
আজ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের ১৯৮তম জন্মবার্ষিকী
পলাশীর যুদ্ধের পর একশো বছর ধরে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একের পর এক ভারতীয় রাজ্য দখল করে চলেছিল। কখনও যুদ্ধ করে, কখনও বা ছলে বলে কৌশলে। বাদ যায়নি অওধও। ১৮৫৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি অওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ তাঁর মাথার তাজ জেমস উট্রামের হাতে তুলে দিলেন। আত্মীয়-পরিজনকে নিয়ে লখনৌ ছাড়লেন সেই বছরেরই ১৩ মার্চ। রওনা দিলেন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীর উদ্দেশ্যে। মে মাসে জেনারেল ম্যাকলয়েড নামের এক স্টিমার এসে গঙ্গার ঘাটে ভিড়ল। কলকাতায় পা রাখলেন ওয়াজিদ আলি শাহ। একুশটি তোপধ্বনি করে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। মেটিয়াবুরুজে থাকতে লাগলেন রাজ্যচ্যূত নবাব।
এদিকে পরের বছর মহাবিদ্রোহের আগুনে জ্বলে উঠল গোটা ভারত। ওয়াজিদ আলি শাহকে গৃহবন্দি করা হল ফোর্ট উইলিয়ামে। ২৫ মাস সেখানে ছিলেন তিনি। মুক্তি পাওয়ার পর মেটিয়াবুরুজে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘ছোটা লখনৌ’। ব্রিটিশের দেওয়া পেনশনের টাকায় একের পর এক প্রাসাদ বানাতে থাকেন। তৈরি করেন নিজস্ব চিড়িয়াখানা। একত্রিশ বছর এই ছায়া-রাজত্ব নিয়েই কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। তবে জৌলুস ছিল ষোলো আনা। আইনি ব্যাপার ছাড়া ব্রিটিশরাও সেখানে নাক গলাতেন না। মাসিক এক লক্ষ টাকা পেনশন আর ছ’হাজার প্রজা নিয়ে জাঁকিয়ে বসেন প্রাক্তন নবাব। রাজকীয় মেজাজে দেদার টাকা খরচ করতেন, পেনশনের অর্থে টান পড়ত। এই নিয়ে ব্রিটিশদের সঙ্গে টানাপোড়েন লেগেই থাকত।
ওয়াজিদ আলি শাহ নিজে ছিলেন শিল্পী এবং সাহিত্যিক। নবাব হওয়ার আগেই ১৮৪৩ সালে ভাই সিকন্দর হাসমতের সম্মানে এক জলসার আয়োজন করেছিলেন তিনি। ওয়াজিদের রচিত নাটক ‘রাধা কানহাইয়া কা কিসসা’ তাতে মঞ্চস্থ হয়। প্রথম আধুনিক উর্দু নাটক হিসেবে এটি স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি সৃষ্টি করেছিলেন ‘রহস’ নামের এক বিশেষ আঙ্গিকের নৃত্যনাট্য। মহারাজ ঠাকুর প্রসাদের থেকে কত্থক শিখেছিলেন ওয়াজিদ আলি শাহ।
কলকাতায় নির্বাসিত প্রাক্তন নবাব ওয়াজিদের পৃষ্টপোষকতায় ধ্রুপদী শিল্প-সংস্কতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে মেটিয়াবুরুজ। এখানে আরও পরিণত আকারে ‘রাধা কানহাইয়া কা কিসসা’ মঞ্চস্থ হতে থাকে। ১৮৫৯ থেকে ১৮৭৫-এর মধ্যে মেটিয়াবুরুজে অন্তত ২৩টি জলসার আয়োজন করেন তিনি।
শোনা যায়, ১৮৬৭ সালে হোলির সময়ে মেটিয়াবুরুজের দরবারে নর্তকীর বেশে নৃত্য পরিবেশন করেন ওয়াজিদ আলি শাহ। ঠুমরি গেয়ে শোনান। নবাব নিজেও গান লিখতেন। এই সময়ে লখনৌ ঠুমরির কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল মেটিয়াবুরুজ। ঠুমরির আকর্ষণে সেখানে আসতেন রাজা সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর। এছাড়াও হাজির থাকতেন যদুভট্ট, অঘোরনাথ চক্রবর্তীর মতো সঙ্গীতজ্ঞরা। কত্থক নিয়ে নবাব এক সচিত্র বই লিখেছিলেন। যার নাম ‘মুসাম্মি কি বানি। তিনি যন্ত্রসঙ্গীতেও দক্ষ ছিলেন। কুতুব আলি খানের থেকে নিয়েছিলেন সেতারের তালিম। তাঁর পৃষ্টপোষকতায় উস্তাদ বসত খান মেটিয়াবুরুজের দরবারে রবাব এবং সুরশৃঙ্গার নিয়ে আসেন। কেউ কেউ বলেন, উস্তাদ নিয়ামতুল্লা খান আধুনিক সরোদের জন্ম দেন এখানেই।
রাজত্ব হারালেও, রাজকীয় মেজাজ ছাড়তে পারেননি ওয়াজিদ আলি শাহ। তবে লখনৌ ছেড়ে আসার যন্ত্রণা কখনও মন থেকে যায়নি। নির্বাসিত অবস্থায় তিনি বলেছিলেন, “একটা সময় ছিল, যখন আমার পায়ের তলায় থোকা থোকা মুক্তো চাপা পড়ত। এখন শুধু ওপর থেকে এক নিষ্ঠুর রোদ আর পায়ের তলায় কাঁকর”। এই কথার মধ্যে যেমন প্রকাশ পায় প্রাক্তন নবাবের দীর্ঘশ্বাস, তেমনি এক শিল্পরসজ্ঞ কবি মনেরও পরিচয় পাওয়া যায়।
তথ্যঋণ – শঙ্করলাল ভট্টাচার্য, সুতপা যতি, সায়ন্তনী নাগ, ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী।
