সম্ভব?
ডা. সেনগুপ্ত : এটা সম্ভব হবে, যদি আমাদের রাজনীতিকরা স্বাস্থ্য পরিষেবাকে গুরুত্ব দেন। ভারতে বিপুল সংখ্যায় মানুষ থাকা সত্ত্বেও এত দারিদ্র। আমেরিকা বা ইউরোপে প্রত্যেকটা মানুষকে সক্ষম ও উপার্জনশীল হিসেবে গড়ে তোলা হয়। আমাদের দেশে সেটা করা হয় না। মানুষ যে বুদ্ধি নিয়ে জন্মায়, সেটাকে সঠিকভাবে বিকশিত করতে পারলে আমরা সুপারপাওয়ার হয়ে উঠতে পারব। আমরা মানুষের উন্নতি ঘটানোর বদলে তাদের অক্ষম করে গড়ে তুলছি।
এইভাবে দেশ চলবে আর আমরা প্রশ্ন করব, দরিদ্র মানুষের জন্য কীভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়া যায়! আগে তো প্রত্যেক শিশুর জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করা হোক। তারা শিক্ষিত হলে, এগিয়ে গেলে, সমাজেরও উন্নতি হবে। দারিদ্র আমরা তৈরি করছি। আমরা চাই না, আমাদের দেশ এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসুক।
ভারত বাস করে গ্রামে। আপনি গ্রামীণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সেখানকার অভিজ্ঞতা একটু বলুন।
ডা. সেনগুপ্ত : এখানেও সেই শিক্ষার কথাটা বলতে হয়। যেহেতু শিক্ষার ব্যবস্থা ঠিকঠাক করা হয়নি, তাই ডাক্তারের সংখ্যা কম। প্রত্যন্ত এলাকায় যেহেতু ন্যূনতম পরিকাঠামো ঠিকভাবে করা হয়নি, তাই শহরের মানুষরা গ্রামে যেতে চান না আর গ্রামের মানুষরা শহরে এলে ফিরে যেতে চান না। আমাদের দেশের ৭৭ শতাংশ মানুষ গ্রামে থাকেন। এঁদের চিকিৎসা করার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকের সাংঘাতিক অভাব। ফলে নির্ভর করতে হয় গ্রামীণ চিকিৎসা কর্মীদের উপর। এই রুরাল মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনার, হাতুড়ে বা কোয়াক যাই বলুন, এদের হাতেই রয়েছে দেশের ৬৮.৭% মানুষের চিকিৎসার ভার।
কিডনি কেয়ার সোসাইটির সচেতনতা শিবির
এই গ্রামীণ চিকিৎসা কর্মীদের যদি ঠিকঠাক প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, অজ্ঞতার কারণে তাঁরা যে ভুলগুলি করেন, সেগুলি শুধরে দেওয়া যায়, তা হলে গ্রামের স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি ঘটবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমরা গ্রামে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। বাঁকুড়ার গ্রামের কোনও মানুষের অসুখ হলে তিনি সহজে প্রতীম সেনগুপ্তের কাছে পৌঁছাতে পারবেন না। তাঁকে যে গ্রামীণ ডাক্তার দেখবেন, তিনি যাতে সঠিক চিকিৎসা করতে পারেন, তার জন্য আমরা কোর্স করিয়েছিলাম। বেশি পেইনকিলার বা অ্যান্টিবায়োটিক দিলে কী ক্ষতি হতে পারে, কী সমস্যা হতে পারে ডিহাইড্রেশন হলে ইত্যাদি বিষয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কী করণীয় ও কী করা যাবে না, এটা বোঝানোই আমাদের লক্ষ্য ছিল।
রোগের চিকিৎসা তো নিশ্চয়ই করতে হবে, তার সঙ্গে রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে রোগীদের সচেতন করা আমাদের বৃহত্তর দায়িত্ব। আমরা অনেকেই হয়তো সেটা পালন করে উঠতে পারি না।
গরিব মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে বেশ সাড়া জাগিয়ে শুরু হয়েছিল দিল্লির মহল্লা ক্লিনিক। এই ভাবনাটা আপনার কেমন লাগে?
ডা. সেনগুপ্ত : এটা রাজনৈতিক চমক ছাড়া কিছু নয়। এর উদ্দেশ্য হয়তো মহৎ, কিন্তু পরিকল্পনা ও পরিকাঠামো ছাড়া কীভাবে পরিষেবা দেওয়া সম্ভব? তাই এখন অনেক মহল্লা ক্লিনিক বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একজন সরকারি চিকিৎসককে জোর করা হচ্ছে পরিষেবা দেওয়ার জন্য, পরিকাঠামো ছাড়া তাঁর পক্ষে সেটা সম্ভব কি না দেখতে হবে। এই চমকের বাইরে গিয়ে আমাদের আরও বেশি মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করতে হবে। আরও বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক তুলে আনতে হবে। কিন্তু মেডিক্যাল শিক্ষার যে অবস্থা এখন হয়েছে, তা খুবই চিন্তার।
একইসঙ্গে দেশের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ জন্মগ্রহণ করলে অক্সিজেন নেয়, তার জন্য টাকা দিতে হয় না। তেমনই দেশের মানুষ চিকিৎসা পাবে, কিন্তু তার জন্য যেন তাকে খরচের কথা ভাবতে না হয়। আমরা শুধু গিমিকের পেছনে ছুটি। গিমিক দিয়ে কোনও ভালো কাজ হয় না।
এবার একেবারে আপনার বিষয়ে আসি। কিডনির অসুখ ও তার চিকিৎসা। ভারতে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে কেন?
