কেন ‘কবি’র সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে ‘মহিলা কবি’ কিংবা বিজ্ঞানীর পাশে ‘মহিলা বিজ্ঞানী’!

অথচ প্রাচীনকালে সমাজ ছিল তখন মূলত মাতৃতান্ত্রিক, নারীরাই গোষ্ঠীপ্রধান বিবেচিত হতেন

আজ যখন মানুষের বসবাসের জন্য পৃথিবী নামক গ্রহটির পরিবর্তে বিকল্প বসতির কথা ভাবা হচ্ছে, চাঁদে জমি কেনার তোড়জোড় চলছে, তখন ‘কবি’র সঙ্গে লেজুড়বৃত্তিরূপে জুড়ে যাওয়া ‘মহিলা কবি’ কিংবা বিজ্ঞানীর পাশে ‘মহিলা বিজ্ঞানী’ নামক শব্দবন্ধের ব্যবহার প্রবল অস্বস্তির। হায়ারার্কির। তবে কি ধরেই নেওয়া হচ্ছে স্রেফ লিঙ্গগত পরিচয়ের কারণে ‘পুরুষ’ শ্রেষ্ঠ? সেই সঙ্গে সমাজের চাপা দিয়ে রাখা রুমালটাও এক সময় বিড়ালে পরিণত হয়। অতএব নিস্তরঙ্গ জীবনে অন্তত কিছু ম্যাও ধ্বনির বিস্ফার ঘটে। ফলে বাড়িতে যিনি নারীর সমানাধিকার স্বীকার করেন না তাঁকেও সেমিনার-সিম্পোসিয়ামে নারী-স্বাধীনতা নিয়ে দু’কথা বলতে হয়।

অথচ প্রাচীনকালে ছবিটা মোটেই এমন ছিল না। সমাজ ছিল তখন মূলত মাতৃতান্ত্রিক। নারীরাই সেই সমাজের গোষ্ঠীপ্রধান বিবেচিত হতেন। তাহলে কবে বদলে যাওয়া ছবিটা একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল? এই পরিবর্তন আসলে নানান ধাপে জুমচাষের মতো সযত্ন পদ্ধতিতে রোপণ করা। তবে রাতারাতি ধাক্কা লাগল যখন পুরুষ তার পালিত পশুগুলোকে উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করতে পারল। পশুর শ্রমকে যখন সে উৎপাদনের বা চাষাবাদের কাজে লাগাতে পারল, যখন নারীর শ্রমের উপর আর তাকে নির্ভর করতে হল না, তখনই ক্ষমতার পালাবদল ঘটে গেল। এক নিমেষে, অনেকটাই। এরপর নারীর উপরও সে আস্তে আস্তে অধিকার কায়েম করতে শুরু করে। সেই পালে হাওয়া খেলাবার জন্য শুরু হল নানা সামাজিক অনুশাসন।

তবে এই অনুশাসন একদিনে সমাজকে বেঁধে ফেলতে পারেনি। তাই বিশেষত ঋগ্বেদের যুগে দেখি, তখনও ব্যতিক্রম হিশেবে হলেও বেশকিছু ক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকারের কথা আছে। সেই যুগে বেশকিছু বিদূষী নারীর কথা পাই, ঋগ্বেদের বেশকিছু মন্ত্রও – কাক্ষীবতী, ঘোষা, মৈত্রেয়ী, অপালা, বাক-এর মতো নারীদেরই রচনা। সেই সময় কোনও কোনও ক্ষেত্রে নারীদের উপনয়নও হত। পরে মনু’র অনুশাসন অনুযায়ী নারীর পক্ষে বিবাহ হয় উপনয়নের বিকল্প। বেদাধ্যয়নের বিকল্প হিশেবে পতিসেবা গৃহীত হয়। যে নারীর বিদ্যা বা সম্পত্তি আছে সে চেহারায় মেয়েমানুষ হলেও আসলে পুরুষই—এমন কথাও বেদেই আছে। অতএব, সে যুগে কয়েক ক্ষেত্রে তখনও নারীকে ‘মানুষ’ হিশেবে দেখা হলেও আস্তে আস্তে বিবিধ সামাজিক অনুশাসন তাকে ‘নারী’র গণ্ডীতে বাঁধতে শুরু করেছে। তাই বেদের যুগে নারীদের স্থান ছিল খুব উঁচুতে বা নারীর সমানাধিকার ছিল বলে যাঁরা একদেশদর্শী মতামত দেন তাঁদের একটু ভেবে দেখবার অনুরোধ জানাই।

