
১৯৭২ সালে শেষ চলচ্চিত্র ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো’-র সময় যে ঋত্বিক ঘটক (Ritwik Ghatak) বলবেন, ‘আমার কোনো থিওরি নেই’ কিংবা ‘ছবিতে আমি স্লোগানে বিশ্বাস করি না’, সেই মানুষটিরই চিত্রপরিচালক জীবনের প্রথম সিনেমা হিসেবে আমরা পাই একটি আদ্যোপান্ত বামপন্থী রাজনীতি-সোচ্চার, ডাইরেক্ট সিনেমা – ‘নাগরিক’ (১৯৫২) – গণনাট্য সঙ্ঘ থেকে উঠে আসা এক কমিউনিস্ট-সোশ্যালিস্ট লেখক-নাট্যকর্মীর সিনেমাকে প্রথমবার মাধ্যম হিসেবে হাতে তুলে নেওয়ার স্বাক্ষর। বেঙ্গল ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে, ‘অপরাজিত’-র সম্পাদনার সময় ১৯৫৬ সালে সত্যজিৎ রায় জানতে পারেন সেখানেই রয়েছে ঋত্বিক ঘটকের প্রথম চলচ্চিত্রের ফিল্ম। সত্যজিৎ লিখছেন, “তৎক্ষণাৎ আমরা সেই ছবি দেখি। খুবই অসুবিধার মধ্যে তোলা হয়েছিল ছবিটা, সেটা দেখলেই বোঝা যায়। তার বাইরের পালিশ একদম নেই বলতে গেলে, কিন্তু তাও তার মধ্যে কতকগুলো এমন গুণের পরিচয় আমি পেয়েছিলাম যে তাতে এই নবীন পরিচালকের সম্বন্ধে একটা প্রচণ্ড শ্রদ্ধা জাগে আমার মনে।”
সিনেমা শুরু হয় ক্যামেরায় আকাশ দেখিয়ে এবং নেমে আসে মাটিতে, নদীতে। এ নদী স্বপ্নের সুবর্ণরেখা, আদরের তিতাস নয়। ঋত্বিকের আবহকণ্ঠে শুনি “কঠিন লোহার বাঁধনের তরে নীরবে যেখানে বয়ে চলেছে” – ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন-এর পথচিহ্নের মতন কলকারখানার পাশ ঘেঁষে, মহানগরের অযত্নের নদী। আবহকণ্ঠ আবার বলে, “আমি তাকে চিনি, আমি তাকে দেখেছিলাম। দাঁড়িয়ে আছে মহানগর।” আকাশ থেকে, নদী থেকে ক্যামেরা নেমে আসে কংক্রিটের মাটিতে, মানুষের স্রোতে – “…দেখেছিলাম, অযুত-নিযুত নাগরিকের মাঝে, একটিমাত্র নাগরিক।”

১৯৭৭ সালে ঋত্বিকের মৃত্যুর পরে মুক্তি পাওয়া ‘নাগরিক’ যখন ১৯৫২ সালে তৈরি হয়, তখন সাতাশ বছর বয়সী ঋত্বিক বছরখানেক হলো আইপিটিএ-তে যুক্ত হয়ে নাটকের কাজে সমাদৃত হচ্ছেন বিপুলভাবে। গ্রুপ-থিয়েটারে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি চলছে তাঁর নিজের নাটক লেখা, অনুবাদ ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নাগরিক-এর লেখায়, দৃশ্যসজ্জায় এবং সামগ্রিক পরিচালনায়। সত্যজিৎ লিখছেন, “তার কিছুকাল পরে অযান্ত্রিক-এর আবির্ভাব। নাগরিক ছবি বাজারে দেখানো হয়নি। ‘অযান্ত্রিক’ ছবির প্রথম শো-তে আমি উপস্থিত ছিলাম। এবং সে ছবি দেখে বুঝতে পেরেছিলাম একজন সত্যিকারের শিল্পী যদি সত্যিকারের