পন্টুন ব্রিজ থেকে হাওড়া ব্রিজ—বিস্ময় ও ইতিহাসের সেতু
“হাওড়ার ব্রিজ চলে মস্ত সে বিছে
হ্যারিসন রোড চলে তার পিছে পিছে।”
‘সহজ পাঠ’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে যে হাওড়া ব্রিজকে নিয়ে ছড়া কেটেছিলেন রবীন্দ্রনাথ সে অবশ্য আজকের ব্রিজটি নয়। সে হল আদি হাওড়া ব্রিজ থুড়ি পন্টুন ব্রিজ। আজকের হাওড়া ব্রিজের পূর্বপুরুষ। আজকের ব্রিজটি চালু হল ১৯৪৩ সালে। পুরোনো ব্রিজের কথা মাথায় রেখে তখন এর নাম দেওয়া হয়েছিল নিউ হাওড়া ব্রিজ। অবশ্য, লোকমুখে সে ব্রিজ কেবলই হাওড়া ব্রিজ। জন্মের পর থেকেই এই ব্রিজ একটা বিস্ময়। ‘হাওড়া ব্রিজ’ নামে সিনেমাও বেরিয়ে গেল বলিউডে। কবিতার বই লিখলেন ভিনদেশি কবি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা নাকি বোমা ফেলতে চেয়েছিল নির্মীয়মান এই ব্রিজ তাক করেই। এ ব্রিজের ব্যাপারই আলাদা।
তবে, পুরোনো পন্টুন ব্রিজকে নিয়েও কম মুগ্ধতা ছিল না শহরবাসীর। জাহাজ, স্টিমার চলাচলের জন্য সেই ব্রিজকে আবার দুভাঁজ করা যেত। আদি হাওড়া ব্রিজ অবশ্য ঠিক আজকের ব্রিজের জায়গায় ছিল না। ছিল খানিক দক্ষিণে। আর, সেই ব্রিজকে নিয়েও গল্পের শেষ নেই।
আদি হাওড়া ব্রিজ তথা পন্টুন ব্রিজ
উনিশ শতক। কলকাতা তখন ক্রমে তিলোত্তমা হয়ে উঠছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পসার জমেছে ভালোই। ফলে, যাতায়াত, মালপত্তর, কাঁচামাল—সবকিছুর জন্যই বারবার পেরোতে হচ্ছে গঙ্গা। জলপথে যাতায়াতে অসুবিধে, সময়ও লাগে। তাই প্রয়োজন পড়ল সেতুর। ১৮৩৮ সালের নভেম্বরে ‘বেঙ্গল হেরাল্ড’ পত্রিকা থেকে জানা যাচ্ছে— ‘হুগলি নদীর উপরি পুল করণে গবর্ণমেন্ট মনস্থ করিয়াছেন ঐ পুল নির্ম্মাণ করণার্থ ব্যয় ১২০০০০০ টাকা নির্দ্ধার্য্য হইয়াছে।’ সেযুগে এ বিরাট টাকা। ১৮৫২ সালে হাওড়া স্টেশন চালু হয়ে যাওয়ার পর ব্রিজের প্রয়োজন আরো বাড়ল। জরিপ হল। জর্জ টার্নবুলের দেওয়া পলতার কাছে ব্রিজ তৈরির প্রস্তাব নাকচও হল। ইতিমধ্যে, ১৮৭০-এ তৈরি হল পোর্ট ট্রাস্ট। ১৮৭১-এ শুরু হল পুরোদমে ব্রিজ গড়ার কাজ। ব্রিজের কাঠামো ও যন্ত্রাংশ তৈরি হয়েছিল ইংল্যান্ডে।
ব্রিজ তৈরি হতে না হতেই বিপদ। ১৮৭৪ সালের ২০ মার্চ। বিকেল গড়াতেই টাইফুন ধেয়ে এল কলকাতায়। সেই ঝড়ে ‘এগেরিয়া’ নামের একটা স্টিমার গিয়ে ধাক্কা মারল নির্মীয়মান পন্টুন ব্রিজে। তিনটি পন্টুন ডুবে গেল। অন্তত ২০০ ফুট বিধ্বস্ত ধ্বংস হল ব্রিজের। ফের শুরু হল মেরামতির কাজ। শেষপর্যন্ত, এত কাণ্ডের পরে ব্রিজ চালু হল ১৮৭৪-এর ১৭ অক্টোবর। ব্রিজের তদারকির দায়িত্ব পেল পোর্ট ট্রাস্ট।
পুরোনো ও নতুন হাওড়া ব্রিজের জন্য তৈরি হওয়া আইন
