
বিভিন্ন ভাষা-ভাষীর শ্রোতাদের জন্য নানা ভাষাতেই গান শোনাতেন গওহরজান
‘মাই নেম ইজ গওহরজান’। গান শেষ হওয়ার পর, এই কণ্ঠ শুনেই বুঁদ হয়ে যেতেন শ্রোতারা। পাশাপাশি, গওহরজানের গান শুনে রুষ্ট হলেন তৎকালীন সমাজপতিরা। শহরে সঙ বের হল। গায়ক কবি গোপাল দাস খেউড় লিখলেন- ‘রাইচাঁদ বড়াল আদি করে/ বড় বড় ভাইরে ধরে/ রেখেছে ভাই বন্ধ করে/ কলেতে ভরে/ আবার রেখেছে এক মেয়েকে ধরে/ তার নাম গহরজান বাই/ ধনদৌলত টাকাকড়ি/ জুড়ি ঘোড়া ঘর বাড়ি/ কলেতে গিয়াছে সব/ কিছু বাকি নাই/ এখন কলের গানে/ মাতিয়ে প্রাণে ন্যাংটা করতে চায়’।
ওদিকে গ্রামোফোন কোম্পানির তকমা আঁটা ‘ফার্স্ট ডান্সিং গার্লের’ জীবন তখন উথাল-পাথাল। ভালোবাসার যে মানুষটির সঙ্গে গওহর বেনারসে চলে এসেছিলেন, সেই ছগনলালজীর সঙ্গে তখন সম্পর্ক ভাঙনের মুখে। এরপর থেকে গওহরের জীবন অন্য খাতে বইতে থাকে। জীবনভর একটি প্রাণের মানুষ খোঁজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য তাঁর সঙ্গে ছিল না। পরের দিকের ভালোবাসার মানুষটিকেও চিনলেন নিষ্ঠুর পরিণতিতে। যখন প্রেমিক আব্বাস গওহরের ধনসম্পত্তি সব কেড়ে নিলেন শুধুমাত্র ভালোবাসার অভিনয় করে, সেই সময় গওহরজান কলকাতায়। চলছে একাধিক মামলাও।
এ হেন গওহরজান ছিলেন স্বয়ং কবি ও গান লিখিয়ে। খুব কম মানুষই হয়তো খোঁজ রাখেন যে, বিখ্যাত ‘রসকে ভরে তোরে নয়ন’ ঠুমরিটি গওহরজান-এরই লেখা।
কোনো সভায় গেলে, বিভিন্ন ভাষা-ভাষীর শ্রোতাদের জন্য নানা ভাষাতেই গান শোনাতেন গওহরজান। যে কারণে জলসায় বাঙালি শ্রোতা পেলে বাংলা ভাষাতেই গান শোনাতেন। মা মালকাজানও ছিলেন বড় কবি। তাঁর রচিত বাংলা গানও শোনাতেন জলসাতে। এ রকমই এক দু’বার শ্রোতাদের শুনিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের গানও। তাছাড়া নিজের লেখা গানও আছে।
আরও পড়ুন
রেকর্ডে কখনও গলা দিতে চাননি ভাইয়া সাহেব
সেরকমই একটি নিজের লেখা গান এল রেকর্ডে। গানের প্রথম লাইনের বদলে, লেবেলে লেখা হল গানের বিষয়। যা রেকর্ডের ইতিহাসে বিরল। রেকর্ড লেবেলে ‘ফার্স্ট ড্যান্সিং গার্ল’ ইনফরমেশনের ঠিক তলায় লেখা গানের বিষয়টি হল ‘পরকে দিয়া প্রাণ’। তার পর গান শুরু রেকর্ডে। ‘ফাঁকি দিয়ে প্রাণের পাখি উড়ে গেল আর এল না’। নিজের ভালোবাসার ব্যর্থতাই যেন গভীর ভাবে রূপক হিসেবে ছায়া ফেলল গানে। নিজের আত্মজীবনকে গানে এমন ভাবে মিশিয়ে দেওয়া একজন সার্থক জীবন বোধের কবির পক্ষেই সম্ভব। তাই গানের শেষে নিজের নাম বললেন। বললেন গানটি বাংলা ভাষার, স্বরচিত বলে নিজের গভীর বেদনাবোধ মিশিয়ে নিয়ে এও বললেন ‘ইট ইজ মাই সং’। সেই বোধ রেকর্ডে নথি হয়ে রইল। প্রতিধ্বনির মতো রয়ে গেল মাত্র দু'টি কথা ‘মাই সং’।
