তিস্তা, তিস্তাদেশ… আদি অনন্তের ক্যানভাস ও মিক্সড মিডিয়া

“তিস্তা নদীর পারে পারে ও
ওহো মৈষাল, হোগলা ছাড়ে কুশী
সাঞ্জে সকালে বাজান দোতরা
নদীর পারোত বসি মইষাল রে…”

রিচিত এই ভাওয়াইয়া গানের ভেতর নিবিড় জুড়ে আছে তিস্তা (Teesta River)। নদী হয়েও সে শুধু নদী নয়। এ নদী প্রাণ পায়, প্রতিষ্ঠা পায়। পাল্লা পাথরে সমৃদ্ধি আর সর্বনাশ লেগে থাকে। ঈশ্বর রূপে পূজিত যেমন হয়, সর্বগ্রাসী রূপে রাক্ষসীও হয়ে ওঠে।

সদানীর নামের নদীটি বোডো ভাষায় নাম পায় তিস্তা বা দিস্তা। আসলে ত্রিস্রোতা। এর তিন স্রোত: তিস্তা, করোতোয়া ও পুনর্ভবা। যে করোতোয়া নাম আমরা পুরাণেও পাই। কালিকাপুরাণে শিব, পার্বতী ও দৈত্য দেবীর কাহিনির মধ্য দিয়ে তিস্তার জন্মকথা আছে। এছাড়াও তাকে নিয়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র কাহিনি, লোককথা, জনশ্রুতি। মিথও।

তিস্তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যে সংস্কৃতির ধারক। তিস্তাবুড়ি নামে এ নদী দেবী হিসেবে পূজিত। তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন অংশে তিস্তাবুড়ির থান দেখা যায়। তিনি সাদা শাড়ি পরিহিত, লাঠি হাতে তাঁর মাটির মূর্তি।

খাংচু দো থেকে ছোম্বো ছু নামে এর উৎপত্তি সিকিম হিমালয়ে। অন্য মতে, সো লামো থেকে। গুরুডোঙমার ছু-এর সঙ্গে মিশে এর মিলিত প্রবাহ থাঙ্গু ছু। এরপর জেমু ছু-এর সঙ্গে মিশে লাচেন ছু। লাচুং ছু-এর সঙ্গে মিশে আমরা মূলত তিস্তা নাম পাই। রংইয়ং ছু, রংপো ছু, ডিক ছু, রানিখোলা মিশেছে এরপর। তিস্তা দক্ষিণে নেমেছে দ্রুত। প্রস্থ বেড়েছে। মিশেছে রঙ্গিত। রঙ্গিত আর তিস্তাকে ঘিরে জন্মেছে জনশ্রুতি, প্রেমের উপাখ্যান।

তিস্তা আর রঙ্গিতের মিলন

মেয়েটি তিস্তা। ছেলেটি রঙ্গিত। প্রেম থেকে খুনসুটি, তা থেকে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুরু। শুরু পাহাড় জঙ্গল খাদ পেরিয়ে এক দৌড়। এই ভূগোলকে ভালো চেনেন, এমন দুজন তিস্তা ও রঙ্গিতকে পথ দেখালেন। পা-রিল-ব্যু আর টুট-ফো। তিস্তা ছুটছে দ্রুত থেকে দ্রুততর। রঙ্গিত, পথপ্রদর্শকের অধীন মন মতো বেগ পাচ্ছে না। সে টুট-ফো-এর অপেক্ষায় না থেকে গতি বাড়ালে সামনের যা কিছু, সমস্ত ভাসিয়ে দক্ষিণে এগিয়ে চলে। কিন্তু তিস্তা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয় রঙ্গিতের জন্য, এখনও সে ধারে কাছে নেই। তাই উত্তরমুখী এবারে তিস্তা, ফিরে যেতে চায় রঙ্গিতের কাছে। হঠাৎ সে দেখে রঙ্গিত প্রবল গতিতে ছুটে আসছে তার দিকেই। অপার্থিব মুগ্ধতা নিয়ে দুজন দুজনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মেলি ও তিস্তা বাজারের কাছে এই মিলনস্থলটি ত্রিবেণী। এই লোককথার মূল নয়, আদল বদলে বদলে গেছে। যেমন লেপচা লোককথাটি গীতিময়। আর রঙ্গিত হল রাম্মাম, রঙ্গিত ও ছোটো রঙ্গিতের সম্মিলিত জলধারা।