কাজের সুযোগ পায়, তাহলে সে একধাপে কতদূর এগিয়ে যেতে পারে।” সময় হিসেবে, নাগরিক আর অযান্ত্রিকের মাঝে তফাৎ প্রায় ছয় বছর। এমন কয়েকটি বছর যা ঋত্বিকের জীবনে একরৈখিক নয়, বরং এই সময়েই প্রেম এবং রাজনীতির তীব্রতা এবং ১৯৫৫ সালে বিবাহের পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে অপসারণ। আঘাত তীব্রতর হয় ১৯৫৪-৫৫-তেই আইপিটিএ-র সঙ্গে তাঁর আদর্শগত দূরত্ব এবং শেষমেশ আইপিটিএ ছাড়তে বাধ্য হওয়ায়। আমরা বুঝতে পারবো, কেন বা কীভাবে সিনেমার ওই একধাপ এগিয়ে যাওয়া আসলে হয়তো ঋত্বিকের ক্ষেত্রে প্রায় জীবন-বদলের সমানুপাতিক।
এখানে একটু থেমে আমরা খানিকটা পিছন ফিরে দেখে নেবো, বাংলা চলচ্চিত্রের এক আশ্চর্য পর্বের দিকে। বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিধ্বস্ত ইউরোপ চলচ্চিত্রের যে সোনার ফসল ঘরে তুলতে শুরু করে ১৯৪০ জুড়ে, তা মাত্র এক দশকের মধ্যেই দুর্ভিক্ষ-দারিদ্রের এই সুদূর তৃতীয় বিশ্বের এক ছোট্ট শিল্পীগোষ্ঠীর হাতে ধরা দেয় আশ্চর্য মন্ত্রবলে। ঋত্বিক ঘটকের শতবর্ষের পাশাপাশি, নির্দিষ্ট সন-তারিখ না থাকলেও সেই গোটা নব্যপ্রবাহেরও আনুমানিক পঁচাত্তর বছর নিঃশব্দে এসে পড়েছে এই ২০২৫ সালে।
’৫০-এর দশক এবং চলচ্চিত্র
১৯৫০ সাল। বাংলা সিনেমায় মুক্তি পাচ্ছে, কালীপ্রসাদ ঘোষের জীবনীচিত্রণ ছবি ‘বিদ্যাসাগর’, মনু সেনের সাহিত্যনির্ভর ছবি ‘বৈকুন্ঠের উইল’, নরেশ মিত্র হরর ফিল্ম ‘কঙ্কাল’। আবার সেই একই বছরে সামাজিক বাস্তবতার ধারার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রেমেন্দ্র মিত্রর ‘কাঁকনতলা লাইট রেলওয়ে’। ১৯৫১-তে দেখছি সতীশ ঘোষের ‘আনন্দমঠ’, অজয় করের ‘জিঘাংসা’ এবং প্রাসঙ্গিকভাবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, নিমাই ঘোষের চিরস্থায়ী ছবি ‘ছিন্নমূল’, যেখানে ছাব্বিশ বছরের যুবক ঋত্বিক প্রথম সরাসরি চলচ্চিত্র নির্মাণে জড়িয়ে পড়ছেন সার্বিকভাবে এবং অভিনয়ও করছেন বড়োপর্দায়। ছবির রূপদানের ক্ষেত্রেও ডক্যুমেন্টারির থেকে তথ্যনির্ভর-ফিচার ফিল্মের দিকে এগিয়ে আসার পথে ঋত্বিকের চলচ্চিত্র ভাবনার প্রাথমিক অবদান ছিল যথেষ্ট। বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম সোশ্যালিস্ট ও সর্বহারার গল্প-বলা ‘ছিন্নমূল’কেই ঋত্বিকের সিনেমার কাজের মূল ধাপ বলে ধরা হলেও, তার ঠিক আগেই তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে মনোজ ভট্টাচার্যের ‘তথাপি’ ছবিতে যুক্ত ছিলেন।
