দুর্গাকে বাগদি রূপে কল্পনা করার সাহস দেখিয়েছেন বাংলার পটচিত্রীরা : অঞ্জন সেন

দুই দশক ধরে বাংলার পটচিত্র নিয়ে গবেষণা করছেন অঞ্জন সেন

দুর্গাপুজো শুরু আর একশো দিনেরও কম সময় বাকি। বিশ্ব উষ্ণায়নের ঠ্যালায় পড়ে এখন শহরে আর তেমন দেখা যায় না মেঘমুক্ত আকাশ। তাই শ্রাবণ আর ভাদ্র পেরিয়ে আশ্বিন পড়লেও তা কতটা দেখা যাবে জানা নেই। তবে ইতিউতি শুরু হয়ে গেছে খুঁটিপুজো, পাড়ার রাস্তা বা মাঠে ডাঁই করে রাখা বাঁশের স্তুপ দেখা যাচ্ছে মাঝেমধ্যেই। বাঙালির এই প্রিয় উৎসবের বয়সও কম হলো না। ঘট, পটের দুর্গাপুজো, কংসনারায়ণ, কৃষ্ণচন্দ্র রায়, কলকাতায় সাবর্ণ রায়চৌধুরী, শোভাবাজারের দেব বাড়ির পুজো পেরিয়ে, তা এখন পরিবর্তিত হয়েছে থিমের উদযাপনে। প্যান্ডেল হোক বা মূর্তিতে। সাম্প্রতিক কালে কোথাও দেখা গেছে ১০০ ফুটের কাঠের দুর্গা, কোথাও দেখা যায় মাটি ছাড়া অন্যান্য উপাদানের ব্যবহার। তবে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারাও একবারে নতুন নয়। আগেকার সময়ের একচালা, আটচালার দুর্গা এখনও চোখে পড়ে কোনও কোনও অঞ্চলে। আর আছে পটদুর্গা। কাপড়ের উপর পৌরাণিক কাহিনির চিত্র আঁকা, আর সেই কাহিনিকে গানের মাধ্যমে উপস্থাপন করা, এই হলো পটচিত্রের মূল ভিত্তি। বঙ্গদর্শন.কম-এর পক্ষ থেকে কথা বললাম বিশিষ্ট গবেষক এবং লেখক অঞ্জন সেন-এর সঙ্গে। প্রতিবেদনে দুর্গাপুজো নিয়ে ভনিতা করার কারণ, তিনি পটচিত্র গবেষক হিসাবে খ্যাত। কিন্তু তাঁর গবেষণা ছড়িয়ে আছে শিল্প সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিকে। পটচিত্র গবেষক অঞ্জন সেন (Anjan Sen)-এর সঙ্গে কথাবার্তায় উঠে এলো তাঁর কাজ, অভিজ্ঞতা, গবেষণালব্ধ তথ্য, আর নিখাদ গল্প।

গণেশ পাইনের আঁকা অঞ্জন সেনের কার্টুন

বাংলার শিল্প, সাহিত্য নিয়ে আপনি কীভাবে উৎসাহিত হলেন?  

অঞ্জনঃ আমার পড়াশোনা কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে। আমি বি.কম পড়েছি। তারপর আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা। শেষে শিপিং ম্যানেজমেন্ট। আমার চাকরি জীবনও কমার্শিয়াল শিপিং-এর জগতে। কিন্তু শিল্প, সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ ছিলো স্কুল জীবন থেকেই। তার কিছুটা পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। সেই আমলের প্রখ্যাত লেখিকা জ্যোতির্ময়ী দেবী ছিলেন সম্পর্কে আমার আত্মীয়া। আমি সেই সময়ের অনেক শিল্পী, সাহিত্যিকদের দেখেছি, তাঁদের বেশ কয়েকজনের সান্নিধ্য পেয়েছি। আশাপূর্ণা দেবীকে দেখেছি। এভাবেই ভিতরে ভিতরে শিল্প, সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। ১৯৬৮ সালে কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে একটি কিশোর পত্রিকা প্রকাশ করতাম। নাম ছিলো ‘আমরা’। তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলো। সেখানে বিভিন্ন বিশিষ্ট লেখকরা লিখতেন। ১৯৭০ সালে ‘দুই বাংলার কবিতা’ নামে আরেকটি পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করলাম। সেখানে দুই বাংলার বিভিন্ন বিশিষ্ট কবিরা লিখতেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ওপার বাংলার শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, সাহিদ কাদরি প্রমুখ। আমিও সেখানে কবিতা বিষয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলাম। 

হাটসারিন্দির পট- ছবি সৌজন্যে কিশোর দাস

এ তো গেলো সাহিত্যের কথা। চিত্রকলা এবং পটচিত্রের প্রতি আকর্ষণ কি এই সূত্রেই?