তিস্তা পার্বত্য প্রবাহ পেরিয়ে সেবকে সমভূমিতে পড়েছে। এ সময় অজস্র খোলা বা বড়ো ঝোরা তিস্তায় মিশেছে। পেশক খোলা, গিয়েল খোলা, তালি খোলা, রম্বি খোলা, ডান খোলা, সিতি খোলা, কালি খোলা, সিভক খোলা। সমভূমিতে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জলপাইগুড়িতে তিস্তার উপনদীগুলি লিস, ঘিস, চেল, ধরলা, ন্যাওড়া, করলা। বাংলাদেশের রংপুর, লালমনিহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা হয়ে চিলমারির কাছে তিস্তা ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে।

ঋতু যেভাবে বদলে বদলে যায়, বদলে যায় তিস্তাও, এর অববাহিকাও। গ্রীষ্মে শুধু বালু, তপ্ত বালু, মনে হয় মরীচিকার মতো কিছু। আবার বর্ষায় ভয়ংকর। শরতের কাশফুলে চর তো নয়, সে যেন সাদা চরাচর। হেমন্ত ধূ-ধূ। শীত যেন কুয়াশাপ্রবণ।

হিউয়েন সাঙ থেকে জেও দ্য বইবস, থান ডেনব্রুক থেকে মির্জা নাথান উল্লেখ করেছেন এ নদীর কথা ভিন্ন ভিন্ন নামে। ভৌগোলিক কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। যার অন্যতম কারণ বন্যা। বোলটের বা রেনেলের মানচিত্র বিভিন্ন সময়ের তিস্তাকে চিহ্নিত করেছে। কখনও তিস্তার একভাগ গঙ্গায়, একভাগ ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে। হ্যামিল্টন বুকানন থেকে ডব্লু ডব্লু হান্টার, তাঁদের লেখায় এর গতিপথ চিহ্নিত করেছেন। গবেষকরা মনে করেন, ১৯৬৮ বন্যা পরবর্তী সময় থেকে প্রবাহ পথ মোটামুটি একই আছে।

তিস্তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যে সংস্কৃতির ধারক। তিস্তাবুড়ি নামে এ নদী দেবী হিসেবে পূজিত। তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন অংশে তিস্তাবুড়ির থান দেখা যায়। তিনি সাদা শাড়ি পরিহিত, লাঠি হাতে তাঁর মাটির মূর্তি। কোনও বাহন নেই। তিস্তা মাঈ, মেচেনি, তিস্তা বেরাং, মথামৈ নামেও তিনি পূজিত। তিস্তাবুড়ি ও ধল্যাবুড়ার প্রতীক ভাসিয়ে দেবার রীতি আছে কিছু অঞ্চলে। মূলত ‘গেরাভাসা’ হয় বৈশাখ মাসে। তিস্তাবুড়ির পুজো, যা কিনা বৈশাখ জুড়ে হয়, শুরু হয় মাগন তোলার মধ্য দিয়ে। তাতে মারেয়ানী কিশোরী ও যুবতীদের নিয়ে এলাকায় এলাকায় পৌঁছে মেচেনি খেলার গান বা তিস্তাবুড়ির গান করেন, নাচেন। সংক্রান্তি দিনের ভেলায় জল ফুল নৈবেদ্য রেখে, তা ভাসিয়ে দেওয়া হয়। তিস্তার মাটিতে গড়ে তোলা হয় প্রতীক বা তিস্তাবুড়ি। থানে পুজো হয়।

তিস্তাবুড়ির পুজো

মেচেনি খেলার গানের এক অংশে আমরা পাই,
“তিস্তাবুড়ি আসিলেক মাও মোর
মেচেনি উপ (রূপ) ধরি
যায় (যে) করিবে অবহেলা ভাঙ্গিবে ঘরবাড়ি
দেখিস মাও তুই তিস্তাবুড়ি…”

