আলোর উৎসবে পরিবেশবান্ধব মোমবাতি : দিশা দেখাচ্ছেন মধুবনের ‘মৌবিবি’রা


পাড়ার এক কাকুকে সেদিন দেখলাম, বাজার থেকে হাসিমুখে পোকা বেগুন কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। চোখাচোখি হতেই বলে উঠলেন, “সময় থাকতে আসল জিনিস চিনতে শেখো, বুঝলে!”

যাঁরা জানেন, তাঁরা জানেন যে কাকুর এহেন বাণী মোটেই হেলাফেলা করার নয়। কোনটা খাঁটি/ কোনটা ভেজাল আমরা কি আদৌ চিনি? অনেকেরই ধারণা বড়ো সড়ো ‘গ্ল্যামারাস’ সবজি মানেই সেরা। কিন্তু কেনার সময় কেউ কি ভেবে দেখেন, বাজারের সুন্দর চেহারার সবজিগুলোর ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকা, ক্ষতিকর সব রাসায়নিকের ব্যাপারে? দীর্ঘদিন ধরে চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশক ফসল বিষাক্ত করেছে, কীট-পতঙ্গ মেরে পরিবেশের ক্ষতি করেছে, মাটি দূষিত করেছে, জনজীবনকে বিপদের মুখে ফেলেছে।

এত কিছু হয়ে যাওয়ার পর, এখন মানুষ সচেতন হচ্ছে, ভয় পাচ্ছে। বিশেষত শহুরে নাগরিকরা এখন বিষমুক্ত, ভেজালহীন, প্রাকৃতিক যাপনের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু, গ্রাম? “গ্রাম ক্রমশ নিজের চরিত্র হারাচ্ছে। শহরকে অনুকরণ করতে গিয়ে গ্রামের প্রাকৃতিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হচ্ছে। গ্রামের পরিবেশ আর আগের মতো থাকছে না, গ্রামের মানুষ আর আগের মতো সচেতন নন। পুরনো দিনে চাষিরা বীজ সংরক্ষণ করতেন, জৈব সার ব্যবহার করতেন, পেস্টিসাইডের বদলে প্রাকৃতিক উপায়ে কীটপতঙ্গের সমস্যা মেটাতেন। নিজের চাষ করা নির্ভেজাল ফসল ঘরের জন্য তুলে রেখে তবেই বিক্রির কথা ভাবতেন। এখন চাষিরা হয় চাষ ছেড়ে দিচ্ছেন নয়তো ফসল বিক্রি করে, বাজারের প্যাকেটজাত ‘ব্র্যান্ডেড’ খাদ্যদ্রব্য কিনছেন।” আক্ষেপ করে বলছিলেন উত্তর ২৪ পরগনা জেলার আমডাঙার মধুবন স্বনির্ভর গোষ্ঠী-র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আরিফ ইসলাম। মৌমাছি পালন (Honey Bee Agriculture) করে পরিবেশকে বাঁচানো সেইসঙ্গে মধু ও মোম সংগ্রহ করে কীভাবে স্বনির্ভর হওয়া যায়, গত কয়েক বছর ধরে মানুষের মধ্যে এই সচেতনতা ও অভ্যেস গড়ে তোলার কাজ করে চলেছেন তিনি এবং তাঁর সংগঠন।

দক্ষিণ কলকাতার একটি বিপণিতে পাওয়া যাচ্ছে মৌবিবিদের হাতে বানানো মোমবাতি

বংশানুক্রমে মৌপালন করে আসছেন আরিফরা। আগে শুধুমাত্র ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যেই মৌপালন করতেন, কয়েক বছর হলো গবেষক-উদ্যোক্তা নীলাঞ্জন মিশ্র’র তত্ত্বাবধানে উদ্দেশ্য পুরোপুরি পাল্টে ফেলেন আরিফ ও তাঁর ভাই সাইফুল। তাঁরা বুঝলেন, বাস্তুতন্ত্র বাঁচলে তবেই আমরা বাঁচবো। মৌপালন করতে গেলে আগে মৌ-সচেতনতা প্রয়োজন, প্রয়োজন মৌমাছি সংরক্ষণ। সচেতনতার অভাবেই পরিবেশ থেকে ক্ষতি হয় মৌমাছিদের। খাঁটি মধুর নামে বাজারে দেদার বিকোয় নকল মধু, ক্ষতিকর প্যারাফিনযুক্ত ভেজাল মোম। তাই, হাল ধরতে হবে মৌ পালকদেরই। আরিফরা শুধু মধু চাষের মধ্যে আটকে থাকলেন না, ‘মধুবন স্বনির্ভর মৌপালক গোষ্ঠী’ নামে শুরু করলেন নতুন অভিযান। মৌপালনের গুরুত্ব, মৌমাছিদের সুরক্ষা, খাঁটি মধু বা মোম নিয়ে গ্রাউন্ড লেভেল থেকে কাজ শুরু করলেন। চলতে থাকলো বিভিন্ন আলোচনা সভা, মেলায় যোগদান, পড়ুয়াদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচী। কয়েক মাস হলো ‘মৌবিবি’ নামে গ্রামীণ মহিলাদের নিয়ে নতুন একটি প্রকল্পও  শুরু করেছে মধুবন গোষ্ঠী। গ্রামীণ মহিলাদেরকে সঙ্গে নিয়ে মৌমাছি সংরক্ষণ ও সুস্থায়ী কৃষি উদ্যোগ।