অঞ্জনঃ এটা বলতে গেলে একটা ছোটো কাহিনি বলতে হবে। ১৯৭৫ আমরা আরও একটি পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেছিলাম। নাম ছিলো গাঙ্গেয় পত্র। আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো এই গাঙ্গেয় পত্র লিটল ম্যাগাজিন-এর মাধ্যমে শিল্প, সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব, ভাষাশৈলী এইসব কিছুকে এক জায়গায় নিয়ে আসা। সেখানে আমরা গদ্যসাহিত্যে সমালোচনার এক নতুন ঘরানা তৈরি করেছিলাম। শৈলীভিত্তিক সাহিত্য সমালোচনার ঘরানা। এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিশিষ্ট ভাষাতত্ত্ববিদ উদয়নারায়ণ সিংহ, প্রবাল দাশগুপ্ত, বিশিষ্ট ভাষা দার্শনিক অরিন্দম চক্রবর্তী। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রখ্যাত মানুষদের সহায়তা আর উপদেশ পেতাম। তাঁদের অনেকেই পত্রিকাটিতে লিখতেন বা সাক্ষাৎকার দিতেন। রামকিঙ্কর বেইজ, গণেশ পাইন, শ্যামল দত্তরায়, কবি অমিয় চক্রবর্তী, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রভৃতি। ২২ টা সংখ্যা পর্যন্ত প্রকাশ করেছিলাম। আজকের দিনেও পত্রিকার সংখ্যাগুলি বিভিন্ন শিল্পী, গবেষকরা ব্যবহার করেন, দেখতে পাই। যাইহোক, এই সময় থেকেই বিভিন্ন শিল্পরীতি নিয়ে চর্চা শুরু করি এবং পটশিল্পের দিকে ঝুঁকতে শুরু করি। প্রসঙ্গত বলি, এই পত্রিকার (গাঙ্গেয় পত্র) একটি সংখ্যায় সুনীল গাঙ্গুলির কয়েকটি উপন্যাসের গঠন ও শৈলী নিয়ে কড়া সমালোচনা লিখেছিলেন উদয়নারায়ণ সিংহ। সুনীলবাবুর সঙ্গে সেই কারণে একটু মতান্তর হয়েছিলো। তবে মনান্তর হয়নি কখনও। ঐ চিঠি, পাল্টা চিঠি, এই আর কি। 

অনুরোধ করবো, পটচিত্র নিয়ে আপনার গবেষণালব্ধ তথ্যের খানিকটা আমাদের পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে। 

অঞ্জনঃ পটচিত্র একটি বিরাট বিষয়। আমি চেষ্টা করছি, কিছু বিষয় ছুঁয়ে যাওয়ার। প্রথমেই বাংলার পটচিত্রের ইতিহাস সম্পর্কে দু-এক কথা বলি। বাংলায় প্রায় হাজার বছরের আগে থেকে দুর্গাপুজোর প্রচলনের কথা জানা যায়। মার্কন্ডেয় পুরাণের ‘দেবী মাহাত্ম্য’ অংশে মাটির মূর্তি নির্মাণ করে দেবীর পুজো করার উল্লেখ আছে। একাদশ শতকের কালিকাপুরাণ বা শূলপাণির ‘দুর্গোৎসববিবেক’ গ্রন্থেও এই পুজোর উল্লেখ পাওয়া যায়। এর কাছাকাছি সময়কালেই সম্ভবত পটের দুর্গাপুজোর প্রচলন হয়েছিলো। ধীরে ধীরে পটে আঁকা দুর্গা একটি শিল্পের রূপ নেয়।