অবশ্য মনু’র অনুশাসনের সময়কাল থেকে গঙ্গার জল তারপর অনেক গড়িয়েছে। নারীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে নিজেরাই বহুদিন ধরে সচেতন। তাঁদের সেই উচ্চারণে প্রথমদিন থেকে বিদ্যাসাগর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো অনেক মুক্তমনা পুরুষ আজ অব্দি সমান ক্ষত ও অনুভূতি নিয়ে গলা মিলিয়েছেন। সঙ্গে থেকেছেন কখনও বা পুরোধা হিশেবেই।

আসলে ক্ষমতা আর হায়ারার্কি পরিপূরক। ক্ষমতা তার ভাগ-বাঁটোয়ারার সুবিধার্থেই শ্রেণি বিভাজন চায়। কেননা এই শ্রেণি বিভাজনে অনেক মানুষকে একসঙ্গে চিহ্নিত করা যায়। আর পুরো একটা শ্রেণিকে ক্ষমতা থেকে অঙ্গচ্ছেদের ন্যায় সরিয়ে দিতে পারলে তার ঘাড়ের উপর এসে পরা নিশ্বাসগুলোকে সহজেই লোপাট করে দেওয়া যায়। মানুষের মধ্যে সে তাই ধর্মের নামে লিঙ্গের নামে যৌন চাহিদার পছন্দ-অপছন্দের নামে অনেকগুলো শিবির চিহ্নিত করে। এবং সেই অনুযায়ী সে ভাগের ছিটে-ফোঁটা দেয় বা দেয় না। তার অনুশাসনেও সুবিধে হয় এই শ্রেণি বিভাজনে। সে নারী’কে মানুষ হিশেবে দেখে না। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্র মুসলিম বা খ্রিষ্টান বা শিখকে ‘সংখ্যালঘু’ হিশেবে দেখে, ততটা মানুষ হিশেবে নয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্র হিন্দু’কে দেখে ‘সংখ্যালঘু’, মানুষ নয় ততটা। মানুষ যত সচেতন হবে ক্ষমতার নিরঙ্কুশ ডানা আর ততটা নিরুপদ্রপ থাকবে না। তার ডানা না হোক পালক কিছু কিছু খসতে থাকবে। আর কে না জানে পালক খসতে থাকলে ডানার ভারসাম্য কিছু হেলে যায় বইকি! আমাদের সাধারণ মানুষের অস্ত্র বলতে এই সচেতনতাটুকু।

আর এই সচেতনতা খুব জরুরি আমাদের যাপনে, নিত্যদিনের কাজে এমনকি অকাজেও। চিন্তা-চেতনায় তারও আগে। ‘নারী’ নয়— সবার আগে খুব ভেতর থেকে ‘নারী’কেই অনুভব করতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে সেও ‘মানুষ’। মানুষ হিশেবেই তার আকাশ দেখার ইচ্ছে আছে, খিদে আছে, সমাজের তোয়াক্কা না করেই ভেসে পড়বার আকুতি আছে। সর্বোপরি, চাওয়াগুলোকে স্বীকার করতে হবে নিজেদের কাছে। ভালোবাসতে জানতে হবে নিজেকে; নাহলে অন্যকেই বা কীভাবে ভালোবাসা সম্ভব! তার পেকে ওঠা মন ও শরীরের গুঞ্জরণটুকু নিজেকেই পড়তে জানতে হবে চিঠির মতো। সঙ্গোপনে। তা সে চিঠির যুগ যতই বাতিল হয়ে যাক না কেন।

ছবিঃ রাজা রবি বর্মা
 

Developed by DXDasia