বাল্য বিবাহ রুখতে হস্তশিল্পের পাঠ দিচ্ছেন মুস্তারি

দেখতে দেখতে তাঁর কাছে হাতের কাজ শিখে স্বনির্ভর হয়েছে ৪৭টি মেয়ে

বাল্য বিবাহ ঠেকাতে পিছিয়ে পড়া এলাকার গ্রামে হাতিয়ার হল হস্তশিল্প। উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ থানার ডাঙ্গাপাড়া এলাকার ভাটোল গ্রামে হস্তশিল্পের সাহায্যে মেয়েদের বাল্য বিবাহ ঠেকানোর কাজে নেমেছেন এক সংখ্যালঘু তরুণী। সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করতে থাকা ঐ তরুণীর নাম মুস্তারি খাতুন। আর তাঁর এই প্রয়াসের জেরে গ্রামের বেশ কিছু মেয়ের কম বয়সে বিয়ে ঠেকানো গিয়েছে। এখন মুস্তারির অধীনে ৪৭ জন মেয়ে হাতের কাজ শিখে স্বনির্ভর হয়েছে বা হচ্ছে।

শিলিগুড়ি কাওয়াখালি বিশ্ববাংলা শিল্পী হাট চালু হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্তরিক প্রয়াসের জেরে। সেই হাটের মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের হস্তশিল্পীরা তাঁদের পণ্য বিক্রি করছেন। ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া শিল্পী হাট সেখানে চলবে ১৯ মার্চ পর্যন্ত। তারপর আবার ২২ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত হাট চলবে। এই হাটে এখন রাজ্যের ১৯টি জেলার ৯১ জন শিল্পী তাঁদের হাতের কাজ মেলে ধরছেন। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরাও আছেন সেখানে।

 

আর সেই হাটেই রায়গঞ্জের ডাঙ্গাপাড়া এলাকার ভাটোল গ্রামের মেয়ে মুস্তারি তার স্টল দিয়েছেন। পাশাপাশি ২৬ বছরের তরুণী মুস্তারির লক্ষ্য, মেয়েদের স্বনির্ভর করে তোলার লড়াই চালানো। তাঁর কথায়, গ্রামে ১২ থেকে ১৫ বা ১৬ বছরের মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনও মেয়ে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকে ফেল করলে বা কোনও বিষয়ে ব্যাক পেলে অমনি বাড়ির লোকেরা তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে তৎপর হচ্ছে। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এভাবে বহু মেয়ে কম বয়সেই সংসারের অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। আর এর বিরুদ্ধেই অন্যরকম লড়াই শুরু করেছেন মুস্তারি। গ্রামে কোনও কম বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে আর্থিক কারণে, জানতে পারলেই সেই বাড়িতে দৌড়ে যাচ্ছেন মুস্তারি। তারপর সকলকে বুঝিয়ে সেই মেয়ের বিয়ে আটকে দিচ্ছেন। আর সেই মেয়েকে তাঁর হস্তশিল্পের কাজে যুক্ত করে স্বনির্ভর করার চেষ্টা চালাচ্ছেন মুস্তারি।

এভাবে আলেখা, সোনামনি পাল, ভানুমতীর মতো মেয়েদের আজ স্বনির্ভর করে জীবনে নতুন পথ দেখাচ্ছেন মুস্তারি। তাঁর অধীনে এখন এভাবে ৪৭ জন মেয়ে হাতের কাজ শিখে একটা টিম হিসাবে কাজ করে অর্থ রোজগার করছে। স্টোন ব্যাগ থেকে শুরু করে শোপিস, কানের দুল, চুড়ি, নাকের নথ, এমব্রয়ডারি তারা শিখে নিজেরাই সব তৈরি করছে। মুস্তারি বলেন, অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হলে তা মেয়েটিরই ক্ষতি নয় শুধু, দেশেরও ক্ষতি। কেননা অল্প বয়সী মা কোনও সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারে না। গ্রামে আর্থিক কারণে মেয়েদের বোঝা ভেবে হামেশাই এই কাজ হচ্ছে। কন্যাশ্রী বা বেটি পড়াও বেটি বাঁচাও প্রকল্প সরকার নিয়ে এলেও শিক্ষার অভাবে এখন বাল্য বিবাহ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা যায়নি। তাই তিনি হস্তশিল্পের মাধ্যমে মেয়েদের স্বনির্ভরতার কথা বলে কাজে নেমেছেন বলে মুস্তারি জানান। তাঁর আরও কথা, ভবিষ্যতে তিনি আরও মেয়েদের স্বনির্ভরতার পাঠ দিয়ে হস্তশিল্পের মাধ্যমে এগিয়ে দেবেন। তিনি চান তার কাছ থেকে হাজার হাজার মেয়ে হাতের কাজ শিখুক। আর এই কাজের জন্য তিনি আপাতত নিজের চাকরির কোনও উদ্যোগ নেবেন না।

 

বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে এ এক অন্যরকম লড়াই। মেয়ে পাচার, বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সিনি-র উত্তরবঙ্গের কর্মকর্তা শেখর সাহা বলেন, মুস্তারির এই লড়াই একটি রোল মডেল। রায়গঞ্জ লাগোয়া ভাটোল গ্রাম তিনি জানেন, খুব পিছিয়ে পড়া। সেই গ্রামে অভাবের কারণে হামেশাই কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। সেদিক থেকে মুস্তারির লড়াই স্যালুট জানানোর মতো একটি দিক। এদিকে সেই হাট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ওয়েস্টবেঙ্গল ষ্টেট এক্সপোর্ট প্রোমশান সোসাইটির সহকারী ম্যানেজার সুদীপব্রত মজুমদার জানাচ্ছেন, মুস্তারিদের স্টল যাতে আগামীতেও থাকে সেদিকে তাঁরা নজর দেবেন। এই সব হস্তশিল্পীদের উৎসাহ দিতেই শিল্পী হাট। শিলিগুড়ির এই শিল্পী হাট যাতে রাজ্যের পর্যটন দফতরের মানচিত্রে আসে সেই জন্য তাঁরা প্রস্তাব বা আবেদন পাঠাবেন। সারা বছর ধরেই তাঁদের এখানে হাট বসবে।

Developed by DXDasia