খিঞ্জির, খিদ্‌র না কিডার—খিদিরপুরের নামের মূলে গোলকধাঁধাঁ

সবুজ চারণভূমি, কিড সাহেব, দরিয়ার পির—এমন নামের মূলে কে?

কেউ খুঁজে পান একদা এ অঞ্চলের শুয়োর-আধিক্যের ইতিহাস, কেউ বা খুঁজে পান সাহেবের নাম। দরিয়ার পিরকেও বাদ দিতে পারেন না অনেকেই। খিদিরপুরের নামকরণের কারণ খুঁজতে গিয়ে এমন চমকপ্রদ সব তথ্যই ভিড় জমায়। এমনই সে নামের মহিমা!

খিদিরপুর। গঙ্গাপারের এই অঞ্চলকে বলা যেতেই পারে বাংলা আখ্যানকাব্যের পীঠস্থান। মাইকেল মধুসূদন দত্ত, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসা ছিল এখানে। তাছাড়া, ভূকৈলাস রাজবাড়ি তো বিখ্যাত। এই রাজবাড়ি থেকে সামান্য দূরে ‘সোনাই’ নামক জায়গায় বেশ সুন্দর একটি অট্টালিকা তৈরি করেছিলেন একসময়ের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ও। 

মাইকেল মধুসূদন দত্তর বাড়ির সাম্প্রতিক অবস্থা

খিদিরপুরের গলার মণিহারটি যে বেশ ভারী, সন্দেহ নেই। পাশেই গঙ্গা। পূর্বে আলিপুর, দক্ষিণ-পশ্চিমে গার্ডেনরিচ ও মেটিয়াবুরুজ। তবে, খিদিরপুরের নাম শুনলে প্রথমেই মনে পড়ে জাহাজের কথা, ডকের কথা। সেই বন্দরের কাল পুরোপুরি শেষ না হলেও আজ খানিক স্তিমিত। বড়ো জাহাজ আর ঢুকতে পারে কই মজে আসা গঙ্গাপথে? তবু, খিদিরপুর আছে। গৌরবের স্মৃতি নিয়ে, আজকের হই-হট্টগোল ব্যস্ততা নিয়ে, ইতিহাস নিয়ে।

কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি

ইংরেজরা কলকাতায় এসে কেল্লা গড়বে বলে জমি নেবে ঠিক করল। গোবিন্দপুরে নাকি সেই কেল্লা হবে। ১৭৬৭-১৭৬৯ সালে ‘গভর্নর অব বেঙ্গল’ ছিলেন হ্যারি ভেরেস্ট। তাঁর দেওয়ান ছিলেন রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল। তাঁর জমি ছিল অধুনা ফোর্ট উইলিয়াম অঞ্চলে। সেই জমির বিনিময়ে খিদিরপুরে জমি পেলেন রাজা জয়নারায়ণ। খিদিরপুরে তখন খুব বেশি মানুষ থাকে না। জঙ্গল অধ্যুষিত এই খিদিরপুরেই ১০৮ বিঘা জমিতে একটি রাজবাড়ি তৈরি করলেন জয়নারায়ণ। প্রতিষ্ঠা করলেন শিব ও কুলদেবীর মন্দির। সেটা ১৭৮১ সাল। 

ভূকৈলাস রাজবাড়ির শিবমন্দির

এরপর, ধীরে ধীরে জনবসতি বাড়তে থাকে খিদিরপুরে। গঙ্গার স্বাস্থ্য তখন বেশ ভালো। বড়ো বড়ো জাহাজ দিব্বি ঢুকে আসে কলকাতায়। গঙ্গাতীরবর্তী খিদিরপুরের অবস্থানগত গুরুত্ব বুঝতে তাই বিশেষ দেরি হয়নি ব্রিটিশদের। কলকাতায় বিরাট বিরাট ক্রেন, জেটি, শেডসমেত পুরোদস্তুর বন্দর বানানোর কাজ শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি। খিদিরপুরে ডক তৈরির কাজ শুরু হয় ১৮৮৪-তে। কাজ শেষ হয় ১৮৯২-তে। জাহাজের ভোঁ তখন নিত্যসঙ্গী এই অঞ্চলের। কাজের সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় জনবসতি আরো ঘন হয়েছে। ১৯০৯ সালে কটন সাহেব লিখছেন, খিদিরপুরে নেটিভরা গিজগিজ করছে। বাজার, বস্তি, গির্জা, মসজিদ, মহল-বাড়ি, হেমচন্দ্র পাঠাগার এবং মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরির মতো কলকাতার অন্যতম পুরনো দুটি পাঠাগার—কী নেই এখানে! আর আছে বিখ্যাত গঙ্গাবক্ষে দু’ভাঁজ হওয়া ব্রিজ। একসময়ে যে এই অঞ্চল জঙ্গলে ভরা ছিল, কে বলবে সেই কথা!

