
মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে, এক সাক্ষাৎকারে মহাশ্বেতা দেবী-কে প্রশ্ন করা হয়, যে লেখা তাঁকে জ্ঞানপীঠ এনে দিয়েছে, সেই হাজার চুরাশির মা (Hajar Churashir Maa by Mahasweta Devi) উপন্যাসে কোনো ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার ছাপ কি ছিল? লেখার অলিগলিতে কথকের আড়ালে প্রচ্ছন্ন লেখকের সত্যি জীবনের গল্প আস্বাদ করতে পাঠক যে মুখিয়ে থাকেন, এ প্রশ্ন সেই প্রবণতার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিকই। কিন্তু সে প্রশ্নে সিলমোহর দিয়ে মহাশ্বেতা দেবী সেদিন নিজেই বলেছিলেন, উপন্যাসের ব্রতী গড়ে উঠেছে তাঁরই পুত্র নবারুণের আদলখানি নিয়ে। যদিও পঞ্চাশ বছর পর এ উপন্যাস ফিরে দেখার সময় সুজাতার যন্ত্রণার দাহ এত নিরেট অস্ত্রে বিঁধে পাঠকের মর্মমূল বিদ্ধ করে ফেলে যে, জীবনের ছায়াপাত সংক্রান্ত প্রশ্ন অবান্তর, অপ্রয়োজনীয় ঠেকে। “বিচলিত হবার দরকার নেই, কেননা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছুই ঘটেনি। কয়েক হাজার ছেলে নেই বটে, কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না।” ঠিক একুশ বছরের ছেলের মৃত্যুর দু-বছরের মাথায় মায়ের মুখে বসানো এই সংলাপ পাঠককে নিশ্চয় সেদিনও অস্বস্তিতে ফেলেছিল, কিন্তু পঞ্চাশ বছরেও সেই একইরকম অপরিবর্তনীয় নির্জীব নিস্পৃহতার ভার শিউরে তোলে আমাদের, আঙুলের পাতায় জমে-ওঠা ঘামবিন্দুর মতো বিনবিনে বিরক্তি জমতে থাকে সারা শরীরে, যাকে মুছতে চাইলেও অলক্ষ ছাপ এড়ানো যায় না কিছুতেই।
‘হাজার চুরাশির মা’ শব্দবন্ধের মধ্যেও, মা কে অথবা কার, সেকথা কোথাও স্পষ্ট নিশানায় বলা নেই। প্রথমে মনে হয়, একটা বেয়াড়া প্রাণহীন সংখ্যার পরে ‘মা’-এর মতো একটা তীব্র আবেগমেশা শব্দকে অদ্ভুত আত্মীয়-সম্পর্কে খানিক আলগোছেই যেন জুড়ে বসানো হয়েছে।
উপন্যাসটির সঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কির মা-র ছাঁদ মেলে কিনা, সে নিয়েও কথা উঠেছে বিস্তর। দুনিয়াকাঁপানো অক্টোবর বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে লেখা সে-উপন্যাসেও মুখ্য চরিত্র নিলোভ্নার ব্যক্তিপরিচয় ফিকে হয়েছে আস্তে আস্তে, গাঢ়তর জানান এসেছে, তিনি পাভেলের ‘মা’। সমাজ বদলাতে-চাওয়া ছেলের আদর্শে, চিন্তায়, বিশ্বাসে ও প্রত্যয়ে আদ্যন্ত বদল হয় তাঁর। ক্রমপরিণতিতে নিলোভ্না ছেড়ে ফেলেন নিরীক্ষকের খোলস, ছেলের দীর্ঘমেয়াদি হাজতবাস তাঁকে সরাসরি করে তোলে দ্রোহের শরিক, শুধু পাভেল নয়, তার মতো একই স্বপ্নে স্পন্দিত হওয়া হাজার ছেলের এই ‘মা’ উপন্যাসের শেষে নিজেও বন্দি হন কারাগারে। স্বামীর বেধড়ক মারের ভয়ে বাড়িতে এককালে