অনুবাদের অনুভবে কত শক্তি আছে, সে কথা কেউ মনে রাখিনি

‘শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা : অবচেতনের উদ্ধার’ শীর্ষক একটি লেখায় জয় গোস্বামী (Joy Goswami) বলছেন, “…সম্প্রতি বেরিয়েছে শক্তির অনুবাদ করা সমস্ত কবিতা নিয়ে ‘অনুবাদিত পদ্য’ নামক খুবই মূল্যবান এক গ্রন্থ। শক্তি যে এত কবিতা অনুবাদ করে গেছেন, শক্তির জীবৎকালে সে কথা যেন কেউ মনে রাখিনি আমরা।”

হ্যাঁ, শক্তির অনুবাদ অনেকেই এড়িয়ে গিয়েছেন। ৫০টি কাব্যগ্রন্থ বাদে অনুবাদের অনুভবে যে কত শক্তি আছে, সে কথা কেউ মনে রাখেনি। প্রকৃত কবিদের ঘড়া সবসময় পূর্ণ থাকে, একটু টোকা লাগলেই যেন ছলকে পড়বে কবিতা। শব্দ, যা কবিদের মাথার ভিতর সারাক্ষণ পপকর্নের মতো ফাটে। সে এক কেলেঙ্কারি অবস্থা, সামলে উঠতে পারা যায় না, আর যারা বেসামাল হয়ে অথবা সামলে উঠে শব্দকে ‘সুপারপাওয়ার’ দেয় – সঠিক গড়ন দেয়, তারাই তো কবি। যেমন শক্তি চট্টোপাধ্যায় (Shakti Chattopadhyay)।

নেরুদার প্রেমের কবিতার মেজাজের কোনও পার্থক্য খুঁজে পাইনি আমি কারণ ভাষাকে সহজাতভাবেই ‘ব্যাকরণ’ ভাবেননি তিনি। তাহলে শব্দের প্রতিমায় আর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হত না। ভাতে মারা যায় কিন্তু ভাষা দিয়ে কবিকে মারা যায় না।

আজ রাতে আমি লিখতে পারি

আজ রাতে আমি সেই বিষণ্ণ শব্দগুলো লিখে উঠতে পারি।

লিখতে পারি, যেমন ধরা যাক : ‘এই রাত তারকাখচিত ঘন নীল আর ওরা দূরে বসে কাঁপে।’

রাতের বাতাস আকাশে ঘুরপাক খায় আর গান করে।

আজ রাতে আমি সেই বিষণ্ণ শব্দগুলো লিখে ফেলতে পারি,

আমি ভালোবাসতাম, আর সে-ও, সময় পেলে,

আমায় ভালোবাসতো।

কবিতাটা যখন প্রথম পড়ছি ঘুণাক্ষরে টের পাইনি চিলির কবি পাবলো নেরুদার (Pablo Neruda) লেখা, স্প্যানিশ ভাষার একটি প্রেমের কবিতা এটা। অনুবাদ করেছিলেন শক্তি। শুধু এই কবিতাটা নয়, নেরুদার একগুচ্ছ প্রেমের কবিতা অনুবাদ করেছেন তিনি। “সারাদিন ভেঙেছো পাথর/ পাহাড়ের কোলে/ আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে/ তোমারও তো শ্রান্ত হলো মুঠি/ অন্যায় হবে না – নাও ছুটি/ বিদেশেই চলো/ যে কথা বলনি আগে, এ-বছর সেই কথা বলো।” শক্তির প্রেমের পদ্য ‘এবার হয়েছে সন্ধ্যা’র এই পক্তির সঙ্গে নেরুদার প্রেমের কবিতার মেজাজের কোনও পার্থক্য খুঁজে পাইনি আমি। কারণ, ভাষাকে সহজাতভাবেই ‘ব্যাকরণ’ ভাবেননি তিনি। তাহলে শব্দের প্রতিমায় আর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হত না।