ডা. সেনগুপ্ত : শুধু ভারতে নয়, সারা পৃথিবীতে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের দেশে বাড়ছে এই অসুখ বাড়ছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের রোগ বেড়ে যাওয়ায়। পুষ্টিকর খাওয়ার অভ্যাস নেই, শারীরিক পরিশ্রম ঠিকঠাক করা হয় না। এর সঙ্গে রয়েছে দোকান থেকে কিনে যথেচ্ছ ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা। অনেক ওষুধ একেবারে নিরাপদ নয়। এসব কারণে কিডনি রোগ বাড়ছে।
আপনি কিডনির চিকিৎসায় অন্যান্য সিস্টেম অফ মেডিসিন প্রয়োগ করছেন। যোগাভ্যাস কীভাবে কিডনি রোগীর পক্ষে সহায়ক হতে পারে?
ডা. সেনগুপ্ত : যোগাভ্যাস শুধু কিডনির জন্য নয়, একটা মানুষের সার্বিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য জরুরি। যোগের মাধ্যমে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ যেমন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তেমনই হার্ট, কিডনি ভালো থাকে। তবে যিনি গুরুতর কিডনির অসুখে ভুগছেন, তিনি কিছু যোগ অভ্যাস করলে তাঁর ক্রিয়েটিনিন কমে যাবে, এই দাবি একেবারে ঠিক নয়। কিন্তু যাঁর কিডনির অসুখ সদ্য ধরা পড়েছে, কিছুটা বেড়েছে ক্রিয়েটিনিন, তিনি যোগের মাধ্যমে অনেকটা সুস্থ থাকতে পারেন। তাঁর ক্রিয়েটিনিন বৃদ্ধিকে কিছুটা সামলে রাখা যেতে পারে। তাই আমি নিজে যোগ অনুশীলন করি, অন্যদেরও বলি।
কিডনি কেয়ার সোসাইটি
এক্ষেত্রে আপনাদের মুক্তি শিবির কতটা সহায়ক হচ্ছে?
ডা. সেনগুপ্ত : বছর দশেক আগে আমরা মুক্তি প্রকল্পটা শুরু করি। প্রায় হাজার তিনেক মানুষ নিয়মিত মুক্তি প্র্যাকটিস করেন। এর মাধ্যমে আমরা ফুসফুস আর কিডনিকে ভালো রাখার চেষ্টা করি। ফুসফুসকে যেহেতু বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাই ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমরা কিছু যোগের কথা বলি। এতে সার্বিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়।
এখানে প্রত্যেক রোগের আলাদা আলাদা চরিত্র অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন প্র্যাকটিস দেওয়া হয়। যাঁরা এগুলি অনুসরণ করেন, তাঁদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে, ঘুম ভালো হয়। এঁদের উদ্দীপনা, উদ্যম থাকে যথেষ্ট, খিদে ভালো হয় আর মনের মধ্যে ইতিবাচক ভাবনা জেগে ওঠে। শুধু কিডনি রোগী নয়, যাদের ক্রনিক অসুখ আছে, প্রত্যেকেই মুক্তি প্র্যাকটিস করতে পারেন।
একজন সিনিয়র ফিজিশিয়ান হিসেবে আপনি চিকিৎসকদের কাছে কী আশা করেন? চিকিৎসক দিবসে যদি কোনও বার্তা দিতে চান।
ডা. সেনগুপ্ত : আমার চিকিৎসক সহকর্মীদের বলতে চাই, রোগের চিকিৎসা তো নিশ্চয়ই করতে হবে, তার সঙ্গে রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে রোগীদের সচেতন করা আমাদের বৃহত্তর দায়িত্ব। আমরা অনেকেই হয়তো সেটা পালন করে উঠতে পারি না। তবে অল্প সময় হলেও এই বিষয়টির জন্য আমাদের ব্যয় করতে হবে।
চিকিৎসক দিবসে সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলব, এমনভাবে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখুন, যাতে আপনাদের চিকিৎসকের কাছে যেতেই না হয়। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম মেনে চলুন। শরীরের উপর অত্যাচার করবেন না, যাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন ও হাজার হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়।