১৯৭৭ সালে ঋত্বিকের মৃত্যুর পরে মুক্তি পাওয়া ‘নাগরিক’ যখন ১৯৫২ সালে তৈরি হয়, তখন সাতাশ বছর বয়সী ঋত্বিক বছরখানেক হলো আইপিটিএ-তে যুক্ত হয়ে নাটকের কাজে সমাদৃত হচ্ছেন বিপুলভাবে। গ্রুপ-থিয়েটারে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি চলছে তাঁর নিজের নাটক লেখা, অনুবাদ ইত্যাদি। স্বাভাবিকভাবেই এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নাগরিক-এর লেখায়, দৃশ্যসজ্জায় এবং সামগ্রিক পরিচালনায়।
থিয়েটারের মানুষ হিসেবে ঋত্বিকের সিনেমার এক্সপোজারকে বুঝতে গেলে আমরা দেখবো, এই ‘তথাপি’ ছবিটি ছিল স্বয়ং বিমল রায়ের চিত্রনাট্য এবং তিনি নিজে এই ছবির পরিচালনার তত্ত্বাবধান করেছিলেন। ভারতীয় রিয়্যালিজমের সচেতন পথিকৃৎ হিসেবে, মনে রাখা দরকার যে, ছ’বছর আগেই বিমল রায় তাঁর প্রথম ছবি তৈরি করেছেন ‘উদয়ের পথে’ (১৯৪৪) এবং ১৯৫৩-তে ‘দো বিঘা জমিন’। বিমল রায়ের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ কাজের মাঝের সময়টায় তৈরি হচ্ছে উল্লিখিত অন্যান্য একাধিক ছবি, যার প্রত্যেকটিই সাতমহলা স্বপ্নপুরীর একেকটি ভিত্তিপ্রস্তর। এই আবহে, এই সিনেমাগুলির এক-দেড় বছরের মধ্যেই তাই ১৯৫২ সালে ঋত্বিক তাঁর নিজের পরিচালক জীবন শুরু করছেন এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে, বাংলা চলচ্চিত্রে আরও সরাসরি এসে ঝাপটা দিচ্ছে তাঁর নিজস্ব ‘নিউ ওয়েভ’।
আমরা জানি, ইতালিয়ান নিও-রিয়্যালিজমের একটি-দুটি উপাদান বিশুদ্ধ ভারতীয় প্রেক্ষাপটে মিশতে শুরু করছে চেতন আনন্দের ‘নীচানগরে’ (১৯৪৬) এবং বাংলা সিনেমায় তারও আগে বিমল রায়ের ‘উদয়ের পথে’ ছবিতে, যা সচেতনভাবে দে সিকার ‘বাইসাইকেল থিভস’ দেখার পরেই নির্মিত। জানি, সামাজিক ভাঙন, রাজনৈতিক আবেগ এবং মানুষের কাছে পৌঁছানোর তাগিদেই সিনেমায় আসছেন ঋত্বিক। তবু, শ্রেণি-চেতনা এবং বিষয়-চেতনার দিকটি ছাড়াও, শৈল্পিক আঙ্গিকেও ‘আর্ট ফিল্ম’ হয়ে ওঠার পথে সমান্তরালে এগিয়ে গিয়েছিল ‘নাগরিক’। এমনকি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম চিত্রগ্রহণের কাজ অথবা সতীন্দ্র ভট্টাচার্যর প্রথম মূল ভূমিকায় অভিনয় করাও বুঝিয়ে দেয়, নিও-রিয়্যালিস্টদের নবাগতদের নিয়ে কাজ করার বৈশিষ্ট্য রয়েছে ‘নাগরিক’-এও। ব্রেখটিয়ান থিয়েটারের ভাব সর্বাঙ্গে ধারণ করেও ‘নাগরিক’ তাই এক বৃহৎ ক্রমপরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ।

রিয়্যালিজম ও মেলোড্রামা