এ মিথ রয়েছে যে দেবী চৌধুরানী হলেন তাঁর মানসকন্যা। আমরা এই অববাহিকাতেই পাই দেবী চৌধুরানীর মন্দির। প্রসঙ্গত, এই অববাহিকাতেই পাই সন্ন্যাসীর হাট। ১৭৭০, ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ কোম্পানির বিরুদ্ধে। তাদের হাতেই গড়ে ওঠা হাট।

তিস্তা অববাহিকা একটি বৃহত্তর পরিসর, সিকিমে ৬৯৩০, পশ্চিমবঙ্গে ৩২২৫, বাংলাদেশে ২১০৪ বর্গ কিলোমিটার। ঋতু যেভাবে বদলে বদলে যায়, বদলে যায় তিস্তাও, এর অববাহিকাও। গ্রীষ্মে শুধু বালু, তপ্ত বালু, মনে হয় মরীচিকার মতো কিছু। আবার বর্ষায় ভয়ংকর। শরতের কাশফুলে চর তো নয়, সে যেন সাদা চরাচর। হেমন্ত ধূ-ধূ। শীত যেন কুয়াশাপ্রবণ। এর সমান্তরালেই তিস্তা সংলগ্ন মানুষের এক অদ্ভুত যাপনচিত্র। যদিও নদী পারের ও চরের মানুষের আছে এক স্বতন্ত্র যাপন। সুখা মরশুমে যে চর জেগে ওঠে, তাতে গড়ে ওঠে বাথান। বাথান সংস্কৃতি এক নিজস্বতায় পরিপূর্ণ। এতে মোষের পাল চরে বেড়াত বন্যপ্রাণীর থেকে খানিক নিরাপদে। সময়ের সঙ্গে বাথান ছোটো হয়ে এসেছে। বৈশাখে বাথানে ভূর-উঠা নামে এক উৎসব পালন করা হত। রাখালেরা তিস্তাপারের মানুষদের এদিন নিমন্ত্রণ করতেন। শিব পুজো সেরে সিন্নি বিতরণ হত মানুষদের মধ্যে। নির্দিষ্ট দিনটিতে বাথানের সমস্ত দুধ প্রসাদে ব্যবহৃত হত। এরপর বাঘের প্রতীকী মূর্তি রেখে সজ্জিত মোষগুলোকে ক্ষিপ্ত করে তুললে ওরা ছিন্নভিন্ন করে দিত মূর্তিটি। যেন এক সংঘবদ্ধতার পাঠ।

তিস্তা অববাহিকা অজস্র জাতি জনজাতির যৌথতায় ও সম্প্রীতিতে সমৃদ্ধ। ধর্মানুসারে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান ও অন্যান্যরা যেমন আছেন, তেমনি আছেন পার্বত্য অববাহিকায় নেপালি, ভুটিয়া, লেপচা, লিম্বু, শেরপা, নেওয়ার, তামাং, রাই, মগর, গুরুং, সানোয়ার ও অন্যান্য জাতি জনজাতির মানুষ। সমভূমি অঞ্চল, চা বাগান অঞ্চলে রয়েছেন বাঙালি, রাজবংশী, সাঁওতাল, মেচ, ওরাও, অসুর, ব্যাধ, মুন্ডা প্রমুখরা।

তিস্তাকে ঘিরে তো শুধু মানুষ নয়, সম্পূর্ণ জীববৈচিত্র্য। সময়ের সঙ্গে জীববৈচিত্র্যতে প্রভাব পড়েছে। নদী বাঁধ গড়ে উঠেছে আর তিস্তার রং রূপ বদলে বদলে গেছে। পাশাপাশি অঞ্চলের চা শিল্প, পর্যটন শিল্প, বনজ সম্পদের দ্রুত পরিবর্তন এসেছে। তিস্তা অববাহিকার জীবন ও প্রকৃতিতে যার গাঢ় প্রভাব লক্ষণীয়। তিস্তা মানেই তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প, তিস্তা মানেই তিস্তা জল বন্টন, তিস্তা মানেই তিস্তাকে ঘিরে এক আগ্রাসী উন্নয়ন। তিস্তার যে মূল প্রাণ, বারবার এসবে বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রাণ নড়ে ওঠার গল্প গত দু-চার বছরের নয়, কাল এসে জাপটে ধরেছে যেন, স্বাধীনতা পরবর্তী কয়েক দশক লক্ষ্য করলেই আমরা বুঝতে পারি তিস্তাদেশের জীবন কীভাবে শুকিয়ে আসছে, কীভাবে নাব্যতা হারাচ্ছে প্রাণের তিস্তা।

