মেঘে ঢাকা তারা : নারীকেন্দ্রিক, কিন্তু নারীবাদী নয়

ত্বিক ঘটক ছিলেন বেপরোয়া শিল্পী। অর্থ ও জনপ্রিয়তার পিছনে দৌড়াননি কখনও। চলচ্চিত্রকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর সামাজিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক মতামত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। তিনি মনে করতেন, চলচ্চিত্রের প্রসারতা ও অনুভূতি উসকে দেওয়ার ক্ষমতা অন্যান্য প্রকাশ মাধ্যমের চেয়ে বেশি। তাই ছবির মাধ্যমে দর্শকের চিন্তাশক্তি উদ্দীপিত করা তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, কোনো সস্তার মনোরঞ্জন নয়। আর সেই কারণেই, বোদ্ধামহলে সুখ্যাতি অর্জন করলেও, তাঁর একের পর এক ছবি ফ্লপ করে কেবল ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছাড়া। বলা হয়, ১৯৬০-এ মুক্তিপ্রাপ্ত ঋত্বিক ঘটক-এর এই একটি ছবিই নাকি বাণিজ্যিক ভাবে সফল হয়েছিল, অর্থাৎ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। চিদানন্দ দাশগুপ্তের কথায় ‘মেঘে ঢাকা তারা’ বিশিষ্ট ও সাধারণ দুই শ্রেণির দর্শকেরই মন জয় করে। ২০১০ সালে ছবির সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় পার্থ চ্যাটার্জী লেখেন পঞ্চাশ বছর পার করেও এই ছবি বিবিধ দর্শকের মর্ম স্পর্শ করতে সক্ষম, তাই তিনি এই ছবিকে চলচ্চিত্রের এক অথেন্টিক মাস্টারপিস হিসেবে গণ্য করেন।

নীতা মেঘে ঢাকা তারা-র মুখ্য চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও সব থেকে ফ্ল্যাট চরিত্র। নীতার মধ্যে কোনো বিপরীতের দ্বন্দ্ব বা মিলন নেই। সে এক নিঃশর্ত ‘এঞ্জেল অফ দ্য হাউজ’। গোটা পরিবারের দায়িত্ব তার একার কাঁধে।

‘মেঘে ঢাকা তারা’ নিঃসন্দেহে ভালো ছবি। ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলের ব্যবহার থেকে সংগীতের প্রয়োগ, সিনেমাটোগ্রাফি থেকে অভিনয়, সব কিছুই অসাধারণ। কিন্তু সেই ভাবে দেখতে গেলে ঋত্বিকের আগে ও পরের ছবিগুলির মধ্যেও এই গুণগুলি লক্ষণীয়, এবং এ-কথাও অনস্বীকার্য যে, অন্তত ভারতীয় চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে, একটি ছবির জনপ্রিয়তা এই সকল গুণাবলীর উপর খুব একটা নির্ভরশীল হয় না। সাধারণ ভারতীয় দর্শক মূলত উপভোগ করেন সেই সব ছবি যাতে অভিনয় করেন বিখ্যাত চিত্র-তারকারা কিংবা আখ্যান ও সংগীত হয়ে ওঠে এস্কেপের পথ।

‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবির গল্পে দেশভাগের পটভূমিকায় এক উদ্বাস্তু পরিবারের মেয়ের সংগ্রাম যথেষ্ট বাস্তবধর্মী তাই এখানে এস্কেপ রুট খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ছবিতে সংগীতের ব্যবহারও মূলস্রোত বিরোধী। অন্য দিকে নীতার চরিত্রে সুপ্রিয়াদেবী ততদিনে উত্তম কুমারের নায়িকা হিসেবে খানিক দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সুচিত্রা সেনের সমতুল্য হয়ে উঠতে পারেননি। তাহলে ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র বাণিজ্যিক সাফল্যের কারণ কী? আমার মতে এই প্রশ্নের অন্যতম সমাধান লুকিয়ে আছে ছবির চরিত্রায়নের প্রক্রিয়ায়।

অতিনাটকীয় অন্তিম মুহূর্তে নীতা আর সমীহের যোগ্য থাকে না, বরং হয়ে ওঠে অনুকম্পাপ্রার্থী। আর এভাবেই, হয়তো ঋত্বিকের অজান্তে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজভুক্ত দর্শক (লিঙ্গ নির্বিশেষে) একজন স্বাবলম্বী নারীর পরাজয় দেখে সুখানুভব করার ও তাকে করুণা করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায়।