আমরা জানি, মেলোড্রামার ব্যবহার পশ্চিমি দুনিয়ায় এবং তৎকালীন ক্রিটিকদের নজরে ঋত্বিক ঘটকের চিরকালীন ‘অ্যাকিলিস হীল’ হয়ে থেকে গিয়েছিল। তবু এই তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নিয়ে কিছুটা ভূমিকা করার কারণ এই যে, বাংলা সিনেমায় সরাসরি নব্যধারা এসে পড়ার শুরুর বছরগুলিতে কিছু বিশেষ সংমিশ্রণ ও মেলবন্ধন লক্ষণীয়ভাবে ঘটছিল ‘নাগরিক’ ছবিটিতে।
‘অতিনাটকীয়তা’ কথাটায় যতখানি নেতিবাচকতা লেগে থাকে, মূল অর্থে মেলোড্রামা তার থেকে কিছুটা আলাদা। মেলোড্রামা মানেই খারাপ অতি-অভিনয় বা স্থূল অভিব্যক্তিও নয়। মেলোড্রামা ছিল মূলত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং সাধারণ নিপীড়ন থেকে উঠে আসা আখ্যানের একটি বিশেষ ধরন। সাধারণত সেখানে কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং তার একটি ছোটো পরিবার বা গোষ্ঠী থাকবে, যারা বিভিন্ন শোষণ ও বঞ্চনার ভেতর বেঁচে থাকে এবং জীবনের গ্লানিময় অন্ধকারে তাদের সময়কাল ডুবে থাকে। কাজেই, মেলোড্রামা আর রিয়্যালিজম শিল্প হিসেবে তাদের সূচনাবিন্দুতে একে-অপরের বিরোধী নয় বরং বাস্তবের সত্য-নির্ভর প্রেক্ষাপটে একটি অসামান্য গল্প বেঁধে ফেলার মতন জড়িত। সেখানে গল্পের চরিত্রেরা অনন্যভাবে জিতে যাচ্ছে বা হেরে যাচ্ছে, হয়তো শোক-হতাশা-প্রেমের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটছে, কিন্তু কাহিনির বাস্তব-মাটি আজগুবি হয়ে উঠছে না।
বাংলা সিনেমায় সরাসরি নব্যধারা এসে পড়ার শুরুর বছরগুলিতে কিছু বিশেষ সংমিশ্রণ ও মেলবন্ধন লক্ষণীয়ভাবে ঘটছিল ‘নাগরিক’ ছবিটিতে। ‘অতিনাটকীয়তা’ কথাটায় যতখানি নেতিবাচকতা লেগে থাকে, মূল অর্থে মেলোড্রামা তার থেকে কিছুটা আলাদা।

“তোমার পথটাও একদিন বদলাতে হবে রাজা!”
‘নাগরিক’-এর কাহিনির গতি ধীর, নিশ্চিত অন্ধকার ও আকস্মিক আঘাতের অভিমুখী। উত্তর কলকাতার বড়ো বাড়িতে জীবন কাটানো একটি পরিবার যুদ্ধ ও দেশভাগ-পরবর্তী কলকাতায় সরে আসছে একটি অসচ্ছল দু’কামরার পরিবেশে। পরিবারের কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র, শিক্ষিত কর্মক্ষম বেকার ছেলে রামু (সতীন্দ্র ভট্টাচার্য) ‘স্বাভাবিক নিয়মে’ই প্রত্যাশা করে চাকরি জুটিয়ে আবারও পরিবারটির সচ্ছলতার হাল ধরবে। সংসারের পূর্ববর্তী কর্তা, বর্তমানে অসুস্থ বাবার ভূমিকায় কালী ব্যানার্জী চরিত্রটি আদর্শবাদী, সামান্য নীতিবাগীশ। তিনটি নারী চরিত্র – চাকরিহীন স্বামী ও সন্তানের পার্শ্ববর্তিনী