লাইনের বিন্যাস ঘটিয়ে কীভাবে ছবিতে চোখের মুভমেন্ট করা যায়, আজও শেখাচ্ছেন নন্দলাল

 

০২৫-এর শেষে দাঁড়িয়ে নন্দলাল বসুকে নিয়ে কোনখান থেকে লেখা শুরু করব ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল আমার মামাবাড়ির আলমারিতে আটকানো একটা ছবির কথা। কাগজ কাটা একটা গান্ধির ছবি, লাঠি নিয়ে হাঁটছেন। নিচে লেখা বাপুজি, পাশে নন্দলাল বসু-র সাক্ষর, তারিখ ১২/০৪/১৯৩০। নন্দলালবাবুর ছবির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল অনেক আগে সেই সহজপাঠেই। কিন্তু ওই গান্ধির ছবিতে কিছু একটা ছিল, দেখলেই মনে হত এই বুঝি হেঁটে ছবি থেকে বেরিয়ে যাবেন, সবটাই খুব জীবন্ত। সেটা দেখে দেখে অনেকবার এঁকেওছিলাম। আসলে নন্দলাল বসুর ছবি দেখেছি জীবনের বিভিন্ন পর্বে। তখন বেশিরভাগ ছবি দেখার সুযোগ ছিল কাগজে অথবা বইয়ের নানান ইলাস্ট্রেশনে। ডিজিটাল মাধ্যমে দেখার সুযোগ ছিল তুলনামূলক কম। মাঝে মধ্যে শনি-রবিবারের কাগজে তাঁকে নিয়ে লিখতেন বিখ্যাত মানুষরা, তাঁর ছাত্ররা।

বড়দার মহারাজা সায়াজিরাও গাইকোয়াড তাঁর পূর্বসূরীদের উদ্দেশ্যে ১৯৩৬ সালে নির্মাণ করেন ‘কীর্তি মন্দির’। মন্দিরের ভিতরের দেওয়ালে নানান পৌরাণিক কাহিনির ছবি আঁকেন নন্দলালবাবু। এ কথা আজও অনেকে জানেন না।

নন্দলাল বসুর আঁকা মহাত্মা গান্ধি, লিনোকাট

পরবর্তীকালে যখন কলকাতার আর্ট কলেজে ভর্তি হলাম, জানতে পারলাম তাঁর লেখা ‘দৃষ্টি ও সৃষ্টি’ বইটির কথা। লাইব্রেরিতে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া গেল সেই বই, একটু একটু করে পড়া শুরু করলাম। বইটিতে নন্দলালবাবু আলোচনা করেছেন শিল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে। এঁকেও বুঝিয়েছেন কীভাবে কী করতে হয়। মনে অনেক প্রশ্ন জমাট বাঁধল, যার সব উওর পাওয়া গেল সেই বইতেই। এ যেন আমারই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন তিনি। সেই বই পড়ে নন্দলাল বসুর আঁকা ছবি আবার নতুন করে দেখতে ও বুঝতে শিখলাম যেন। তাঁর রেখার ভঙ্গি ও ভাবনার বলিষ্ঠতা বারবার অনুপ্রাণিত করেছে। এমনকি ড্রয়িং থেকে দেখে দেখে এঁকেওছি অনেকবার।

এই ভাবে কেটে গেল চার বছর। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন। সুযোগ পেলাম গুজরাতের বড়দায়। সেই বড়দা, যে অঞ্চলের সঙ্গে নন্দলাল বসুর নিবিড় যোগাযোগ। বড়দার মহারাজা সায়াজিরাও গাইকোয়াড তাঁর পূর্বসূরীদের উদ্দেশ্যে ১৯৩৬ সালে নির্মাণ করেন ‘কীর্তি মন্দির’। মন্দিরের ভিতরের দেওয়ালে নানান পৌরাণিক কাহিনির ছবি আঁকেন নন্দলালবাবু। এ কথা আজও অনেকে জানেন না।

কীর্তি মন্দিরের গায়ে বৃহদাকার শিব, নন্দলাল বসুর আঁকা

অজন্তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নন্দলাল কীর্তি মন্দিরের ভিতরে দরজার ওপরে আঁকেন বাল্মীকি রামায়ণ-এর গঙ্গাবতরণ প্যানেলটি। সেখানে লাইনের বিন্যাস প্রথম দেখাতেই আমাকে বিস্মিত করেছিল। মাঝে বৃহদাকার শিব দাঁড়িয়ে, তার চারিদিকে ডেকরেটিভ লাইন। শিবের তিনটি মাথা ও ছটা হাত, পিছনে আগুনের রূপ। এগ টেম্পারায় করা এই ম্যুরালটি। এছাড়াও তিনি কীর্তি মন্দিরে এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘নটীর পূজা’-র বেশ কিছু দৃশ্য। এঁকেছেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এবং মীরাবাঈ। ফিগারগুলির বলিষ্ঠতা, কম্পোজিশন, লাইন ও প্যাটার্নের বিন্যাস এত বছর পরেও শিল্পপ্রেমীদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়াও নন্দলাল কীর্তি মন্দিরে এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘নটীর পূজা’-র বেশ কিছু দৃশ্য। এঁকেছেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এবং মীরাবাঈ। ফিগারগুলির বলিষ্ঠতা, কম্পোজিশন, লাইন ও প্যাটার্নের বিন্যাস এত বছর পরেও শিল্পপ্রেমীদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।

কীর্তি মন্দিরের গায়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, নন্দলাল বসুর আঁকা

আমি নিজে এখন চলমান চিত্র নিয়ে কাজ করছি। আর্ট ও টেকনোলজিকে নিয়ে নাড়াঘাটা করছি। সেখানে যখনই কোনো কারণে আটকে যাই, ফিরে আসি নন্দলাল বসুর আঁকার কাছে। তাঁর লেখা ও জীবনী ভীষণভাবে প্রভাবিত করে প্রতি মুহূর্তে। এখন চটজলদির যুগে যেখানে ইমেজ মেকিংয়ের পদ্ধতি এত উন্নত ও সহজ হয়েছে, সেখানে নন্দলাল বসুর কথা, লেখা ও আঁকা নবীণ শিল্পীদের পথ দেখায়। লাইনের বিন্যাস ঘটিয়ে কীভাবে ছবিতে চোখের মুভমেন্ট করা যায়, তা এখনও শিখছি মাস্টারমশাই নন্দলালবাবুর কাজগুলো থেকে।

Written by