নীতা মেঘে ঢাকা তারা-র মুখ্য চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও সব থেকে ফ্ল্যাট চরিত্র। নীতার মধ্যে কোনো বিপরীতের দ্বন্দ্ব বা মিলন নেই। সে এক নিঃশর্ত ‘এঞ্জেল অফ দ্য হাউজ’। গোটা পরিবারের দায়িত্ব তার একার কাঁধে। ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জুড়ে থাকে সর্বংসহা নীতার অবিরাম আত্মত্যাগ ও নিপতন। একেবারে শেষ দৃশ্যে যক্ষাক্রান্ত অবস্থায় “দাদা আমি কিন্তু বাঁচতে চেয়েছিলাম” বলে হাহাকার ছাড়া তার উপর ঘটে চলা অন্যায়, অপমান ও শোষণের বিরুদ্ধে তাকে বিশেষ কোনো অভিযোগ বা প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না। হয়তো ছবির প্রথমার্ধে ঋত্বিক দর্শকের মনে নীতাকে একজন মহাত্মা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যাতে তার প্রতি অনায়াসেই এক প্রকার সমীহ বোধ তৈরি হয়। এবং তারপর যখন সে ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে এগিয়ে গিয়ে মাত্র একটিবার নিজের বাঁচার ইচ্ছে প্রকাশের সুযোগ পাবে, তখন যেন তাকে সহসা আত্মকেন্দ্রিক না মনে হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই অতিনাটকীয় অন্তিম মুহূর্তে নীতা আর সমীহের যোগ্য থাকে না, বরং হয়ে ওঠে অনুকম্পাপ্রার্থী। আর এভাবেই, হয়তো ঋত্বিকের অজান্তে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজভুক্ত দর্শক (লিঙ্গ নির্বিশেষে) একজন স্বাবলম্বী নারীর পরাজয় দেখে সুখানুভব করার ও তাকে করুণা করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায়। সেই সুযোগের টানেই হয়তো বেশিরভাগ দর্শক বার বার ফিরে এসেছে এই ছবির কাছে।

এই প্রসঙ্গে ‘সুবর্ণরেখা’-র সীতার সঙ্গে নীতার তফাৎ খুব তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সুবর্ণরেখা’ ছবির শেষে সীতা লজ্জায় আত্মহননের পথ বেছে নিলেও সে নীতার থেকে বেশি স্বাতন্ত্র্য। সে যখন বাড়ি থেকে পালিয়ে তার পছন্দের মানুষ অভিরামকে বিয়ে করে, এবং পরবর্তী পর্যায়ে অনটনের শিকার হয়ে যখন বেশ্যাবৃত্তির চিরাচরিত পথ বেছে নেয়, তখন দর্শকের সব রকমের মরাল এক্সপেক্টশনে সে আঘাত করে। এভাবেই ঋত্বিক নীতার চেয়ে সীতাকে কিছুটা বেশি এজেন্সি দেন। কিন্তু দর্শকের মনে সীতা কতটা সহানুভূতি বা অনুকম্পার জন্ম দেয় তা বোঝা মুশকিল । এবং সীতার আত্মহনের মধ্যেও এক প্রকার এজেন্সি নিহিত থাকে। এ যেন আত্মহত্যার মাধ্যমে সীতা তার ব্যাভিচারের যথার্থ শাস্তি এড়িয়ে গেল। তাই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিতে এই মৃত্যু দেখার মধ্যে কোনো সুখও নেই শান্তিও নেই, যেমনটা আছে নীতার মতো একজন নৈতিক নারী চরিত্রের পিউনিটিভ মৃত্যু দেখার মধ্যে।

ঋত্বিক সচেতন ভাবে পুরুষতান্ত্রিকতার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না। বরং বাংলা ছবিতে মেয়েদের কোমল ও দুর্বল চরিত্রায়নের ঘোর বিরোধিতা করতেন। এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য সংগৃহীত আছে ‘নিজের পায়ে নিজের পথে’ বইতে। তবুও ‘মেঘে ঢাকা তারা’ পুরুষতন্ত্রের গালে সপাটে চড় কষাতে পারে না, কারণ নীতা যথেষ্ট শক্তিশালী চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও শেষমেশ কোমল ও দুর্বল। তার কোনো ইম্যান্সিপেশন ঘটে না। সে এক রূপকের পর্যায়ে আবদ্ধ থেকে যায়। নারীকেন্দ্রিক হয়েও নারীবাদী নয় বলেই বোধহয় এই ছবি জনপ্রিয়।

________

ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা | চিত্রনাট্য: ঋত্বিক ঘটক | মূল উপন্যাস: শক্তিপদ রাজগুরু | প্রযোজক: চিত্রকল্প | সংগীত: জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র | অভিনয়ে: সুপ্রিয়া চৌধুরী, অনিল চ্যাটার্জি, বিজন ভট্টাচার্য, গীতা দে, গীতা ঘটক

Written by