
সার্কাস আর ধীর গতি, সময়ের নিরিখে এমন দুই খাপ-ছাড়া বিষয় নিয়ে ‘বই’ বানিয়েছেন পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। একথা কারোর অজানা নয় যে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে প্রদীপ্তর মতাদর্শ, সৃষ্টির ধরন শুরু থেকেই ‘খাপ-ছাড়া’। বাংলা সিনেমায় প্রান্তিক ও বিকল্প ভাষাকে জিইয়ে রেখেছেন তিনি। ছবিকে ‘বই’ বলেন, এই বাজারে ‘কম্প্রোমাইজ’ না করে মনের মতো সিনেমা বানানোর চেষ্টা করেন। তাঁর ছবিতে বিনোদন হল প্রকৃতির সহজাত রূপ। গতানুগতিক সমাজ থেকে খারিজ হতে থাকা বিভিন্ন কিছু তাঁর সিনেমার বিষয় হয়ে ওঠে; যা একটা সমান্তরাল দুনিয়ায় প্রবেশ করায়, যেখানে মিথ্যে ব্যস্ততা নেই। যে দুনিয়া শিকড়ে টান মারে, দু-দণ্ড ভাবায়। যে দুনিয়া স্বাধীনতার, অনুভবের, ভালোবাসার। এই প্রেমহীন সময়ে সিনেমার মাধ্যমে তিনি বলতে পারেন “…ভালোবাসি, অন্ধকারেই চলো জোনাকিকে ডেকে নিয়ে আসি”। যতদূর জানা যাচ্ছে, ‘নধরের ভেলা’ তার ব্যতিক্রম নয়। রটারডাম, টরেন্টোর চলচ্চিত্র উৎসবে সমাদৃত এই ছবিটি এবার বাংলায়। ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে (ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজেস) একমাত্র ভারতীয় তথা বাংলা ছবি এটি।
প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের এই ছবিতে দেখা যাবে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বাংলার সার্কাস। দেখা যাবে ‘জড়ভরত’ নধরকে। দুর্ঘটনার প্রকোপ থেকে প্রাণে বাঁচলেও, সে বেঁচে থাকে মরার মতো। একসময় পরিস্থিতি তাকে সার্কাসের হট্টগোলে ঢুকিয়ে দেয়। কিন্তু সেখানে সে কী করবে? গতিশীল উচ্চাকাঙ্ক্ষী জগৎ-সংসার এবং একজন অকেজো সাবঅল্টার্ন মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কটা কীরকম, সেটাই এ ছবির দ্রষ্টব্য। “বর্তমানে বাংলা সার্কাস মৃত। সিনেমার মধ্যে দিয়ে সেটা আর একবার বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আর নধরের চরিত্রটা ভেবেছিলাম, এই ছুটন্ত সময়ের মধ্যে ধীর গতির একটা মানুষকে ফেলে দিলে কী হয়, তা দেখতে।” বলছিলেন জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী পরিচালক।
শুধু সার্কাস কেন, মানুষের জীবন থেকে স্থিরতা হারিয়ে গেছে। মানুষের ভাববার সময় নেই। এত দৌড়, এত প্রতিযোগিতা থেকে আদৌ কি লাভ হয়েছে কিছু? পৃথিবীতে অসভ্যতা, অমানবিকতা আরও বেড়েছে।

যখন সার্কাস বেঁচে ছিল, তাকে ঘিরে কিছু মানুষ বেঁচে ছিল। প্রান্তিক, অবহেলিত কিছু মানুষদের জন্য সার্কাস ছিল আলাদা একটা পৃথিবী। তারাও ভালোবাসতো, স্বপ্ন দেখতো। সেই পৃথিবীর ভেতরটা কেমন, তথাকথিত ভদ্রসমাজ জানতে চায়নি কখনও। দুঃখের ওপর চড়া রং লেপে তারা এই পৃথিবীর মনোরঞ্জন করতো। ধুঁকতে ধুঁকতে ক্রমশ হারিয়ে গেছে সার্কাসের পৃথিবী, সেখানকার বাসিন্দারা। শুধু সার্কাস কেন, মানুষের জীবন থেকে স্থিরতা হারিয়ে গেছে। মানুষের ভাববার সময় নেই। এত দৌড়, এত প্রতিযোগিতা থেকে আদৌ কি লাভ হয়েছে কিছু? পৃথিবীতে অসভ্যতা, অমানবিকতা আরও বেড়েছে। পৃথিবী জুড়ে নকল সার্কাস চলছে, মিথ্যে সভ্যতার ক্লাউন সেজেছে মানুষ। ‘নধরের ভেলা’ তাই গতির বিপরীতে ভেসে চলে। চিত্রনাট্য, সম্পাদনা, পরিচালনা – এই তিনদিক একাই সামলেছেন প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। মাত্র ১৩ দিনে শ্যুট হয়েছে সম্পূর্ণ ছবিটি।
