
স্বয়ং অমিতাভ বচ্চনও এই দোকানে এসেছিলেন
ধরুন আপনি সকালবেলা হাঁটতে বেরিয়েছেন বা বাজারে যাচ্ছেন, কিংবা বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা চলছে, এমন সময় আপনার নাকে ভেসে এলো সেই স্বর্গীয় গন্ধ, বুঝতে পারলেন আশেপাশেই কোথাও কচুরি ভাজা চলছে। সত্যি বলুন তো, আপনার মন কি সেদিকে ছুটে যাবে না? আধুনিক কালে নানান লোভনীয় বিদেশি খাবার যতই বাঙালির মনকে টানুক, স্বাস্থ্য সচেতনতা যতই জিভে লাগাম পরানোর চেষ্টা করুক, তবু গরম তেলে ডুব সাঁতার কেটে ওঠা সদ্যস্নাত কচুরির আবেদন উপেক্ষা করতে পারেন এমন মানুষ বোধহয় বিরল। গরম কচুরি আলুর তরকারি বা ছোলার ডালের সঙ্গে জুটি বেঁধে জিভে যে স্বাদের রসায়ন ঘটায় সেই প্রেমের রসায়নে মজে আছে আট থেকে আশি।
ফিরে তাকানো যাক প্রায় একশো বছর আগের কলকাতায়। সে সময় শহরের প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলার চেহারা কেমন ছিল? আসলে শতাব্দী প্রাচীন শহরের এই জায়গায় ইতিহাস এখনও ফিসফিস করে বলে যায় অনেক কথা। কান পেতে সেসব কথা শুনতে শুনতে মনে হয় কালের নিয়মে অনেক বদল এলেও বদলায়নি এমন অনেক কিছুই তো আছে। ঠিক সে রকমই এই অঞ্চলে ইতিহাস ছুঁয়ে থাকা একটি দোকান মোহন ভাণ্ডার (Mohan Bhandar)।

আজও দেদার বিকোচ্ছে হিংয়ের কচুরি
প্রায় একশো বছর আগে সুদূর এলাহাবাদ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন ব্যবসায়ী মোহনলাল জয়সওয়াল। দূরদর্শী মোহনলাল হয়তো বুঝেছিলেন বাঙালির মনে ঢুকতে হলে জিভের পথ ধরে যাওয়াই সহজ।
প্রায় একশো বছর আগে সুদূর এলাহাবাদ থেকে কলকাতায় এসেছিলেন ব্যবসায়ী মোহনলাল জয়সওয়াল। দূরদর্শী মোহনলাল হয়তো বুঝেছিলেন বাঙালির মনে ঢুকতে হলে জিভের পথ ধরে যাওয়াই সহজ। তাই কলকাতায় এসেই খাদ্যরসিক জাতির কচুরি প্রেমকে উস্কে দিয়ে ধর্মতলার বুকে তিনি খুললেন বিখ্যাত মোহন ভাণ্ডার, যার ডাকনাম মোহনের কচুরির দোকান (Mohaner Kochuri)। দোকানে ঢুকলেই চোখে পড়বে বড়ো বড়ো করে লেখা – মোহনের গরম হিং-এর কচুরি।

মোহন ভাণ্ডারের বর্তমান কর্ণধার
নিউমার্কেটের ক্রেতা, বিক্রেতা থেকে পথ চলতি মানুষ কিংবা অফিসের টিফিনবেলায় একটু ফুরসতে বেরনো মানুষজন সবাই রোজ ভিড় করেন মোহনের এই কচুরির দোকানে। শুধু কচুরি নয়, দইবড়া, সিঙারা, মিষ্টি, চা, কুলফি প্রভৃতি খাদ্যসম্ভার নিয়ে প্রতিদিন মধ্য কলকাতার রসনা তৃপ্তি করছে মোহন ভাণ্ডার। তবে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই গরম কচুরি, সঙ্গে আলুর তরকারি, চাটনি আর স্পেশাল লঙ্কার আচার। বঙ্গদর্শন.কম এই ঐতিহাসিক দোকানে গিয়ে আলাপ করল দোকানের বর্তমান কর্ণধার শ্রী বিজয় জয়সওয়ালের সঙ্গে। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, “এই দোকান শুরু করেছিলেন আমার দাদু শ্রী মোহন জয়সওয়াল। তাঁর দেখানো পথেই এত বছর ধরে একই রকম ভাবে এই দোকান চলছে।” কিন্তু প্রায় এক শতাব্দীতে পৃথিবী বদলে গেছে অনেকটা, মানুষের রুচিতেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। এখন অনেকেই ফাস্টফুডের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন, সেখানে দাঁড়িয়েও এতদিন ধরে কীভাবে চলছে মোহন ভাণ্ডার? এই প্রসঙ্গে বিজয়বাবু জানাচ্ছেন, “আমাদের দোকানে যারা একবার খেয়ে গেছেন তারা বারবার খেতে আসেন। তাদের মধ্যে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও আছে। তাই ফাস্টফুডের বাড়বাড়ন্ত আমাদের ব্যবসায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।”
শুধু কচুরি নয়, দইবড়া, সিঙারা, মিষ্টি, চা, কুলফি প্রভৃতি খাদ্যসম্ভার নিয়ে প্রতিদিন মধ্য কলকাতার রসনা তৃপ্তি করছে মোহন ভাণ্ডার। তবে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই গরম কচুরি, সঙ্গে আলুর তরকারি, চাটনি আর স্পেশাল লঙ্কার আচার।

‘পিকু’ ছবির শ্যুটিংয়ের সময় অমিতাভ বচ্চন
ময়দার সঙ্গে বিউলির ডাল, হিং ও অন্যান্য মশলার মিশেলে তৈরি এই কচুরির টানে ছুটে এসেছেন অনেক চিত্র তারকা থেকে পরিচালক সহ বহু শিল্পী। পরিচালক সুজিত সরকার আবার তাঁর সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন ভাস্কর ব্যানার্জিকে। ভাস্কর ব্যানার্জিকে চিনতে পারলেন না? তাহলে আপনাকে মনে করিয়ে দিই ২০১৫ সালের ছবি ‘পিকু’-র কথা। সেখানে পিকুর বাবার নাম ভাস্কর ব্যানার্জি। যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন। কলকাতার কচুরির প্রতি প্রবাসী বাঙালিদের আকর্ষণের চিত্র তুলে ধরতে পরিচালক বেছে নিয়েছিলেন এই দোকানের দৃশ্যপটকে।

এখনও দোকানের দেওয়ালে স্মৃতি হয়ে আছেন বিগবি
শোনা যায়, “পুরী না গিরি কোন সম্প্রদায়ভুক্ত আপনি?” জনৈক এক ব্যক্তির এই প্রশ্নের উত্তরে বিবেকানন্দ বলেছিলেন আমি কচুরি সম্প্রদায়ের। স্বামীজীর এই রসবোধই বুঝিয়ে দেয় বাঙালির কাছে কচুরির মাহাত্ম্য কতখানি। রসেবসে থাকা বাঙালির কাছে লুচির মতো কচুরির মান্যতাও বোধহয় ত্রিভুবনব্যাপী। তাই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত নামী দামী রেঁস্তোরার পাশাপাশি ২০টি আসন বিশিষ্ট নন-এসি এই সাবেক খাবার দোকানটি আজও কলকাতাবাসীর কাছে পছন্দের ঠিকানা।