
সময়টা চল্লিশের দশক। অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর থেকে আসা তরুণ মৃণাল সেন (Mrinal Sen) তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার ছাত্র। ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরিতে (বর্তমান ন্যাশানাল লাইব্রেরি) সাউন্ড রেকর্ডিং বিষয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে পড়ে ফেললেন রুডলফ্ আইনহাইমের ‘ফিল্ম অ্যাজ্ আর্ট’ এবং ভ্লাদিমির নিলসনের ‘সিনেমা অ্যাজ্ আ গ্রাফিক আর্ট’ বই দুটি। এভাবে ছাত্রাবস্থাতেই একদিকে যেমন তাঁর ধারণা গড়ে ওঠে সিনেমার নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে, তেমনই দৃঢ় হতে থাকে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন। সমাজবাদী অর্গানাইজেশন আইপিটিএ-তে যোগ দেওয়ার সূত্রেই বন্ধুত্ব হয় ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, তপন সিনহা, বিজন ভট্টাচার্য প্রমুখের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে নিয়মিত শিল্প, রাজনীতি এবং জীবন বিষয়ক ভাবনার আদান-প্রদানের মাধ্যমে যে খোলা হাওয়ার ঢেউ লেগেছিলো এদেশের সংস্কৃতির পালে তার লেগাসি আজও আমরা বহন করে চলেছি। চারদিকে এই যুদ্ধ – যুদ্ধ আবহের মাঝখানে আমরা হয়তো ভুলতে বসেছি আমাদের মানবিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের দিকটি। প্রশ্ন উঠতে পারে, এহেন জাতীয় সংকটের দিনে আমরা সিনেমা নিয়ে কেনো কথা বলবো এবং মৃণাল সেন-ই বা কতখানি প্রাসঙ্গিক? তার আগে একবার ঘুরে দেখা যাক বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মৃণাল সেন কীভাবে জড়িয়ে আছেন।

ফিল্ম ফিন্যান্স কর্পোরেশন প্রযোজিত ‘ভুবন সোম’ ছবিটি ভারতীয় ছবির ইতিহাসে একটি মাইলস্টোন। মূলধারার ছবির কাঠামোকে পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং নিওরিয়্যালিজমের প্রভাব থেকেও বেরিয়ে এসে যে অভিনব পরীক্ষানিরীক্ষার পথে মৃণাল হেঁটেছিলেন, তা এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছিলো।
মূলধারার পলায়নবাদী বলিউড সিনেমার ছক ভেঙে জীবনমুখী ও রাজনীতি-সচেতন যে বিকল্পধারার ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাণ ও চর্চার অভ্যেস শুরু হয়েছিলো ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে, সেখানে বিশ্ব-চলচ্চিত্র আন্দোলনগুলির প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশক জুড়ে ইতালিতে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র-ব্যবস্থার স্টুডিও সিস্টেম থেকে বেরিয়ে এসে দে সিকা, রোজিলিনি, ভিসকান্তির মতো চলচ্চিত্র-নির্মাতারা রিয়েল লোকেশন, ন্যাচারাল লাইট এবং নন-প্রোফেশানাল অভিনেতাদের ব্যবহার করে প্রায় ডকুমেন্টারি স্টাইলে নৈমিত্তিক সত্যকে বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরেছিলেন। শ্রেণি বৈষম্য, বুর্জোয়া তন্ত্রের অসাড়তা এবং প্রান্তিক জীবনের সংগ্রামকে ছবিতে তুলে ধরার মাধ্যমে নিওরিযালিজম আন্দোলন গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলো এ দেশের প্রথম সারির চলচ্চিত্র নির্মাতাদের।

সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ (১৯৫৫), ‘অপরাজিত’ (১৯৫৬), কিংবা মৃণাল সেনের শুরুর দিকের ছবিগুলি যেমন- ‘নীল আকাশের নীচে’ (১৯৫৯), ‘বাইশে শ্রাবণ’ (১৯৬০) এবং ‘আকাশ কুসুম’ (১৯৬৫)-এ ইতালিয়ান নিওরিয়্যালিজমের ছাপ স্পষ্ট। এভাবেই তো ভারতীয় ছবি সেদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মানের হয়ে উঠেছিলো। পঞ্চাশের দশকের শেষ এবং ষাটের দশকের শুরুর দিকে ফ্রান্সে চলচ্চিত্রের প্রথাগত ব্যাকরণকে ভেঙে ছবির যে অভিনব ও পরীক্ষামূলক ভাষার জন্ম হয় তা বিশ্ব-চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘নিউ ওয়েভ’ বা ‘নুভেল ভাগ’ নামে পরিচিত। ত্রুফো, গোদার, আন্তোনিওনি, শ্যাব্রল, অ্যালাঁ রেঁনে, অ্যাগনেস ভার্দা প্রমুখরা শৈল্পিক স্বাধীনতা এবং স্বকীয়তাকে কে মূলধন করে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত এবং রাজনীতি-সচেতন ছবি তৈরির মাধ্যমে যুব সমাজের আকাঙ্খা এবং সংগ্রামকে তুলে ধরেন। ঠিক এরই পাশাপাশি চলচ্চিত্র-সমালোচক অঁদ্রে বাঁজা এবং ত্রুফোর চলচ্চিত্র-বিষয়ক লেখালেখি এই নবতরঙ্গ আন্দোলনকে সমগ্র ইউরোপ এবং ইউরোপের বাইরেও জনপ্রিয় করে তোলে। এই ফরাসি নবতরঙ্গের ঢেউ পৌঁছে যায় ভারতীয় ছবির অন্দরেও। স্বাধীনতা-উত্তর সামাজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বিকল্পধারার ছবিতে, যেমন- শ্যাম বেনেগাল বা বাসু চ্যাটার্জির ছবিতে, এই নবতরঙ্গের বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকট হতে শুরু করে। তবে ভারতীয় চলচ্চিত্রে নবতরঙ্গের পুরোধা মানা হয় মৃণাল সেনকে, যাঁর ‘ভুবন সোম’ (১৯৬৯) ছবিটির মাধ্যমেই এই আন্দোলনের শুরু।

ফিল্ম ফিন্যান্স কর্পোরেশন প্রযোজিত ‘ভুবন সোম’ ছবিটি ভারতীয় ছবির ইতিহাসে একটি মাইলস্টোন। মূলধারার ছবির কাঠামোকে পুরোপুরি অস্বীকার করে এবং নিওরিয়্যালিজমের প্রভাব থেকেও বেরিয়ে এসে যে অভিনব পরীক্ষানিরীক্ষার পথে মৃণাল হেঁটেছিলেন, তা এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম দিয়েছিলো। মাঝবয়সী ও বিপত্নীক একজন সরকারি আমলা তার গতে বাঁধা জীবন থেকে একটু ছুটি নিয়ে পশ্চিমে যান পাখি শিকারে এবং এক গ্রাম্য তরুণীর সাহচর্যে এসে আবিষ্কার করেন গ্রামীণ জীবনের সহজ আনন্দ ও মানবিক সৌহার্দ্য। বিষয়ভাবনার দিক থেকে ছবিটি ছিলো বুর্জোয়াতন্ত্রের প্রতি এক মধুর প্রহসন। জাম্প কাট, ফ্রিজ ফ্রেম এবং মন্তাজের বহুল ব্যবহার এবং শৈল্পিক পরিমিতি এই ছবিটিকে লিরিক্যাল হয়ে উঠতে দেয়নি, বরং দর্শকের মগ্নতাকে বারবার ভেঙে দিয়ে ভাবতে শিখিয়েছিলো। স্বাভাবিকভাবে শুরুতেই এ ছবি কিন্তু দর্শকদের কাছে সাদরে গৃহীত হয়নি। এমনকি সে সময়ের তারকা পরিচালক এবং সেনের প্রতিদ্বন্দ্বী সত্যজিৎ রায়ও বিদ্রুপ করে মাত্র সাতটি শব্দে ছবিটির মূল্যায়ণ করেছিলেন- “Big Bad Bureaucrat Reformed by Rustic Belle.” অবশ্য ছবিটি ১৯৭০ সালে তিনটি জাতীয় পুরস্কার জয়ের মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে এবং আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রশংসিত হয়।
মৃণাল সেনের পরবর্তী ছবিগুলিতে এই নবতরঙ্গ আন্দোলনের ছাপ প্রকট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তাঁর কলকাতা ত্রিলজি- ‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭০), ‘কলকাতা ৭১’ (১৯৭২) ও ‘পদাতিক’ (১৯৭৩)- এবং ‘কোরাস’ (১৯৭৪), যেগুলি তাঁর সর্বাধিক আলোচিত রাজনৈতিক ছবি, সেগুলির আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু সমকালীন অন্যান্য ছবির থেকে পুরোপুরি স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। সত্তরের দশকের বৈশ্বিক ডামাডোলের দিনে বিক্ষোভ ও আন্দোলনে উত্তপ্ত কলকাতার নাগরিক বিপর্যয় ও অস্থিরতা এবং প্রোটাগনিস্টদের অন্তর্জগত ও বহির্জগতের সংগ্রামকে তুলে ধরতে গিয়ে মৃণাল ব্যবহার করেছিলেন হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরা, জাম্প কাট, ফ্রিজ ফ্রেম এবং প্রাকৃতিক আলো-আঁধারের কন্ট্রাস্ট। ত্রুফোর ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ (১৯৫৯) বা ‘জুলে জিম’ (১৯৬২) -এর মতো ফ্রিজ শটের ব্যবহারের মাধ্যমে মৃণাল তাঁর ছবির সরলরৈখিক ন্যারেটিভকে কৌশলগতভাবে ভেঙে দিয়ে দর্শকের ‘ডিজএনগেজমেন্ট’ তৈরি করেছিলেন, যাতে দর্শক ‘ফিল্ম’ ও ‘রিয়েলিটি’র পার্থক্যের বিষয়ে সচেতন হন। বাস্তবের জটিলতাকে ধরতে ন্যারেটিভের মধ্যে ঘটনার পরম্পরাকে ভেঙে দিয়ে মৃণাল আসলে ডেল্যুজের অভিজ্ঞতার বহুতা অর্থাৎ ‘মাল্টিপ্লিসিটি’ কেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যেমন, ‘কলকাতা ৭১’-এ সময়ের সরলরৈখিক প্রবাহকে ভেঙে কাহিনি এগোয় ’৭১, ’৩৩,’৪৩, ’৫৩, ’৭১-ক্রমে। আবার, গোদার যেভাবে তাঁর ছবিতে অ্যালিয়েনেশান ও প্যান্টোমাইম ব্যবহার করেছিলেন, মৃণালও ব্রেখটীয় পদ্ধতিতে ফোর্থ ওয়াল ভেঙে দর্শকের সঙ্গে প্রোটাগনিস্টের সংলাপ তৈরি করলেন। ডকুমেন্টারির স্টাইলে কলকাতা শহরে ঘটে যাওয়া প্রতিবাদ ও মিছিলের আসল ফুটেজ ছবিতে ব্যবহার করে ফিকশন ও নন-ফিকশনের দূরত্ব কমালেন। চলচ্চিত্রবিদ্যার অধ্যাপক মৈনাক বিশ্বাসের লেখায় একটি লোমহর্ষক তথ্য পাওয়া যায় যে ‘কলকাতা ৭১’ চলাকালীন একদিন হলে একজন মহিলা আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে যান, কারণ তিনি কিছুদিন আগে পুলিশের গুলিতে হত নিজের ছেলেকেই পর্দায় দেখতে পেয়েছিলেন।

মৃণাল সেনের শেষ দিকের ছবিগুলি অবশ্য আত্মানুসন্ধানমূলক, যেমন ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৯১)-তে তিনি উপলব্ধি করেন অপসৃয়মান সময়ের সঙ্গে কিভাবে তাঁর বিপ্লবাত্মক প্রচেষ্টা লয় হারিয়ে ফেলছে। একটা যুগের শেষে, দ্রুত পরিবর্তনশীল নতুন শতাব্দীতে তিনি কি সমসাময়িক হয়ে থাকতে পারবেন?
এছাড়াও, মৃণাল তাঁর ছবির ‘ক্রস-ফার্টিলাইজেশন’ও ঘটিয়েছিলেন, যেমন তিনি ‘কলকাতা ৭১’ ছবির কিছু ফুটেজ ‘পদাতিক’-এও ব্যবহার করেছিলেন। আবার, তাঁর ক্যামেরা স্টুডিও থেকে বেরিয়ে গেরিলা পদ্ধতিতে ছুটেছে কলকাতার অলিগলি-রাজপথে, প্রত্যন্ত গ্রামে, ধ্বংসস্তূপে। লং টেক, ডিপ ফোকাস, ওয়াইড শট, স্ট্যাটিক এবং হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরার ব্যবহারের মাধ্যমে সময়ের অস্থিরতা, ঘটনার তাৎক্ষণিকতা, চরিত্রদের আত্মগত সংগ্রাম এবং নাগরিক জীবনের স্নায়ুকে তিনি স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত ভাবেই ধরতে চেয়েছিলেন। সাবজেক্টিভ পার্সপেক্টিভ অর্থাৎ ভয়েস ওভার, ইন্টারনাল ডায়ালগ, সাবজেক্টিভ ক্যামেরা-অ্যাঙ্গেলের ব্যবহারের মাধ্যমে ছবির চরিত্রদের সঙ্গে দর্শকদের সহমর্মী হয়ে উঠতেও সাহায্য করেছেন তিনি। অর্থাৎ, একাধারে মৃণাল সরলরৈখিক ন্যারেটিভ ভেঙে দর্শকের ডিজএনগেজমেন্ট ঘটাচ্ছেন এবং ছবির বিষয় ও চরিত্রদের সঙ্গে দর্শকের যোগাযোগও তৈরি করছেন। এভাবেই মার্কসবাদী মৃণাল তাঁর ছবিতে থিসিস ও অ্যান্টিথিসিসের রসায়ন ঘটিয়ে সিনেমাকে করে তুলছেন একটি ইন্টেলেকচুয়াল ডায়ালগ।