কাঁটা হয়ে থাকা ভিতু, সচকিত সেই মা তখন পুলিশি ধরপাকড় আর অত্যাচারের মুখেও আশ্চর্য নির্ভীক। ‘হাজার চুরাশির মা’ উপন্যাসেরও মূল মডেল এই ‘মা’ হয়ে-ওঠার সফর। এই মাতৃত্ব শারীরবৃত্তীয় নয়, যদিও সুজাতা এবং নিলোভ্না— দুজনেই জৈবিকভাবেই পুত্রের জননী। কিন্তু বাৎসল্য তাঁদের মাতৃত্বের কাঠামোকে গড়ে দেয়নি, তাঁদের তৈরি করেছে ঘটনার অভিঘাত। উপন্যাসের নামের মধ্যেও এই ইঙ্গিত নিহিত। একদিকে, গোর্কির উপন্যাসে নিলোভ্নার নাম মুছে গেছে উপন্যাসের নামে জ্বলজ্বল করে-ওঠা ‘মা’ সম্বোধনের গৌরবে। ‘হাজার চুরাশির মা’ শব্দবন্ধের মধ্যেও, মা কে অথবা কার, সেকথা কোথাও স্পষ্ট নিশানায় বলা নেই। প্রথমে মনে হয়, একটা বেয়াড়া প্রাণহীন সংখ্যার পরে ‘মা’-এর মতো একটা তীব্র আবেগমেশা শব্দকে অদ্ভুত আত্মীয়-সম্পর্কে খানিক আলগোছেই যেন জুড়ে বসানো হয়েছে। কিন্তু সম্বন্ধপদটিকে আবছা রাখার এই প্রয়াস ইচ্ছাকৃতই। কারণ, কাহিনি যত গড়াবে, সুজাতা বুঝবেন, “ব্রতী তাঁকে, তাঁর নিঃসঙ্গ শোকের একাকিত্বে রেখে চলে যায়নি। তাঁর মতো আরও বহুজনের সঙ্গে তাঁকে এক করে, আত্মীয় পাতিয়ে দিয়ে গেছে।” সুজাতা আসলে ‘হাজার চুরাশিতমর মা’ থেকে হয়ে উঠছেন ‘হাজার চুরাশি জনের মা’, ‘ব্রতীর মা’ থেকে হয়ে উঠছেন ‘বিজিত-পার্থ-লাল্টু-সমুদেরও মা’। তফাৎ শুধু একটা জায়গাতেই। গোর্কির ‘মা’ ছেলেকে বুঝেছেন তার সাহচর্যেই, তারই কাজের সঙ্গী হয়ে। প্রশ্নে-অপ্রশ্নে, কখনও নিরুচ্চার সম্মতিতে, কখনও স্নেহজড়িত দ্বিধায়, কখনও বা স্পষ্ট দ্বিমতে নিজের হাজিরা জানান দিয়েছেন তাদের গোপন বৈঠকে। অথচ, একুশ বছর বয়স পর্যন্ত যতদিন ব্রতী বেঁচে ছিল, ছিল স্পর্শযোগ্য আয়ত্তের মধ্যে, মা-ছেলের সেই একত্রবাসের নৈকট্যের মধ্যেও সুজাতা কোনোদিন জানতে পারেননি ব্রতীকে। ব্রতীর জীবনের যা কিছু তাঁর অজানা আর অচেনা রয়ে গিয়েছিল, সেই চিহ্নগুলো খুঁজে ফিরতে ফিরতেই ব্রতীর অবয়ব সুজাতার কাছে নতুন করে তৈরি হয়। তাঁর ‘মা’ হয়ে-ওঠার মধ্যে রয়ে গেছে ব্রতীর মৃত্যুর বরফঠান্ডা ব্যবধান আর নিলোভ্না নিজের মাতৃত্বকে গড়েছেন জীবনের উত্তাপে সেঁকতে সেঁকতে।
এই বৈপরীত্যের রেশ আগাগোড়া রয়ে গেছে উপন্যাসের ভেতরে। একটি সম্মিলিত রাষ্ট্রীয় খুন বা মৃত্যু যে কাহিনির ভরকেন্দ্র, তার শুরুটাই হচ্ছে নবজাতকের জন্মসম্ভাবনা দিয়ে। যদিও তা স্বপ্ন, তবু, যে মানুষটার মৃত্যুকে ঘিরে এই কলরোল, তারই জন্মমুহূর্ত অবিকল পুনর্গঠিত হয় মায়ের ঘুমঘোরে, এমনকি প্রসববেদনার অনুভূতিটিও মিলে যায় বাস্তবের অ্যাপেন্ডিসাইটিসের যন্ত্রণার সঙ্গে। উপন্যাসের শুরুর এই ‘সিমুলেটেড পেইন’ফিরে আসবে একেবারে শেষেও, অবিচ্ছেদ্য সমাপতনে জুড়ে যাবে। উপন্যাস জুড়ে ক্রমাগত