
সুরেশ্বরী ঢাকাইয়া লক্ষ্মী সরা
কৈলাসবাসী সদা কাঙাল পিতা ভোলানাথের কাছে লক্ষ্মী হলেন প্রিয় সন্তান । কারণ, লক্ষ্মী ছাড়া সংসার যে অসার। এদিকে অভিমান করে উমা এসেছেন বাপের বাড়িতে। চারদিনের আনন্দের পর এবার কৈলাসে ফেরার পালা। কিন্তু ভোলানাথের রাগ সামাল দেবেন কে? তাই দশমীতে বাপের বাড়িকে বিদায় জানিয়ে উমা আশ্রয় নেন গাছের তলায়। অপেক্ষা করেন মেয়ে লক্ষ্মীর জন্য। কারণ আদরের কন্যা লক্ষ্মীকে ঘর ছাড়া করবে না সদা কাঙাল বাপ ভোলানাথ। লক্ষ্মীর আঁচল ধরেই উমা প্রবেশ করেন স্বামীর ঘরে। এই লোকবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই পূর্ববঙ্গের মানুষ দুর্গা বির্সজনের পর সেই পথেই লক্ষ্মীর সরা কিনে ঘরে আসেন।
মানিকগঞ্জ লক্ষ্মী-নারায়ণ সরা
মাটি হল পবিত্র ধরণীর রূপ। আবার ধানের শীষেই জড়িয়ে কৃষক পরিবারের প্রাণ৷ সেখানেই লুকিয়ে থাকেন মা লক্ষ্মী। তাই মাঠ থেকে ধান উঠিয়ে বড়ো বড়ো মাটির পাত্রে সংরক্ষিত করাই ছিল রীতি। এইসব পাত্রকে ঢাকার জন্যই ব্যবহার করা হত সরা।
সরা – বাংলার লোকাচারের একটি বিশেষ উপাদান। পূর্ববঙ্গে দ্বি-মাত্রিক আকৃতির মাটির সরা ব্যবহার হয় শস্য ঢাকার জন্য। গ্রাম বাংলার জনজীবনে জল-হাওয়া-মাটি বাঙালিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে আবহমানকাল ধরে। মাটি হল পবিত্র ধরণীর রূপ। আবার ধানের শীষেই জড়িয়ে কৃষক পরিবারের প্রাণ৷ সেখানেই লুকিয়ে থাকেন মা লক্ষ্মী। তাই মাঠ থেকে ধান উঠিয়ে বড়ো বড়ো মাটির পাত্রে সংরক্ষিত করাই ছিল রীতি। এইসব পাত্রকে ঢাকার জন্যই ব্যবহার করা হত সরা। গ্রাম বাংলার মা-ঠাকুমারা শস্যকে ঢাকনা দিয়ে গচ্ছিত রাখার মতই লক্ষ্মীকেও ঘরে বেঁধে রাখতেই সরার উপর চিত্রিত করতেন লক্ষ্মীর রূপ। কারণ তিনি যে সদা চঞ্চল। তাই চঞ্চলাকে চিত্রিত করে বেঁধে রাখাই পূর্ববঙ্গের মানুষের ছিল লোকবিশ্বাস।
এই লোকবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই ফরিদপুর, ঢাকা, যশোর জেলার রুদ্রপাল সম্প্রদায় শুরু করেন এক নতুন শিল্প। কারণ লোকবিশ্বাস কে সঙ্গে নিয়ে জীবিত থাকে লোকশিল্প। শুরু হয় সরা চিত্রশিল্প। মাটিকে ভালো করে ছেঁনে, রোদে শুকিয়ে, ভাটিতে পুড়িয়ে তৈরি করতেন নানা আকৃতির সরা। তারপর সেইসব সরার উপর নানা রঙ্গের ব্যবহারে আঁকা হত সপরিবারে দুর্গা এবং লক্ষ্মীর পুতুল।
দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের অনেক মানুষ এপার বাংলায় চলে এসেছেন। মানুষের সঙ্গে রীতি বাহিত হয়। তাই এপার বাংলায় পূর্ববঙ্গের এই সরা পুজোর রীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে একদল সরা শিল্পী এপারে এসে বসবাস শুরু করেন।
পূর্ববঙ্গের মানুষরা কোজাগরী পূর্ণিমায় এইসব চিত্রিত লক্ষ্মীর সরাকেই পুজো করতেন। তবে লোকবিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে শাস্ত্রেও সরা পুজোর উল্লেখআছে। শাস্ত্র মতে সরা হল পুরুষাকারে পূজা। তাই সরাতে দুর্গা, লক্ষ্মীর চিত্র করাই রীতি। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের অনেক মানুষ এপার বাংলায় চলে এসেছেন। মানুষের সঙ্গে রীতি বাহিত হয়। তাই এপার বাংলায় পূর্ববঙ্গের এই সরা পুজোর রীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে একদল সরা শিল্পী এপারে এসে বসবাস শুরু করেন। নদিয়ার তাহেরপুর, পাণিহাটি, নৈহাটি, দত্তপুকুর অঞ্চলের রুদ্রপাল সম্প্রদায়ের শিল্পীরা এখনও এঁকে চেলেছেন নানা রকমের সরা। অঞ্চল ভেদের সরার চিত্রর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। শিল্পী উত্তমপালের কথায়, সরা শিল্প ও পুজো উভয়ের মধ্যেই পূর্ব-পুরুষের রীতিকে বয়ে চলার বার্তা দেয়। বাংলাদেশের চিত্রিত সরাকে ঢাকাই, ঢাকাইয়া, ফরিদপুরী, আচার্য বা গণকী, যশোর এবং সুরেশ্বরী— নামকরণ করা হয়। তবে প্রতিটি সরাইচিত্রির দিক থেকে স্বতন্ত্র। প্রতিটি সরাতে জমিনের রং, দেবদেবীর রূপ বা অলংকরণের বৈচিত্র্য দেখা যায়। এমনকি নির্মাণ কৌশলের দিক থেকেও বিভিন্ন অঞ্চলের সরার মধ্যে ভিন্নতা আছে।
ঢাকাই লক্ষ্মী সরা
বর্তমানে সরার চাহিদা বৃদ্ধি না পেলেও সরা পুজোর প্রচলন কিন্তু কমেনি। এই বিষয়ে তাহেরপুরের সরাশিল্পী সুশান্ত পালের কথায়, লক্ষ্মী বলে কথা। পূর্বপুরুষের বিশ্বাস আর ঘরের মঙ্গল যে এক সুতোয় বাঁধা। এককথায় সরা শুধু বাংলার শিল্প নয়, এর সঙ্গে যুক্ত বাংলার মানুষের জীবন যাপন। সরার চিত্রতে প্রথম কালো-নীল-হলুদ দিয়ে ‘ঘড়’ বেঁধে আকা হয় মানুষরূপী পুতুল। আর তাতে ফুটে ওঠে সন্তান-সন্ততি নিয়ে গ্রামের মেয়ের সুখী উমার গৃহের কথা। পূর্বপুরুষ লোকাচার ও লোকবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই দুর্গাপুজোর পরে বাংলার মানুষ কিনে আনেন লক্ষ্মীর সরা।