নধরের ভূমিকায় অমিত সাহা ইতিমধ্যেই প্রশংসিত। অমিত ছাড়াও ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী, প্রিয়াঙ্কা সরকার, অপরাজিতা ঘোষ, সায়ন ঘোষ, শতাক্ষী নন্দী, কৌশিক রায়, জয়ন্ত মুখার্জি, সোহম মৈত্র, নিলয় সমীরণ নন্দী, কস্তুরী চ্যাটার্জি, বাসুদেব হালদার, চঞ্চল কুণ্ডু, সত্রাবিৎ পাল। ছায়ামৃগ প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে ‘নধরের ভেলা’ প্রযোজনা করেছে ১৮০ ডিগ্রি। সংগীতায়োজনে সাত্যকি ব্যানার্জি। দৃশ্যবিন্যাসে জয়দীপ দে, শিল্পনির্দেশনায় সঞ্জীত হালদার। প্রদীপ্তর প্রতিটি সিনেমার পোস্টারই আলাদা করে নজর কাড়ে, যেমন ভাবে নজর কাড়তো ৫০-৬০-৭০ দশকের পোস্টারগুলো। এ ছবির জন্য পোস্টার করেছেন কৌশিক মিত্র।
পৃথিবী জুড়ে নকল সার্কাস চলছে, মিথ্যে সভ্যতার ক্লাউন সেজেছে মানুষ। ‘নধরের ভেলা’ তাই গতির বিপরীতে ভেসে চলে। মাত্র ১৩ দিনে শ্যুট হয়েছে সম্পূর্ণ ছবিটি।

ইতিমধ্যে ছবিটি বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হওয়ার ফলে অনেকেই দেখে ফেলেছেন। প্রচুর মানুষ দেখতে চলেছেন কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। আজকাল বিরোধিতা করলে, স্পষ্ট কথা বললে শুনেছি হল পেতে সমস্যা হয়, পেলেও ছবি বেশিদিন রাখা হয় না। লবি, ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে ঝামেলা তো কিছুতেই মিটছে না। এ ছবি যত সহজে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা করে নিয়েছে, তত সহজে কি এখানকার প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে? প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যের স্পষ্ট জবাব, “ফেস্টিভ্যাল আর হল পাওয়ার বিষয়টা এক নয়। ফেস্টিভ্যালে ওই লবিটা থাকে না। ফেস্টিভ্যালে বিভিন্ন জুরিরা থাকেন, সিনেমা গুরুত্ব পায়। আর হল পাওয়া না পাওয়াটা নির্ভর করে কোনও নির্দিষ্ট জায়গার ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে। আমি অত কিছু ভাবছি না। ছবিটা কিফ-এ চমৎকার একটা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। নির্মাতা হিসেবে এটা খুবই সম্মানজনক একটা বিষয়। আপাতত এই বিষয়টা নিয়েই আছি। হল-রিলিজের ব্যাপারটা পরে দেখা যাবে।”
প্রসঙ্গত, KIFF-এ নধরের ভেলা প্রদর্শিত হবে, ‘ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন : ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজেস’ বিভাগে। প্রদর্শনের সময়সূচি: নন্দন-১, ৭ নভেম্বর, সকাল ১১.৩০। নজরুল তীর্থ-১, ৯ নভেম্বর, দুপুর ১.৩০টা। আইনক্স মেট্রো, ১১ নভেম্বর, সকাল ৯টা।