এই সোজা-উলটোর বুনোট আসতে থাকে নানা মোড়কে। সন্তানসম্ভবা সুজাতা হাসপাতালে যাওয়ার সময় আশীর্বচনের ছলে হেম বলেছিল, “ভালোতে ভালোতে দুজনেই দু ঠাঁই হয়ে ফিরে এসো।” জীবন সত্যিই দুই ঠাঁই করে দেবে এই মা-ছেলেকে, চিরতরে ঠাঁইনাড়া সেই ছেলের খোঁজই জারি রয়ে যাবে মায়ের শেষ সত্যি হয়ে। শাশুড়ির সঙ্গে সুজাতার অবস্থানের তফাতও আর-এক বিরোধাভাস। অল্প বয়সের বিধবা, এক সন্তানের জননী দিব্যনাথের মায়ের রীতিমতো যৌন ঈর্ষার ইঙ্গিত রয়েছে সুজাতার বারবার সন্তান-সম্ভাবনাকে ঘিরে। অথচ কার্যক্ষেত্রে সুজাতা নিজের মাতৃত্ব ঘনিয়ে তুলেছেন একটিই সন্তানের চারপাশে, বাকিদের ঘিরে রেখেছেন শাশুড়ি— “অন্য সন্তানদের শাশুড়ি সম্পূর্ণরূপে অধিকার করেছিলেন। ব্রতীর বেলা সুজাতা দখল ছাড়েননি।”
নিজের বিশ্বাস আত্মঘাতী আদর্শের কাছে গচ্ছিত রেখে ব্রতীর সঙ্গেই চলে গিয়েছিল সমুও। তবু দারিদ্র্যের কামড়ে জীর্ণ, অবসন্ন সমুর মাকে বিজয়িনী বলে মনে হয় সুজাতার, অভিজাত উচ্চবিত্ত সুজাতার।
ভাগ্যের সবচেয়ে বড়ো পরিহাস, এই সন্তানটিই বরং অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল সুজাতার কাছে, বৈবাহিক ধর্ষণের ফসল। নেহাতই অপরাধবোধে, অনাগত সন্তানের প্রাণসংশয়জনিত করুণায়, গর্ভাবস্থার একেবারে শেষপর্বে পরিচর্যা শুরু করেছিলেন সুজাতা। অথচ, সুজাতার বয়ানে পাঠক যেভাবে চরিত্রগুলোর পরিচিতি পাবেন, শুধু সেদিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, আর-এক ছেলে জ্যোতির চেয়ে ব্রতী তাঁর কতগুণ বেশি আত্মজ। ব্রতীকে পাঠক চিনছেন সুজাতার নাড়িছেঁড়া ব্যথার মধ্যে দিয়ে, “ব্রতী আসছে”। তীব্র, দ্ব্যর্থহীন, প্রবৃত্তিময় বাৎসল্য। অথচ জ্যোতির কথা প্রথম যখন আসছে, সুজাতা ভাবছেন— “তাঁর জ্যেষ্ঠ। দিব্যনাথের অনুগত ও বাধ্য ছেলে। বিনির সহৃদয় স্বামী, সুমনের স্নেহময় পিতা।” লক্ষণীয়, অন্য প্রত্যেকের ক্ষেত্রে, জ্যোতির সঙ্গে তাদের যে সম্পর্কটির সূত্রে জ্যোতিকে বাঁধা হয়েছে, তা পারস্পরিক, সেই সম্পর্কগুলোর প্রতিটা ‘ছেলে-স্বামী-পিতা’ সম্বোধনের মাধুর্যে জড়িয়ে আছে। একমাত্র সুজাতা ব্যতিক্রমী, তাঁর ‘জ্যেষ্ঠ’— এ শুধু যেন একটা সংখ্যাবাচক পদ, একপাক্ষিক সেই সম্বন্ধ। সুতো তাঁর হাতে বাঁধা ঠিকই, কিন্তু জ্যোতির তরফে কোথাও সে সুতোয় কোনো টান নেই।