পন্টুন ব্রিজ ছিল ভাসমান ব্রিজ। ফলে, মাঝেমাঝেই সেতুকে গঙ্গাবক্ষে জাহাজ, স্টিমার চলাচলের জন্য ভাঁজ করা হত। দু’পাড়ের যানবাহন, পথচারীদের তখন থাকতে হত অপেক্ষায়। ১৫২৮ ফুট লম্বা ছিল এই ব্রিজ। চওড়ায় ৬২ ফুট। দু’পাশে ৭ ফুট করে পথচারীদের হাঁটার রাস্তা। মাঝখানে গাড়ি, মালপত্তর যাওয়ার পথ। সেতু গড়তে সেকালে খরচ পড়েছিল ২২ লক্ষ টাকা। এমন ব্রিজ দেখে শহরবাসীর তাক লেগে গেল। তবে, সবাই যে খুশি হয়েছিল তেমনটা নয়। ‘ভারত সংস্কারক’ পত্রিকাই যেমন গঙ্গাবক্ষে এই সেতুর গুণমান নিয়ে বেশ সন্দিহান ছিল। তবে, গুণমানের জন্য নয়, এই ব্রিজ নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের দুশ্চিন্তা বাড়ল অন্য কারণে। ব্রিজ গুটিয়ে রাখার সময়ে অপেক্ষারত গাড়ি-ঘোড়া-যাত্রী-পথচারীদের বিরক্তি ক্রমশ বাড়ছিল। অনেকে ট্রেন মিস করছিলেন। ঠিক হল, দিনে গাড়ি-যাত্রী আর রাতে নৌকো-স্টিমার-জাহাজ চলাচল করবে। তাতেও সমস্যা মিটল না যখন, শুরু হল স্থায়ী ঝুলন্ত সেতু গড়ার পরিকল্পনা।
একবার ব্রিজের নকশা চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল। যার নকশা পছন্দ হবে তিনি পাবেন তিন হাজার পাউন্ড টাকার পুরস্কার। ইতিমধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রাজধানী স্থানান্তরণ ইত্যাদির জন্য ব্রিজ গড়ার কাজ পিছোতেই থাকল। ১৯২২-এ মুখার্জি কমিশনের সুপারিশে গড়া হল নিউ হাওড়া ব্রিজ কমিশন। ব্রিজ গড়ার জন্য গ্লোবাল টেন্ডার ডাকা হল। সেখানে সবচাইতে কম দর দিয়েও বাতিল হয়ে গেল জার্মানির একটি সংস্থা। কারণ, ততদিনে জার্মানি ও ইংল্যান্ডের মধ্যে ফের টানাপোড়েন শুরু হয়ে গেছে। শেষে, ১৯৩৫-এ ব্রিজ গড়ার বরাত পেল ‘ব্রেথওয়েট’, ‘বার্ন’ ও ‘জেশপ’ সংস্থা। ব্রিজের নকশা আঁকলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি জেমস এম রেনডেল আর তাঁর দুই সঙ্গী পালমার ও ট্রিটন। কাজ শুরু হল পরের বছরই। এই ব্রিজ গড়তে টাটা স্টিল জোগান দিয়েছিল ২৬ হাজার ৫০০ টন ইস্পাত।
আদি হোক বা নতুন– হাওড়া ব্রিজ তৈরির সময় বিপত্তি ঘটবেই। নতুন ব্রিজ গড়ার সময়ও গঙ্গার মাটি খুঁড়ে স্তম্ভ বসাতে গিয়ে বিপুল মালপত্র গেঁথে গেল মাটির নিচে। রীতিমতো ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল কলকাতার নানা অঞ্চল। গঙ্গাপাড়ের একটা মন্দিরও ভেঙে পড়ল কম্পনে। আবার, গঙ্গাবক্ষ থেকে সেই মালপত্র উদ্ধারের সময়ই মিলল সুলতানি, মুঘল আমলের নানা মুদ্রাও।
শুরুর দিকের ছবি
ইতিমধ্যে হইহই করে এসে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তার মধ্যেই কাজ চলেছিল ব্রিজের। জাপানি বোমারু বিমানের ভয় মাথায় নিয়েই। এই জাপানি বোমার ভয়েই হাওড়া ব্রিজের উদ্বোধন ঘটা করে করা হয়নি। আগে থেকে তেমন কিছু ঘোষণাও করা হয়নি। ১৯৪৩-এর ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে একটা ট্রাম কলকাতা থেকে ব্রিজ পেরিয়ে পৌঁছায় হাওড়া স্টেশনে। ব্যাস চালু হয়ে যায় ব্রিজ।