শোনা যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্র থাকাকালীন তাঁকে বিদেশি কবিদের কবিতা অনুবাদে উদ্বুদ্ধ করে বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সান্নিধ্য। বিভিন্ন সময়ে তিনি অনুবাদ করেন ওমর খৈয়াম, গালিব, কালিদাস, হাইনে, লোরকা, মায়াকোভস্কি, রিল্কে, পাবলো নেরুদা, প্রীতীশ নন্দীর কবিতা।

কবিদের ভাষার মানচিত্রে কোনও সীমারেখা নেই। যখন সে দেখে অন্য কোনও দেশের, অন্য কোনও ভাষার কবিতার সঙ্গে নিজের কবিতার মসৃণ ভাব বিনিময় ঘটছে, তখন কবি সেই ভাবকে নিজের ভাষায় অনুবাদ করতে প্রেরণা পায়। কবিতা ও কবিদের সবাই বোঝে না, কেউ কেউ বোঝে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও (Rabindranath Tagore) মনে করতেন কবিতা অনুবাদ করা যায় না। কবিতা নাকি অননুবাদ্য! অথচ নিজেই দেশি-বিদেশি অনেক কবির কবিতা থেকে অংশবিশেষ অনুবাদ করেছেন, দান্তে করেছেন, ইয়েটসের সাথে যৌথভাবে নিজের কবিতার অনুবাদও করেছেন। তাঁর আগে চণ্ডীদাস, মধুসূদনও অনুবাদ করেছেন। চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এ জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ থেকে কিছু ভাবানুবাদ সাদৃশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। মধুসূদন লাঁ ফতেনের কবিতা অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন। এছাড়া বাংলা কবিতার মধ্যযুগের অধিকাংশ কবি সংস্কৃত ভাষা ভালো জানতেন। মঙ্গলকাব্য, পদাবলী আর বৈষ্ণব কাব্যেও ভাবানুবাদের প্রভাব আছে। আধুনিককালে রাজশেখর বসু, কালীপ্রসন্ন সিংহ বা হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের রামায়ণ আর মহাভারতের গদ্যে কাব্যময় সারানুবাদ করেছেন। নজরুলের অনুবাদও তাঁর স্বাতন্ত্র, স্বক্রিয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রপরবর্তী সময় থেকে এখনও পর্যন্ত বহু কবি বাংলা ভাষায় তুরীয় সব অনুবাদের বই প্রকাশ করেছেন।

কবিতাকে ‘পদ্য’ বলতেন শক্তি। চুড়ান্ত খ্যাতির অধিকারী এই কবি বিভিন্ন সময়ে অনুবাদ করেছেন অসংখ্য কবিতা। শোনা যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের ছাত্র থাকাকালীন তাঁকে বিদেশি কবিদের কবিতা অনুবাদে উদ্বুদ্ধ করে বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সান্নিধ্য। বিভিন্ন সময়ে তিনি অনুবাদ করেন ওমর খৈয়াম, গালিব, কালিদাস, হাইনে, লোরকা, মায়াকোভস্কি, রিল্‌কে, পাবলো নেরুদা, প্রীতীশ নন্দীর কবিতা। গীতা অনুবাদেও তাঁর উৎসাহ ছিল বরাবর। ভারতীয় ভিন্নভাষী কবিদের কবিতা বাংলাভাষায় অনুবাদ করার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেছিলেন তিনি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের গ্রন্থাকারে প্রকাশিত এবং অগ্রন্থিত সব অনুবাদের অমূল্য সংকলন ‘অনুবাদিত পদ্য’, যা ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় সিগনেট প্রেস থেকে। এই বই কবিতাপাঠকের কাছে কতটা পৌঁছেছে জানি না, তবে এ কথা বারবার বলতে পারি যে, বেলাগাম ঘোড় সওয়ারীর মতো বাংলা ভাষার কবিমহলে ‘কেউ কেউ কবি’র তালিকায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন, আছেন এবং থাকবেনও।

Written by