মৃণাল সেন তাঁর প্রায় পঞ্চাশ বছরের কর্মজীবনে নির্মাণ করেছিলেন ঊনত্রিশটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি, চৌদ্দটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি এবং চারটি ডকুমেন্টারি। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রায় নির্মিত সকল ছবিকে কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ধাঁচে রাখা সম্ভব নয়। সময় ও বাস্তবতার বিবর্তন সমকালীন আধুনিকতার সঙ্গে ঠাঁই পেয়েছে তাঁর পর্যায়ক্রমিক ছবিগুলিতে। তিনি যেমন পাশ্চাত্যের নবতরঙ্গের দেশিকরণ ঘটিয়ে ভারতীয় বিকল্পধারার ছবির জগতে বিপ্লব ঘটালেন, তেমনই তাঁর ছবির মাধ্যমে নিজেকে বারবার ভাঙাগড়ার দুঃসাহসও দেখিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রবিদ্যার অধ্যাপক ও চলচ্চিত্র সমালোচক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “সময়ের সঙ্গে এত তীব্র সহবাস, নিজের সময়ের ঠোঁটে এরকম চুম্বনের দাগ আর কেউই রেখে যাননি। না সত্যজিৎ, না ঋত্বিক। তাঁরা মহাকাব্যপ্রণেতা হতে পারেন কিন্তু হয়তো ইস্তেহার লেখার দায়, স্বেচ্ছায় ও সানন্দে, মৃণাল সেন নিয়েছিলেন।” এই ইস্তেহার যেমন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আর্থিক মেরুকরণের একেবারে তলানিতে থাকা শ্রমজীবী মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ আন্দোলনের ইস্তেহার- যেমন দেখা গেছে সত্তরের দশকে নির্মিত ‘কোরাস’ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক ছবিতে, তেমনই আশির দশক থেকে নির্মিত ‘খারিজ’(১৯৮২), ‘এক দিন আচানক’ (১৯৮৯)-সহ নানান ছবিতে এই ইস্তেহার হয়ে উঠেছে মধ্যবিত্তের কিসসা। কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ানো মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্কীর্ণতা ও মূল্যবোধ, সাফল্য ও ব্যর্থতা এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের দিকটি উঠে এসেছে এসব ছবিতে। মৃণাল সেনের শেষ দিকের ছবিগুলি অবশ্য আত্মানুসন্ধানমূলক, যেমন ‘মহাপৃথিবী’ (১৯৯১)-তে তিনি উপলব্ধি করেন অপসৃয়মান সময়ের সঙ্গে কিভাবে তাঁর বিপ্লবাত্মক প্রচেষ্টা লয় হারিয়ে ফেলছে। একটা যুগের শেষে, দ্রুত পরিবর্তনশীল নতুন শতাব্দীতে তিনি কি সমসাময়িক হয়ে থাকতে পারবেন?

মৃণাল সেনের প্রয়াণের (২০১৮) পর এক দশকও পেরোয়নি, আমরা আরেক জাতীয় সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে। সন্ত্রাসবাদ, হিংসা, সাম্প্রদায়িকতা, ভোটবাক্সের রাজনীতি এবং মানুষের প্রতি মানুষের অসহিষ্ণুতার ফলস্বরূপ আমাদের গণতান্ত্রিক আদর্শ এবং জাতীয় ঐতিহ্য আজ প্রশ্নচিহ্নের মুখে। এই অসুখের লক্ষণগুলি আজ প্রকট হলেও, এর মূল অনেক গভীরে। রাজনৈতিকভাবে আমাদের মিশ্র সংস্কৃতির ঔদার্যকে সীমিত করে দেওয়ার যে পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চলেছে বহু বছর ধরে, তা-ই হয়তো আমাদের আজ বিচ্ছিন্ন করেছে, দুর্বল করেছে। আমাদের নতুন প্রজন্ম কি রবীন্দ্রনাথকে চেনে? ঋত্বিক-মৃণাল-সত্যজিৎ-এর ছবি দেখে? আমরা কি আমাদের মূলগত আভিজাত্যকে হারিয়ে ধীরে ধীরে পুঁজিবাদের দাস হয়ে উঠছি না? নিউ-ওয়েভ চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই ছিল পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা। মৃণাল সেনের বেশিরভাগ ছবিই এই সিস্টেমের অসাড়তার বিরুদ্ধে এক রাজনৈতিক ভাষ্য হয়ে উঠেছিলো। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে ছবির মাধ্যমে মানুষের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক উন্নয়ন সম্ভব। তাঁর কথায়, “I don’t agree with Godard when he says that the cinema is a gun. That is too romantic an expression. You can’t topple a government or a system by making one ‘Potemkin’. You can’t do that with ten ‘Potemkin’s. All you can do is create an environment in which you can discuss a society that is growing undemocratic, fascistic.”

