শিল্পী যামিনী রায়ের নামাঙ্কিত বিতর্কিত চিত্রপ্রদর্শনী
যামিনী রায় মহাশয়কে আমি দেখেছি। ১৯৬২ সাল নাগাদ। ওঁর কাজের পরিবেশে। কাজের জায়গাকে ছবি দিয়ে সাজিয়ে রেখেছিলেন। ক্রেতা হলে, তা হাতে নিয়ে দেখতে পেতো। দেওয়ালে ঝোলানো কম, বেশিরভাগ দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা। খুব বড়ো কাজ নয়। মাঝারি মাপের। ২০x৩০ ইঞ্চি সাধারণত। কিছু এর থেকে বড়োও ছিল, আবার বেশ ছোটো মাপের। কোলে রেখে দেখার মতো। রঙের ব্যবহার মূলত প্রাথমিক রং। চড়া হলুদ, চড়া মেটে লাল, মেটে হলুদ, সবুজ নানা রকম, নীলও নানা রকম।
আলোচ্য প্রদর্শনী’র ছবি
এখানে আমি ওঁর বর্ণলেপন, তুলির আঁচড়, পটকে সাজানোর ঢঙ এগুলো নিয়ে বিশদ বলবো না। যদিও বলার অবকাশ আছে এবং এগুলো বলেও কিছু প্রমাণ করা যাবে না, কী তার বৈশিষ্ট্য। বৈশিষ্ট্য অবশ্যই ছিল। আমরা ছোটো বয়সে, শিক্ষাজীবনে এ নিয়ে মস্করাও করেছি। সে অন্য প্রসঙ্গ। আমি যামিনী রায়ের বহু মূল কাজ দেখেছি। ইংল্যান্ডে, আমেরিকায়, এ দেশে, সরকারি সংগ্রহ প্রায় সবটা দেখেছি। তার থেকে ওঁর কাজ সম্বন্ধে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। ঠিক এর পাশেই, যামিনী-বসন্ত জানা বিতর্কেও অংশ নিয়েছি। কিন্তু, সম্প্রতি প্রায় নকল অথবা সত্যিই নকল যামিনী রায় দেখলাম; এখানে ‘প্রায়’ ও ‘সত্যি’ কথাটা যোগ করেছি কারণ, এগুলো পরীক্ষিত নয়। সরকারি ভাবে এখনও কোনও রায় দেওয়া হয়নি। যে কর্তৃপক্ষের উপর এর ভার, তাঁরা কোনও ব্যবস্থা নেননি। পুলিশও কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, শুধুমাত্র অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
ধরনধারণ যামিনী রায়ের। একজন তরুণ শিল্পী মন্তব্য করেছে যে, যে শিল্পী এই কাজটি সমাধা করেছে, দীর্ঘ পরিশ্রমে, অধ্যাবসায়ে সে যামিনী রায়ের থেকেও একজন বড়ো শিল্পী, তার দক্ষতা প্রশ্নাতীত। হতে পারে। তবুও সে যামিনী রায় নয়। যামিনী রায় বাংলা বা কালীঘাট পটের আদলকে, গ্রামীণ ধরন-কে আশ্রয় করে পট এঁকেছিলেন। পটের বাইরেও তিনি নানা… প্রায় একই ঘরানার বহু কাজ করেছেন। পাশ্চাত্য ঢঙেও আনেক আগে বহু কাজ করেছিলেন। তাঁর শিক্ষকই একজন বিদেশি ছিলেন। যখন থেকে উনি পটকে আশ্রয় করলেন, তখন থেকে পটের দর্শনকেও আশ্রয় করলেন। প্রায় পুরো পরিবারই শিল্পী হয়ে উঠলো – কেউ রং লেপে কেউ নকল করে, উনি রেখা দিয়ে শেষ আঁচড়টা দিতেন। এই ফাঁকেই নকল জগত ঢুকে গেল। দরজা খোলাই ছিল, চোর ঢুকতে অসুবিধা পায়নি। কালীঘাটে নাকি এক শিল্পী বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন, এর ফল হলো মারাত্মক। ওঁর মৃত্যর পর ছবির দাম কমতে শুরু করলো। শোনা যায় ওঁর পরিবারের লোকজনও এই ব্যবসায় যুক্ত হয়ে পড়েন এবং তাঁরাই নাকি এগুলো মূল কাজ বলে কাগজ বানাতে থাকে, যা আজও নাকি প্রামাণ্য। যাঁরা এই প্রদর্শনী করেছে তাঁরাও দাবী করছেন এমনই।
যখন থেকে উনি পটকে আশ্রয় করলেন, তখন থেকে পটের দর্শনকেও আশ্রয় করলেন। প্রায় পুরো পরিবারই শিল্পী হয়ে উঠলো – কেউ রং লেপে কেউ নকল করে, উনি রেখা দিয়ে শেষ আঁচড়টা দিতেন। এই ফাঁকেই নকল জগত ঢুকে গেল।