তারপর থেকেই উচ্চতায় ৮২ মিটার, চওড়ায় ৭১ ফুটের এই ব্রিজ হয়ে উঠল কলকাতার ল্যান্ডস্কেপের এক অনিবার্য অঙ্গ। ডাকনামে ‘হাওড়া ব্রিজ’ হলেও সে এই মহানগরীরই অন্যতম সিগনেচার। ঋত্বিক ঘটকের ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ সিনেমাটির কথা মনে পড়ে? সেখানেও নতুন শহরকে চেনার শুরু এই বিস্ময়কর ব্রিজ ধরেই। এরপর, একাধিক সিনেমায় হাওড়া ব্রিজের ফ্রেম এই শহরের গপ্প বুনতে বুনতে গেছে। ১৯৫৮-তে মুক্তি পেয়েছে হিন্দি সিনেমা ‘হাওড়া ব্রিজ’। রোনাল্ড জফের ‘সিটি অফ জয়’-এর পোস্টারেও স্থায়ী এই ব্রিজ। হালের ‘বরফি’ কিংবা ‘যুবা’র মতো সিনেমাতেও বলিউড কলকাতাকে চিনেছে এই ব্রিজকে পাশে রেখেই। এই সেতুতে মজেছেন ভিনদেশি কবিও। ১৯৬১ সালে প্রকাশ পেয়েছে নিউজিল্যান্ডের প্রখ্যাত কবি জেমস কে ব্যাস্টার-এর লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘Howrah Bridge and Other Poems’। দেশ-বিদেশের সাহিত্যিক-শিল্পী-চলচ্চিত্র পরিচালকদের বুঁদ করে রাখার মতো এমন ব্রিজ গোটা ভারতে আর একটিও নেই। এই আশ্চর্য লোহার জালবাহার নাইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পেল্লায় ব্রিজ যেন একটি আশ্বাস। এবং মুগ্ধতাও।
মোহময়ী
সাতাত্তরটি বছর পার করা হাওড়া ব্রিজ সরকারিভাবেই এখন বুড়ো। কিন্তু, স্বাস্থ্য টাল খায়নি একটুও। ক্লান্তি এসেছে কি তার? ইঞ্জিনিয়াররা মাথা কুটে মরছেন তা জানতে। তাকে আজো মোহময়ী লাগে রাতের বেগুনি আলোয়। রোজ হাওড়া স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরা মানুষগুলো এখনো মাঝেমাঝে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেন ব্রিজের লোহার নকশার জাল। নিচের গঙ্গা আগের চাইতে ক্ষীণ হয়েছে। দুপাশের দুই শহরই বেড়ে উঠেছে আরো ঘনজমাট হয়ে। শহরে গরম বেড়েছে, দূষণ বেড়েছে, ক্ষয় বেড়েছে। হাওড়া ব্রিজ এই গড়িয়ে যাওয়া সময়কে দেখছে উঁচু থেকে। তার কাজই তো জুড়ে থাকা। নিছক দুই পাড়কে নয়, বদলাতে থাকা সময়কেও।
“চুড়োয় শূন্য তুলে ধরে হাওড়া ব্রিজ
পায়ের নীচে গড়িয়ে যায় আবহমান।”
(‘পুনর্বাসন’, শঙ্খ ঘোষ)
লেখায় ব্যবহৃত উদ্ধৃতিচিহ্নের বানান পরিবর্তন করা হয়নি।
তথ্যসূত্রঃ Durkee Jackson, National Steel Bridge Alliance: World's Longest Bridge Spans, বিজয়িনী, মৃদুল দাশগুপ্ত; হাওড়ার ব্রিজ চলে মস্ত সে বিছে, সুস্নাত চৌধুরী (রোববার, প্রতিদিন, ৮ এপ্রিল, ২০১৮ ), howrahbridgekolkata.gov.in