তিস্তাপাড়ে বিধ্বংসী বন্যা

এইসব সময়ের কথা, সময় বদলে যাওয়ার কথা বিভিন্ন লেখকের কলমে লিখিত হয়েছে। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় লেখা উপন্যাস দেবী চৌধুরানীতে প্রথম তিস্তা নদী-র উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তিস্তাকে কেন্দ্র করে লেখা প্রথম উপন্যাস রাক্ষসী তিস্তা, অরুণ নিয়োগী। প্রেক্ষাপট ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিস্তার ভয়াবহ বন্যা। তবে তিস্তাকে নিয়ে লেখা দেবেশ রায়ের উপন্যাস তিস্তাপারের বৃত্তান্ত কালজয়ী। নদীর ইতিহাস, ভূগোল, প্রবাহ পথ, চরের মানুষ, তাদের সংগ্রাম, রাজনীতি, গ্রাম হাটের কথা, লোকজীবন, লোকসংস্কৃতি, তিস্তা বুড়ি… সবমিলিয়ে এ এক কিংবদন্তি। আর দেবেশ রায়ের তিস্তাপুরাণ। এ-ও এক বিরাট অঞ্চলের কথা সমগ্রকে অক্ষরে এনেছে। তিস্তা, জলঢাকা থেকে তোর্সা অববাহিকা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। ইতিহাস, ভূগোল, বাঁধ, চর, লোকসংস্কৃতি, জলতলের ওঠানামা, আর বুড়িমার গোত। এমন সব উপন্যাস এবং অজস্র ছোটোগল্পে, কিংবা কবিতায়, গানে তিস্তা ঘুরে ফিরে এসেছে। 

“মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর
মনখারাপের দিস্তা
মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়,
ব্যাকুল হলে তিস্তা…”

এমত তিস্তা পার্বত্য প্রবাহ থেকে সমভূমি পর্যন্ত, ব্রহ্মপুত্রে মিশে যাওয়া পর্যন্ত অজস্র সমস্যা এবং সমীকরণের মধ্য দিয়ে পথ চলছে। ধস জনিত সমস্যা, হিমবাহ জনিত যেমন, তেমনই বন্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এছাড়াও নদী ভাঙন, চাষ, দূষণ ও অন্যান্য সমস্যা তো আছেই। আন্তর্জাতিক নদীটিকে ঘিরে আছে আন্তর্জাতিক নানা সমস্যা। স্থূল আর সূক্ষ্ম সমস্যার প্রকার ও প্রভেদ। নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, পাল্লা দিয়ে উবে যাচ্ছে নদীয়ালি মাছ, এমনকি নদীয়ালি জীবনও। কত পেশা বদলে গেল। বদলে গেল মাটির প্রকৃতি। ঝান্ডার রং বদলে গেল। স্বাদে বদলায়নি তবু তিস্তার বোরোলি। তেমনই মানুষদের সহজ জীবন। যে জীবন সুতোর গিট খুলতে চাইছে, সমাধানের সুতোকে আরও দীর্ঘ দেখবে বলে।

______________
তথ্যসূত্র:
তিস্তা উৎস থেকে মোহনা/ অভিজিৎ দাস
বাংলার নদী কথা/ কল্যাণ রুদ্র
তিস্তাবুড়ি/ ড. দীপক কুমার রায়
প্রান্তীয় উত্তরবঙ্গের জনজাতি/ প্রমোদ নাথ
এবং অন্যান্য।

Written by