‘বংকু’-র প্যানেল ডিস্কাশনে উঠে এল পরিচিতির বহুত্ব নিয়ে অনেক ধরনের প্রশ্ন…
‘বংকু’ একটি লিটল ম্যাগাজিন। প্রান্তিক যৌনতার অধিকার নিয়ে সরব এই পত্রিকা। ‘বংকু’ মানে ব্যাঁকা, অর্থাৎ যা কিনা সরলরেখায় চলে না, সমাজের চোখরাঙানিকে কেয়ার না করে নিজের মতো করে রাস্তা বানিয়ে নেয়। ইংরেজিতে এই পত্রিকার নাম লেখা হয় ‘BongQ’। বাঙালি থেকে ‘Bong’ আর Queer থেকে Q, এই হল ব্যাখ্যা। সব দিক থেকেই নামখানি বেশ ইন্টারেস্টিং – দুই ভাষাতেই। ২০১৫ সালের বইমেলায় পথ চলা শুরু করার পর যৌন পরিচয়ের পাশাপাশি, বিষয়ের বৈচিত্র্য আর ছকভাঙা পরীক্ষানিরীক্ষাতেও ‘বংকু’ যথেষ্ঠ নজরকাড়া। শুধুমাত্র সাহিত্যচর্চা নয়, নিজেদের সুখদুঃখ ভাগ করে নেওয়া আর পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য থেকেই তরুণ প্রজন্মের এই ম্যাগাজিন আত্মপ্রকাশ করেছিল। কাগুজে পত্রিকার সমান্তরালে ‘বংকু’-র রয়েছে একটি অনলাইন ভার্সানও। এদেরই নতুন সংখ্যা বেরোনোর খুশিতে গত ২ ডিসেম্বর ভারতসভা হলে আনন্দ অনুষ্ঠান ছিল, যাকে ডাকা হচ্ছিল ‘বংকুর হৈচৈ’ নামে।

অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনের একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক আছে। কিন্তু লিটল ম্যাগাজিনে বিকল্প যৌনতার ভাবনা কীভাবে আসছে? প্রান্তিক যৌনতা নিয়ে মতের আদান-প্রদান কতটা বাড়ছে? যৌন পরিচিতির বহুত্ব নিয়ে যে লড়াই, তাকে লিটল ম্যাগাজিন কতটা ধারণ করতে পেরেছে? বিকল্প সাহিত্য আর বিকল্প পরিচিতির সম্পর্ক কোথায়? সেদিনের অনুষ্ঠানে ‘বংকু’ এইসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছিল। বলা ভালো, এরকম সব প্রশ্ন থেকে যাতে আরও হাজারো প্রশ্ন উঠে আসে, তার সলতে পাকানো হচ্ছিল সেদিন। অনুষ্ঠানের মধ্যেই ছিল একটা আলোচনা সভা বা প্যানেল ডিস্কাশন। বিষয় – “৩৭৭ এবং ক্যুয়ের আন্দোলনে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা”। আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন ‘স্যাফো ফর ইউক্যুয়ালিটি’ থেকে আকাঙ্ক্ষা, ‘গুরুচণ্ডা৯’ থেকে রোহিন ব্যানার্জি, ‘স্বীকৃতি’ পত্রিকা থেকে সুশান্ত প্রামাণিক, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলাদ্রি চ্যাটার্জি, ‘ইন্ডিয়ারি’ ওয়েবজিন থেকে ইন্দ্রনীল ঘোষ, ছিলেন সম্রাট সেনগুপ্ত যিনি ছোটো পত্রিকা নিয়ে কাজ করেন, আর মডারেটর হিসেবে ছিলেন কবি ও সম্পাদক শুভ মৈত্র। আলোচকদের হাতেই ‘বংকু’-র চতুর্থ বইমেলা সংখ্যার প্রকাশ ঘটল আনুষ্ঠানিকভাবে। তারপর প্যানেল ডিস্কাশনে ওপরের প্রশ্নগুলো নিয়ে অনেকগুলো সম্ভাবনার কথা উঠে এল। বেরিয়ে এল সমাজ, সাহিত্য আর সৃজনের অনেকগুলো অভিমুখ।

প্যানেল ডিস্কাশনের পর ছিল শিল্পী আশিস সিংহের ব্যালে ডান্স। আশিস এমনই এক শিল্পী, যিনি ছেলে হয়ে নাচের চর্যা করেন বলে সমাজ থেকে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে বাধ্য হয়েছেন, তবুও এগিয়ে গেছেন হার না মেনে। তারপর জয়দীপ জানা খোলা চিঠি পাঠ করে শোনান। বিষয় ছিল, “ছেলেবেলা থেকে ক্যুয়ের জীবনের জ্বালা এবং AIDS-এর সঙ্গে লড়াই”। ‘গুরুচণ্ডা৯’-র নতুন বই ‘নৈঃশব্দের পত্রগুচ্ছ’ তারপর প্রকাশিত হল। লেখক অভিজিৎ মজুমদার। আগে বইটি ছিল ই-বুক আকারে। এবার ছেপে বেরল। এরপর অর্চন মুখার্জির ফটোগ্রাফি সিরিজে একটি মেয়ের আত্মহত্যা করার ধাপগুলো ফুটে ওঠে। খুব উপযোগী হয়ে উঠেছে প্রখ্যাত ব্যক্তিদের সুইসাইড নোট থেকে নেওয়া লাইনগুলো। ছবিগুলোতে মডেল ছিলেন সৃজা। সবার শেষে ছিল শর্টফিল্ম। কুণাল গাঙ্গুলির ‘Day and Eternity’, দেবগোপাল মণ্ডলের ‘Come Across the Line’, ঋজু ব্যানার্জির ‘Open to All’, নিলয় সমীরণ নন্দীর ‘Finding Players’, সুদর্শনা চক্রবর্তীর ‘And the Beats Go on’ আর দেবাদৃতা বসুর ‘Languages’ দেখানো হল সেদিন। হাল্কা হাল্কা শীতের আমেজ উপভোগ করতে করতে মহানগরের বুকে হাসি-মজার সঙ্গে সিরিয়াস আলোচনা মিশিয়ে এক জমজমাট সন্ধে কেটে গেল এভাবেই।