
‘ছপাক’ চলচ্চিত্র থেকে অ্যাসিড হামলা – এবার কলম ধরলেন মনীষা পৈলান
চলুন ‘ছপাক’ দেখে আসি। দেখে আসি অ্যাসিড যন্ত্রণার কিছু ঝলক। দেখে আসি এক যোদ্ধার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। আগে কখনও কোনো সিনেমা নিয়ে এতটা উৎসাহ পাইনি। এই প্রথমবার পেলাম। কারণটা আশা করি সবার জানা।
ছোটোবেলার সিনেমাতে দেখেছি কুমিরে খেয়ে ফেলছে হিরোইনের মুখ। পরে তা প্লাস্টিক সার্জারি করে আরও সুন্দর হয়ে গিয়েছিল। সেটা মাথায় রেখে প্রথম প্রথম কিছু দিন ভেঙে পড়িনি, তবে পরে আর শখের মুখও ফিরে পাইনি। যেটুকু ভালো করা যায় ডাক্তারবাবুরা চেষ্টা করেছেন। পরে বহু মানুষকে পাশে পেয়ে নিজেকে অনেক বুঝিয়ে মূলস্রোতে ফেরার চেষ্টা করছি। ‘মুখ ছাড়াও কর্ম দিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করা যায়’ এই ভাবনাকে কতটা বাঁচিয়ে রাখতে সফল হব জানা নেই, তবে বেঁচে থাকার ইচ্ছে ছাড়িনি।
লক্ষ্মী আগরওয়ালের উপর অ্যাসিড হামলার ঘটনাকে ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে ছপাক
এখন চার বছর পার হল, আজ অবধি অ্যাসিডের কথা সব জায়গায় বলেও মনে যেন শান্তি পাই না, এটা আসলে কী ধরনের আক্রমণ। কতটা ভয়ংকর আর কতটা যন্ত্রণাকর। কিন্তু সিনেমাটা দেখলে মনে হয় কিছু মানুষ তো এটা অনুভব করতে পারবেন৷ আমার বিশ্বাস, বহু মানুষ এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠবেন। যন্ত্রণার মুক্তি চাই, অপরাধীর শাস্তি চাই বলে গর্জে উঠবেন।
মেঘনা গুলজারজি যে এমন একটি বিষয় নিয়ে সিনেমা বানিয়েছেন এটাও অনেক বড়ো ব্যাপার এবং বড়োপর্দায় এই ধরনের সিনেমা দেখানো হচ্ছে মানে আমাদের জন্য ভীষণ ভালো একটি উদ্যোগ। বিশেষ করে তাদের জন্য, যারা মুখ ঢেকে রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অর্থাৎ এটা শুধুমাত্র সিনেমা বা বিনোদন নয়, এটি একটি মেয়ের যোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প। সমাজের জন্য ভালো বার্তা এবং একটি প্রতিবাদ। আমাদের উৎসাহ জাগানোর নতুন দিশা। বিশেষ করে এই ছবি সমাজের সেই সব অমানুষদের মুখে থাপ্পড় মেরেছে, যারা আমাদের এভাবে আক্রমণ করেছে বা করার কথা ভেবে থাকে। এই যেমন আমাকে যারা অ্যাসিড ছুঁড়ে মেরেছিল, তারা আজ জামিনে মুক্ত। আমার সামনে দিয়েই ঘুরে বেড়ায়। তাদের তো কোনো সাজা হল না! শুধু একবার নয়, একাধিকবার আক্রান্ত হতে হয় আমাদের। শুধু নারী নয়, পুরুষ এবং শিশুও এই ঘটনায় বাদ যায় না। শুধু প্রেমে প্রত্যাখ্যান নয়, ঘরোয়া বিবাদও অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু আমার জেলায় নয়, সব জেলাতেই আক্রমণ। শুধু আমি নই, আমার চারপাশও আক্রান্ত।
মনীষা – অ্যাসিড হামলার আগে ও পরে
কয়েকদিন আগের একটা রোববারে এসএলএসএ (SLSA)-এর একটি অনুষ্ঠানে একত্রিত হয়ে বুঝলাম, এই আক্রমণ হতে হতে আজ কোথায় দাঁড়িয়েছে। সেদিন আমরা নির্যাতিতারা সবাই একসঙ্গে ছিলাম। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা এবং তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আমার কাছে মিলন উৎসব। এই লড়াই বড্ড কঠিন। তাও সবাই যেন ইস্পাতের মতো শক্ত হয়ে হেসে কথা বলে, ছবি তোলে, নাচ করে, কবিতা বলে, কেউ নতুন সংসার জীবনে কেউ বা কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত। তাও সমাজের একদল মানুষ যেন ‘উফফফ’, ‘ইস্স’ ছেড়ে বেরোতেই চায় না। যদিও আজ অনেক মানুষ এই যন্ত্রণা অনুভব করছে এবং পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
ছপাক চলচ্চিত্রের ট্রেলার
সেই অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন তাঁদের ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। উপস্থিত সব অ্যাসিড আক্রান্ত লড়াকুদের সংবর্ধনা দিতে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের জার্জ, উকিল এবং অন্যান্য সম্মানীয় ব্যক্তিরা।
ওঁরা আমাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। আলোচনা হল কীভাবে রাজ্যে অ্যাসিড আক্রমণ বন্ধ করা যায়, কীভাবে অপরাধীরা সাজা পায়, কীভাবে আক্রান্তরা স্বনির্ভর হয়। আমাদের জন্য যদি সত্যিই এরকম কিছু একটা হয়, তাহলে রাজ্যে অ্যাসিড হামলা কমবেই এবং আমরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচব।
মনীষাদের সংগঠন – চিৎকার
প্রতিদিন আমি বাইরে বেরোই, আর মনে মনে ঠিক করে নিই যে, আজ কিছু মানুষের কাছে আমাকে মুখে দাগ নিয়েই উত্তর দিতে হবে। যেভাবেই হোক আক্রমণের কথা সবাইকে বলতে হবে। অভ্যাস করে নিয়েছি প্রত্যেকের ওলোট পালোট প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। না আর ভয় পাই না। আমাদের চারপাশের মানুষদের বলি, আসুন না একসঙ্গে লড়াই করি। আসুন না সহানুভূতি না দেখিয়ে তাদের নিজেদের গল্প শুনি। তাদের অনুভব করি, পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। সত্যি বলছি, চাইলেই ফিরে আসা যায়, যোদ্ধার মতো বাঁচা যায়, আজীবন।