‘ইন্ডিয়ান সিমেন’স ইউনিয়ন’-এর মতো শহরের অন্যতম পুরনো কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়নের জন্মও হয়েছিল কর্মচঞ্চল খিদিরপুরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সমর্থনে ফরাসি ও ওলন্দাজি জাহাজকে বয়কটের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন এখানকার কর্মী-শ্রমিকরা। জাপানি বোমাও পড়েছিল খিদিরপুরে। প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল ব্যাপক। এই ভোল বদলানো খিদিরপুরকে দেখে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক বটে। তবে, এই অঞ্চলের নামের রহস্য ভেদ করতে গেলে শুধু বিস্ময় নয়, ধাঁধাঁও লেগে যেতে পারে।

খিদিরপুরের ব্রিজ

সুকুমার সেন ‘বাংলার স্থাননাম’ বইতে বলেছেন, খিদিরপুর নামটি ‘খিঞ্জিরপুর’-এর অপভ্রংশ। আরবি ভাষায় ‘খিঞ্জির’ শব্দের অর্থ শুয়োর। এককালে গঙ্গাতীরবর্তী এই অঞ্চলে নাকি শুয়োরদের ভারী রমরমা ছিল। সেই থেকেই অঞ্চলের নাম ‘খিঞ্জিরপুর’ থেকে নাকি লোকমুখে বদলাতে বদলাতে হল খিদিরপুর।

তবে, ভিন্নমতও আছে। প্রচলিত মতে ‘কিডারপুর’ লোকমুখে বদলে হয়েছে খিদিরপুর। এই ‘কিডারে’র মূলে থাকা কিড সাহেব হলেন শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেনের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট কিডের ছেলে জেমস কিড। জেমস কিড ১৮০৭ সালে এই অঞ্চলে একটি ডক প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকেই নাকি অঞ্চলটির নাম হয়ে যায় কিডারপুর। তা থেকেই কালক্রমে খিদিরপুর।

এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষদের বসবাস। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী দরিয়ার পিরের নাম খাজা খিজির। খিজির ফার্সি শব্দ। আরবি ভাষায় খিজিরের উচ্চারণ-ভেদ ‘খিদ্‌র’। এই খাজা খিজির বা খাজা খিদ্‌র থেকেই খিদিরপুর নামের উৎপত্তি বলে অনেকের ধারণা। 

অসিত দাস বলছেন, ‘খিদ্‌র’ শব্দটির অন্য একটি অর্থ হল সবুজ। কথিত আছে, খাজা খিজির নাকি আবে হায়েতের ঝরনায় স্নান করার পর তাঁর গাত্রবর্ণ সবুজ হয়ে গিয়েছিল। গঙ্গার পাড়ে সবুজে ঢাকা এই অঞ্চল দেখে কি সেই অনুষঙ্গই মনে পড়েছিল কাজের সূত্রে এখানে বসতি গড়তে আসা ধর্মপ্রাণ মুসলমান মানুষদের? সেই থেকেই কি অঞ্চলটির নাম হল খিদিরপুর? অর্থাৎ, সবুজ তৃণভূমিতে ঢাকা অঞ্চল। যেভাবে, খিদিরপুরের পাশেই বাগানবাড়ি, গাছ-গাছালির স্মৃতিকে আঁকড়ে রয়েছে গার্ডেনরিচ। 

আবার, এখানে নাকি খয়েরের ব্যবসা ছিল একসময়। খয়েরের বিশুদ্ধ নাম হল ‘খদির’। এই ‘খদিরপুর’ থেকেই খিদিরপুর নামকরণের সম্ভাবনাকেও উস্কে দিয়েছেন অসিত দাস। 

মতের ওপর মত চেপে বসে। সময়ের উলটো দিকে সাঁতার দিয়ে পুরনো নামটি খুঁজে পাওয়াও কঠিন। ফলে, নামের ব্যুৎপত্তি, তার সঙ্গে লেপ্টে থাকা ইতিহাস, মিথ নিয়ে তর্কে মাততেই থাকেন পণ্ডিত-ঐতিহাসিক-ভাষাবিদেরা। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তাতে ক্ষতি নেই কিছুই। নামের এক-একটি ব্যাখ্যায় চমক লাগার মতো এক-একটি অনুষঙ্গ। এই যেমন, খিদিরপুরের নামের আড়ালেই শুয়োর থেকে কিড সাহেব—কত কিছুর খোঁজই না পেয়েছেন পণ্ডিতরা। এতে দিব্বি মেতে থাকা যায়।

অতি চেনা অঞ্চলটাকেও এই নামের ধাঁধাঁর ভিতর দিয়ে দেখলে কেমন অচেনা, অন্যরকম লাগে। সেও মন্দ কী?

তথ্যসূত্রঃ বাংলার স্থাননাম, সুকুমার সেন; নেমপ্লেট, অসিত দাস, রোববার, প্রতিদিন, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭; Calcutta Old and New, H.E.A Cotton, Calcutta and its Hinterland, P. Banerjee.

ছবি: উইকিপিডিয়া

Post Tags
Developed by DXDasia