পড়ুয়াদের মৌমাছি চাষের পাঠ দিচ্ছেন আরিফ ইসলাম

সুস্থ সমাজের জন্য সবার আগে দরকার নারী স্বাধীনতা ও সচেতনতা। শিশুকে সঠিক শিক্ষায় বড়ো করার নেপথ্যেও মায়ের ভূমিকা প্রধান। সেই ভাবনা থেকেই মৌবিবি’র পথ চলা শুরু। কর্মশালায় বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন মহিলারা। গ্রামীণ সংস্কৃতি ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের পক্ষে নানা আলোচনায় অংশগ্রহণ করছেন। কর্মশালায় অন্তর্ভুক্ত থাকছে নানাবিধ পরিবেশ কেন্দ্রিক বিষয়, যেমন- সুস্থায়ী কৃষি ও মৌপালন, দেশি বীজ সংরক্ষণ, জৈব সার ও কীটনাশক প্রস্তুতি, কম্পোস্ট তৈরি, মধু ও মোম দিয়ে নানারকম প্রসাধনী সামগ্রী তৈরি, দেশীয় প্রজাতির গাছের চারা তৈরি, সৃজনশীল হস্তশিল্পের কাজ প্রভৃতি। শুধু তাই নয়, কাজকর্মের ফাঁকে চাষবাস, পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন বইপত্র পড়ার সুযোগও পাচ্ছেন মৌবিবিরা; বানানো হয়েছে লাইব্রেরি।

বর্তমানে এই রাজ্যে মৌ পালন যথেষ্ট ভালো জায়গায় আছে৷ এর থেকে উপার্জনও যথেষ্ট করা যায়৷ রাজ্যে বিভিন্ন প্রান্তে মৌ পালন করে স্বনির্ভর হচ্ছেন অনেকেই। তবু, বাজারে নকল বী-প্রোডাক্টসের এত রমরমা কেন? “নকল বী-প্রোডাক্টসের এই রমরমা শুরু হয়েছিল মানুষের সচেতনতার অভাবে। পাইকার, ফড়ে/দালাল, দাদন ছাড়াই যে মৌপালন করে স্বনির্ভর হওয়া যায়, অধিকাংশ মৌচাষিদের এই বোধ বা উপায় ছিল না। মৌচাষির হাত থেকে ক্রেতার হাতে মধু/মোম পৌঁছাতে পৌঁছাতে তার গুণমান ঠিক থাকে না। বেশি উৎপাদন ও মুনাফার লোভে লোক-ঠকানো সেই সঙ্গে পরিবেশের ক্ষতি দুইই চলেছে যথেচ্ছ ভাবে। এখন মানুষ আগের থেকে সচেতন, আসল-নকল কিছুটা হলেও বোঝে। আমাদের মতো ছোটো ব্যবসায়ীরা তাই চেষ্টা করে চলেছি প্রাপ্য লাভটুকু রেখে খাঁটি জিনিসই ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার, সেইসঙ্গে মৌমাছি নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার। মৌমাছির মতো পতঙ্গরা পরাগমিলন ঘটায় বলেই সারা পৃথিবীর প্রাণীকুল খেতে পায়। মৌমাছি না থাকলে কিন্তু আমাদের বাস্তুতন্ত্রটাই আর টিকবে না। মুনাফালোভীরা নিজেদের জায়গায় অনড় থাকুক, আমরাও আমাদের জায়গা থেকে সরবো না।” বলেন আরিফ।

মৌমাছি, ভোমরারা পরাগমিলন ঘটায় বলে সারা পৃথিবীর প্রাণীকুল খেতে পায়। এখন চাষের ক্ষেতে বা ছাদবাগানে পতঙ্গনাশক বা ইনসেক্টিসাইড প্রয়োগ করার ফলে, ঝোপ ও জঙ্গল কেটে হুহু করে মানুষের বসতি গড়ে ওঠবার ফলে, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌমাছির সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত কমে যাচ্ছে।

বাজারে যে মোমবাতি বিক্রি হয়, তার সিংহভাগই নকল। আসল মোমের বদলে সেগুলো তৈরি হয় প্যারাফিন নামক একটি বাইপ্রডাক্ট থেকে। নকল হলেও বাজার চলতি এইসব মোমবাতি দামে সস্তা। সেক্ষেত্র সাধারণ নিম্ন-মধ্যবিত্তরা বাজারদামের থেকে বেশি টাকা দিয়ে পরিবেশবান্ধব মোমবাতি কিনবে?