তা হলে কেন এত অর্থ ব্যায়ে এই এতগুলো বিশাল আকারের কাজের আমদানী করতে হলো? এমন প্রশ্নটাও স্বাভাবিক। যার বাজার দরই নেই। তার এমন প্রচেষ্টা বিফলে যাওয়ার কথা। না, তা হলো না, এখানেই মূল গল্প। হঠাৎ এই হারিয়ে যাওয়া, পড়ে যাওয়া বাজার দরকে পুনর্জন্ম দিতে হবে। এমন ভাবে দিতে হবে, যা সত্যিই মহার্ঘ্য হয়ে ওঠে, না দেখা যামিনী রায়কে মূল্যবান আবিষ্কার হিসেবে যাদুঘরে জায়গা দেওয়া যায়। তার জন্য কী কী তারিকা নেওয়া হলো? প্রথমত মাপ, বিশাল আকারের, তারপর খুবই যত্ন করে রেখা, বর্ণলেপন ও তার মধ্যে প্রাকৃতিক ক্ষয়কে গুরুত্ব দেওয়া। প্রাকৃতিক ক্ষয় ও কৃত্রিম ক্ষয়ের তফাৎ হয়ে যায়। তার ব্যাখ্যাও বিশাল। রেখার সাবলীলতা ও কৃত্রিম রেখার চলন তফাৎ হয়ে যায়। বহু দিকে নজর দিলেও, যেহেতু বিশেষ কোনও বিশেষজ্ঞ ছিল না তাই একটু কাঁচা কাজ ঢুকে গেছে, ছেলেমানুষী ঢুকে গেছে, বিচিত্র জ্যামিতি ঢুকে গেছে –যা কোনও দিন যামিনী রায়ের কাজে আমরা দেখিনি। সাধারণ বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একধরনের যান্ত্রিকতা একে গ্রাস করেছে। বিক্রয়যোগ্য করে তুলেছে। অশিক্ষিত চোখ তা ধরতে পারবে না। প্রাথমিক ভাবে মুগ্ধও হবে। ঠকবে হয়তো। তবে কাজগুলো একাধিক শিল্পীর দ্বারা হয়েছে বলে আমার ধারণা। কারণ, তুলির চলন, বর্ণলেপন, ভিন্ন ভিন্ন। যামিনীবাবু নিজেই হয়তো পরিবার বা শিষ্যদের প্রশয় দিতেন। ওঁর হাতের কাজের পাশাপাশি সেটা কোনও অজুহাত হতে পারে না।
নানা প্রকার জন্তু, জানোয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রমণীর বসার ঢং, পটল চেরা চোখ, দুমুখো রেখা ইত্যাদি। রেখার ডৌল নিয়ে, ছায়ারেখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দক্ষ শিল্পীর রেখার গতি ও অপটু-অদক্ষ শিল্পীর রেখার গতিতে তফাৎ হয়। এখানে তাই দেখা গেছে। সন্দেহ সেখানেও। একটা আলোচনা সভা ডাকা হয়, আকাদেমি চত্বরে। সেখানে অনেকেই প্রায় সবাই বিরুদ্ধ মত পোষণ করেন। বিতর্ক তেমন হয়নি। মতবিরোধও তেমন হয়নি, সামান্য কিছু বিতণ্ডা ছাড়া। তবে অনেক শিল্পী আশ্চর্য ভাবে এগুলোকে মূল কাজ বলেও মনে করছেন। কাজগুলো উপভোগ করেছেন। হতেও পারে আমি ভুল ভাবছি। তবে, আমি প্রায় ষাট বছর ধরে যামিনী রায় ব্যক্তিগত ভাবে দেখে এসেছি। আমার বয়স নানা পরিস্থিতিতে সে সুযোগ দিয়েছে। তবে শেষ কথা বলার আমি কেউ নই। তার জন্য ভিন্ন লোক আছেন। বহু বই লেখা হয়েছে ওঁর কাজ নিয়ে। নানা গবেষণা হয়েছে। যামিনী রায় বাংলার খুবই জনপ্রিয় একজন শিল্পী। হয়তো সবচেয়ে জনপ্রিয়। প্রায় ঘরে ঘরে উনি আছেন। এই জনপ্রিয়তাও একটা কাল হয়েছে। ভালো বা মন্দ।
বাঁদিকে যামিনী রায়ের আঁকা আসল ছবি, ডানদিকে আলোচ্য প্রদর্শনী’র ছবি
তবে, এই প্রদর্শনীটি আমি দেখে চমকে গেছি। তার উপস্থাপনা দেখে। যাদুঘর সাজানোর মতো তার উপস্থাপনা। এর সঙ্গে অতীত সমস্ত কিছু জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তার কোনও প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি।
সরকারের মত জানার অপেক্ষায় আমরা, যদি আদৌ তাঁরা মত দেন বা এগুলো পরীক্ষা করেন তবেই।
[সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতার মিডলটন আর্ট গ্যালারিতে আয়োজিত শিল্পী যামিনী রায়ের নামাঙ্কিত বিতর্কিত চিত্রপ্রদর্শনী'র পরিপ্রেক্ষিতে লিখলেন শিল্পী হিরণ মিত্র। প্রসঙ্গত, এই প্রদর্শনী নিয়ে শহরের তাবড় চিত্রশিল্পীরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যে তালিকায় আছেন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ ছত্রপতি দত্ত, শিল্প সমালোচক প্রণবরঞ্জন রায়, তাপস সরকার, পার্থ রায় প্রমুখ।কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। থানায় ডায়েরিও হয়েছে। প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি।]