রামুর মা, অভাবের সংসারে নিজস্ব ট্র্যাজেডি নিয়ে বসে থাকা রামুর অবিবাহিতা বোন এবং দূরবর্তী আলোর মতন রামুর প্রেমিকা। ক্যামেরার কাজে আমরা বারবার আলো-ছায়ার বৈপরীত্য দেখতে পাই। চরিত্রদের ঘনঘন ক্লোজ-আপে তীব্র অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। পিতা-পুত্রের কথোপকথনে দেখি তাদের মুখের আধখানি আলো, আধখানি অন্ধকারে ঢাকা। আবার সমবয়স্ক যুবকদের কথাবার্তায় আলগা ব্যঙ্গবিদ্রূপ ইঙ্গিত করে সামাজিক অসহায়তা। খিদের হিসেব করে বিয়ে হয় কিনা, এই কথার মাঝে আমরা দেখি মিছিল চলেছে। রামু তাদের সামান্য চাঁদা দিয়েও রাজনৈতিক মিটিংয়ে যায় না, বরং মিছিলের বিপরীত পথ ধরে স্মিতহাস্যে বলে, বাড়ির মিটিংটা সামলাই। পিছন থেকে অস্ফূট সংলাপ শোনা যায়, “তোমার পথটাও একদিন বদলাতে হবে রাজা!” বড়ো বাড়ি ফেলে আসার দুঃখ আর শ্রী-হীন বাড়িটারও ভাড়া মেটাতে না পারার অপমানের ভেতর, ধীরে ধীরে আরও হতদরিদ্র বস্তিতে সরে যাওয়া, এটুকুই কাহিনির গতি। অথচ হঠাৎ শোনা যায়, ঘর-হারানো আশাহীনতার মুখে ‘ইন্টারন্যাশনাল’ বেজে ওঠে এবং একটি হাইপারলোকাল সিনেমার পারিবারিক ব্যক্তিগত মুহূর্তকে হঠাৎ খুব সোচ্চার আবহ এনে দেয়।
একাধিক ওয়াইড অ্যাঙ্গেল শটের ব্যবহার ছবির পটভূমিকার বিস্তারকে ধরতে চেষ্টা করে। যেহেতু নগরসভ্যতা উচ্চতায় বাড়ে, বিস্তারে নয়, তাই ওয়াইড অ্যাঙ্গেল একটা বিপরীত আবেগ তৈরি করে একটি নগরকেন্দ্রিক সিনেমায়। ক্যামেরার প্যানিংয়ে কলকাতা শহরও উঠে আসে জীবনঘেরা এক বৃত্তের মতোই। শুনি মা-ছেলে কথা বলছে, কীভাবে চারিপাশে উঁচু-উঁচু বাড়ি উঠে তাদের ছোটো বাসাবাড়িটাকে ঘিরে ফেলেছে আর মনে হচ্ছে যেন একটা বদ্ধ গর্তে তাদের এই বেঁচে থাকা। সিনেমার প্রথমার্ধের সংলাপে আমরা বারবারই একটা সাময়িক অস্বস্তির সুর শুনতে পাই, যার ভেতরে অসহায়তা নেই অথবা বিপর্যয়ের স্বীকৃতিও নেই। কিন্তু ধীরে-ধীরে চরিত্রদের অসহায়তার ছায়া ফুটে ওঠে পার্শ্ব-চরিত্রদের ভেতরে। নিত্য দুটো বাজার করার পয়সা চাইতে-চাইতেই, সিঁড়ির নিচে বাস করা যতীনবাবুর স্ত্রী একদিন মারা যান, রামুর প্রেমিকার বোন ধীরে ধীরে রূপোপজীবিকায় ঢুকে পড়ে। ভাড়াটে কেমিস্ট সাগরবাবুর চাকরি পাওয়ার মিথ্যেটাও আর চাপা থাকে না, যেমন চাপা থাকে না সীতার উদ্বেগ, প্রেম, মুক্তির ইচ্ছে এবং সমর্পণ। আর ঠিক এইখানেই সিনেমার আখ্যান আশাবাদের রাজনৈতিক প্রপাগ্যান্ডায় শৈল্পিকভাবে একটা ‘লিপ-অফ-ফেথ’ ঘটায় অথবা ‘মেলোড্রামাটিক প্লট’ হিসেবে তার পূর্ণতা পায়। সমাজের ব্ল্যাকহোলে মিথ্যে আশার আলো এসে পড়ে না ঠিকই, তবু ডুবতে-থাকা চরিত্ররা সমাজতান্ত্রিকতার প্রত্যয়ে, সলিডারিটি ও প্রেমের একটা নরম কোণ খুঁজে নেয়। ছোটো একটা পরিবারের গল্প শুনতে এসে আমরা দেখতে পাই, রাস্তায়-ঘাটে, অলি-গলিতে এই প্রথম বাংলা সিনেমার ক্যামেরা ঘোরাফেরা করে ছবির অনেকখানি সময় জুড়ে। মনে করিয়ে দেয়, কলকাতা শহর ও সমাজ এখানে শুধুই গল্পের লোকেশন নয়, বরং ‘স্লাইস অফ লাইফ’ সিনেমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রাত্যহিক, ব্যক্তিগত এবং গোষ্ঠীগত ইতিহাস নির্মাণের অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ। ‘সামান্য সুখে’র ইচ্ছের বিপরীতে যুদ্ধ-দারিদ্র্য-অপসরণের মতন প্রত্যক্ষ সামাজিক উপাদান এই ছবির মেলোড্রামাটিক কেন্দ্রবিন্দুকে নিও-রিয়্যালিজমে প্রতিষ্ঠা করে বারবার।

মানুষের ক্ষুদ্র আশা, অনিশ্চিত অপসারণ এবং আন্তরিক মানবিক দুঃখ সেই প্রথম ছবিতেই ঋত্বিকের ভবিষ্যৎ সব কাজের মতোই দীর্ঘ ছায়া ফেলেছিল। অথচ নাগরিকের সংলাপে নির্মমতা এবং বৈমাত্রেয় দরদ বারবার ফুটে উঠেছে একাধিক স্তরের ব্যঙ্গের মধ্যে দিয়ে। সিনেমা জুড়ে পরিচালক এবং দর্শকের মধ্যে চলে ‘জুভেনালিয়ান স্যাটায়ার’-এর, আর সিনেমার চরিত্রদের নিজেদের মধ্যে প্রায়-প্রাত্যহিক ‘হোরেশিয়ান স্যাটায়ার’। পিতা-পুত্র, মা-মেয়ে, বন্ধু, ভিখারি, ভায়োলিনবাদক, এমনকি ভাড়াটে-বাড়িওয়ালা – বিভিন্ন কথোপকথনের অজস্র সংলাপে গ্লানি এবং শ্লেষ মিশে আছে বিষের মতন।
ঋত্বিক ঘটকের নাগরিক-এর সংলাপভিত্তিক নাটকের ধাঁচ আমাদেরকে সেই অর্থে ‘পিওর সিনেমা’র আনন্দ দেয় না। উপরন্তু প্রায় নষ্ট হয়ে-যাওয়া একটি পজিটিভ প্রিন্ট থেকে উদ্ধার করায় সিনেম্যাটোগ্রাফির কোনো স্পষ্ট এস্থেটিক দিকও দেখতে পারা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবু সোভিয়েত মন্তাজের ধারণা, রমেশ যোশীর সম্পাদনায় দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে স্পর্শকাতর আখ্যান তৈরি করে। আর শেষ পর্যন্ত থেকে যায় অশেষ একটা প্রশ্ন – “নাগরিক জীবনে, অপর প্রান্তে, তার কোন পথে যাত্রা?”, যার উত্তর প্রতি শতাব্দীতেই আমাদের খুঁজে চলতে হবে নিজেদের মতন করে। আর মনে পড়বে ভাস্কর চক্রবর্তীর জাগ্রত দুটো লাইন, “এখন শতাব্দী শেষে চারিদিকে বিষ, তবু / বেঁচে থাকবার মতন নির্জন সাহস দেখা দিলে / দেখা যায় শান্ত পথ শান্ত দিন শান্ত বাড়ি শান্ত সন্ধেবেলা।”

.jpg)