সুজাতার সামনে পরপর উঠে আসতে থাকে এমন অসংখ্য পরস্পরবিরোধী অনুষঙ্গ। অসুখে ভুগে অফিসের কর্মচারী ভিখনের ছেলের অকালমৃত্যুর পাশে রাজনৈতিক কারণে ব্রতীর খুন হয়ে মরার আদ্যোপান্ত বৈপরীত্য বিধ্বস্ত করে তাঁকে। একইরকমের ‘বনাম’ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন সমুর মায়ের সঙ্গেও। নিজের বিশ্বাস আত্মঘাতী আদর্শের কাছে গচ্ছিত রেখে ব্রতীর সঙ্গেই চলে গিয়েছিল সমুও। তবু দারিদ্র্যের কামড়ে জীর্ণ, অবসন্ন সমুর মাকে বিজয়িনী বলে মনে হয় সুজাতার, অভিজাত উচ্চবিত্ত সুজাতার। “কেননা তিনি জানতেন সমু কী করছে।… সুজাতা কয়েক হাজার জননীর মধ্যে বহুজনের কাছে পরাজিত, কেননা তিনি জানতেন না ব্রতী কী করছে।” তিনি বুঝতে পারেন, অজান্তেই দাঁড়িয়ে আছেন সমুর মায়ের বিপরীত কোর্টে। উলটো হাওয়ায় ভেসে যান সুজাতা নিজেও। ব্রতী চলে যাওয়ার পর একটু একটু করে স্বাতন্ত্র্যে, সাহসে রুখে দাঁড়াতে দাঁড়াতে মনে হয়, এই তাঁকেই ব্রতী বলেছিল, “তুমি এত প্যাসিভ কেন মা?” যে ব্রতী মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে জানান দিয়ে গেছে তার ক্ষমতা, শক্তি, প্রমাণ করে দিয়ে গেছে যে সে কোন আকরিকে গড়া ছিল, অনুভূতিপ্রবণ হওয়ার অপরাধে তাকেও একদিন বাবার কাছে শুনতে হয়েছিল, “মিলকশপ, মেয়েমার্কা ছেলে, নো ম্যানলিনেস”! সেই বাবা, বেলাগাম ব্যভিচারের জন্য ছেলে যাঁকে শাসিয়েছিল, ঘৃণায় পিতৃসম্বোধন পর্যন্ত না করে উল্লেখ করত ‘বস’ বলে, ছেলের মৃত্যুর পর যাঁর যাবতীয় চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয় সমাজে মুখরক্ষার ভাবনাটুকু। নিজের যাবতীয় প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে সে-খবর চেপে দিয়ে তিনি কপট বুক চাপড়ান— “জানেন আমরা বাপ ছেলে কীরকম ক্লোজ ছিলাম?… আমাকে ও গডের মতো রেসপেক্ট করত… আমার হার্ট ভেঙে গিয়েছিল…!” গুরুর ঐশ্বরিক জ্যোতিদর্শনের প্রসঙ্গে মিসেস কাপাডিয়া যখন সহস্র সূর্যালোকের তুলনা টানেন, সুজাতার মনে পড়ে পুলিশি অত্যাচারের কথা— “মুখের ওপর মাথার দিক থেকে দুট হাজার ওয়াটের বাতি জ্বলছিল… বাহাত্তর ঘণ্টা… ওর চোখের মণি গলে গিয়েছিল।” মনে হয়, তাঁর চারপাশে “সব যেন কীটদষ্ট, ব্যাধিদুষ্ট, পচাধরা, গলিত ক্যানসার।” আর-একদিকে মনে পড়ে ব্রতী প্রসঙ্গে সরোজ পালের উক্তি, “ক্যানসারাস গ্রোথ অন দ্য বডি অফ ডেমোক্রেসি।”
গোটা উপন্যাস জুড়ে দাবাখেলার মতো এই বিপরীত সাদাকালোর ছক চলেছে পাশাপাশি। কোন পক্ষ সাদা আর কোন পক্ষ কালো, চোখের দেখায় যে সাদা সে-ই কি আসলে কালো, নাকি কালোর মধ্যেই সফেদ সম্ভাবনা মুছে গেল চিরতরে? যার একপক্ষে পাশা উলটে দিতে চেয়েছিল ব্রতীর মতোই হাজার চুরাশিরা, আর এক পক্ষে দাবা টেবিলের পায়া দীর্ঘ মৌরসিপাট্টার জোরে মাটিতে গেঁথে রাখতে চেয়েছে ঝুটো স্থিতাবস্থায় অভ্যস্ত সমাজ। হারজিতের উত্তর মেলে না। শুধু নির্দল সুজাতারা ক্রমশ এসে দাঁড়ায় ব্রতীদের পক্ষে। হাজার চুরাশির দলে, হাজার চুরাশির মা।
_________
অরুন্ধতী দাশ: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ – কলকাতা