আরিফের কথায়, “কিনছে তো। এরকম অনেক মানুষই আছেন যাঁরা পণ্যমানের সঙ্গে আপোষ করেন না। কোনও কোনও ক্রেতা হয়তো এক প্যাকেটের জায়গায় একটা মোমবাতি কেনেন। কিন্তু, তাঁদের চেহারায় তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। তাঁরা জানেন, এই মোমবাতি পরিবেশের কোনও ক্ষতি করবে না। সেটাই আমাদের আসল প্রাপ্তি। কিন্তু, সমস্যা হলো সেভাবে মার্কেটিং বা প্রোমোশন করতে পারছি না আমরা। প্রোডাকশন না হলে প্রোডাক্টের দাম কীভাবে কমবে! যতজন মৌবিবি নিয়মিত কাজ করছেন, তাঁরা ভালোই প্রোডাকশন করতে পারবেন, আমরাই সেই জায়গায় ওঁদের পৌঁছে দিতে পারছি না। যদি আরও অনেকে আমাদের কাজ নিয়ে আগ্রহ দেখায়, মৌবিবিদের প্রোডাক্ট কিনে সাহায্য করে, তবেই আমদের উদ্দেশ্য সফল হবে। ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি না, তা নয়। বেশ কিছু প্রসাধন ব্যবসায়ী, ওষুধ কোম্পানি, ছোটো ব্যবসায়ী বা সংস্থা আমাদের প্রোডাক্ট সংগ্রহ করছেন। গুরুত্ব বুঝছেন। অনেক পড়ুয়া, গবেষক আমাদের সঙ্গে যুক্ত আছেন। স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে সদস্য সংখ্যাও বেড়েছে। সাহচর্য পাচ্ছি বলেই মৌবিবি-র মতো প্রকল্প নিয়েছি।”

আরিফ আরও জানালেন যে, ১০০ শতাংশ খাঁটি মোম দিয়ে বানানো মোমবাতিগুলোয় কোনও সুগন্ধি মেশান না মৌবিবিরা। বিভিন্ন ধরনের মধুর নিজস্ব গন্ধ থাকে। আসল মোমে ফুলের পরাগ, মধুও মিশে থাকে। মাটির খুরি ও প্রদীপ নানা রং-নকশায় সাজিয়ে, তার মধ্যে মোম ঢেলে সুন্দর সুন্দর প্রদীপ-মোমবাতি বানান মৌবিবিরা। এছাড়া, লম্বা মোমবাতি তৈরি করেন মোমের শিট দিয়ে। কোনোরকম adulteration ছাড়া এই পরিবেশবান্ধব মোমবাতিগুলো দুই থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা জ্বলতে পারে৷ আরিফের কথায়, “সরাসরি আমাদের থেকে পাইকারি দরে কিনে আগ্রহীরা ব্যবসা করতে পারেন। সারাবছরই আমাদের মোম ও মোমবাতি সংগ্রহ করা যাবে। আর জানবেন নিশ্চিতভাবে আপনার দেয় এই অর্থের একাংশ নিয়মিত কাজে লাগছে মৌমাছি সংরক্ষণের নানা কাজে। এখনও সময় আছে, ব্যবসায়ীদের বলবো ব্যবসা করলে পরিবেশবান্ধব ব্যবসাই করুন।”

মোমের শিট দিয়ে বানানো মোমবাতি

চাষের ক্ষেত বা বাড়ির বাগানে পতঙ্গনাশক বা ইনসেক্টিসাইড প্রয়োগ করার ফলে, ঝোপ ও জঙ্গল কেটে হুহু করে মানুষের বসতি গড়ে ওঠার ফলে, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৌমাছির সংখ্যা দ্রুত কমে গেছে ও যাচ্ছে। কৃষকসভায় শুনতে পাওয়া যায় মৌমাছি আসছে না বলে সব্জি ও ফল গাছে ভালো ফলন হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে আরিফদের মতো অভিজ্ঞ ও সচেতন মৌপালকদের জন্য এখনও বাঁচার মতো বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারি আমরা। ব্যবসা আর পরিবেশবান্ধব ব্যবসার মধ্যে পার্থক্য আছে বৈকি! ক্রেতারা এবার ভেবে দেখুন, তাঁরা কোন পথ বেছে নেবেন…

*মধুবন স্বনির্ভর মৌপালক গোষ্ঠী’র সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন 90629 48140 এই নম্বরে।

___________

ছবি সৌজন্যে: মধুবন স্বনির্ভর গোষ্ঠী

Written by