মানিক সূত্রধরের আঁকা পট

 আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে বলা দরকার। বাংলায় একধরনের পটশিল্পী সম্প্রদায় রয়েছে। তাঁরা লম্বা লম্বা পটে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনির অংশ এঁকে সেইসব কাহিনিকে গানের মাধ্যমে তুলে ধরেন। তাঁদেরকে আমরা ‘জাত পটুয়া’ বলতে পারি। পটগুলিকে গোটানো পট বা লাটাই পট বলে। এঁরা বংশপরম্পায় এই কাজ করে আসছেন। বর্তমানে সংখ্যায় খানিক কমে গেলেও পূর্ব মেদিনীপুরের নয়াগ্রামে অনেক পটুয়া আছেন। এছাড়াও অন্যান্য জায়গাতেও আছেন। বাংলাতে সব চিত্রশিল্পীদেরই আগে পটুয়া বলা হতো। কিন্তু ‘জাত পটুয়া’রা একটি বিশেষ সম্প্রদায়। 

বীরভূমের পটচিত্র, ১৯ শতক : জে.সি. ফ্রেঞ্চ সংগ্রহ

এ তো গেলো পটুয়া সম্প্রদায়ের কথা। এর বাইরেও অনেক শিল্পী আছেন, যাঁরা পট আঁকায় দক্ষ। যেমন- বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের ফৌজদার পরিবার, বীরভূমের সারিন্দির মানিক চিত্রকর, রামকৃষ্ণ সূত্রধর। এইসব কাপড়ের উপর দেবী দুর্গার ছবি এঁকে পুজো করা হয়। আর আছে কালীঘাটের পট। তার ধারা একেবারে আলাদা। পটুয়া সম্প্রদায় নয়, বরং অন্য ধারার শিল্পীদের হাতে এই ধারার সৃষ্টি হয়েছিল। কালীঘাটের পট বাংলার মৌলিক শিল্প। একে নাগরিক শিল্পধারাও বলা যায়। মোটামুটি ১৮০০ সাল নাগাদ থেকে কালিঘাটের পট আঁকা শুরু হয়েছিলো। মনে করা হয়, তীর্থযাত্রীদের স্মারক হিসাবে বিক্রি করার জন্য মাটির সরাতে দুর্গা প্রতিমা আঁকা শুরু হয়। ধীরে ধীরে যাত্রীসমাগম বাড়ার ফলে তাঁরা মোটা কাগজে দ্রুত হাতে দীর্ঘ বলিষ্ঠ রেখায় পটদুর্গা আঁকা শুরু করেন। এই চিত্ররীতি ছিলো কালীঘাটের নিজস্ব। ১৯৩০ সালের পর কালীঘাটের পটচিত্র বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া বাংলার কুম্ভকার সম্প্রদায়, কর্মকার সম্প্রদায়, সূত্রধর সম্প্রদায়ের মানুষরাও পট আঁকায় পারদর্শী ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলার আছে। শিল্পী যামিনী রায় জন্মেছিলেন বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। সেখানে পটুয়া সম্প্রদায়ের বাস ছিলো। যামিনী রায়ের চিত্রধারাতেও তাই হয়তো তাঁদের চিত্রধারার খানিকটা প্রভাব এসে পড়েছে।

পটের দুর্গার কোন ধরনের/রূপের ছবি আঁকার প্রচলন বেশি ছিলো? 

অঞ্জনঃ বাংলার মানুষ দেব-দেবীদের প্রায়শই লোকায়ত রূপে কল্পনা করে এসেছেন। তাঁদের কল্পনায় দেবতারা হয়ে উঠেছেন ঘরের মানুষ। সাহিত্যে এর প্রচুর উদাহরণ আছে। পটচিত্রও তার ব্যতিক্রম নয়। সেখানে দুর্গা হয়ে উঠেছেন গৃহিণী আর শিব হয়েছেন ছাপোষা গৃহস্থ। এমনকি দেবী তাঁদের কল্পনায় উঠে এসেছেন বাগদি রূপেও। এছাড়াও গণেশ জননী রূপী দুর্গা, রামের দুর্গা বন্দনা, এগুলিও খুব বিখ্যাত। বিভিন্ন পটে শিল্পরীতিগুলি বিভিন্ন। তা দেখে আন্দাজ করা যায়, কোন সম্প্রদায়ের আঁকা সেই পটটি। ১৮৬০ সালের পর থেকে কিছু জায়গায় পটচিত্রের জায়গা নিয়েছে মৃন্ময়ী মূর্তি। বাংলার পটের দুর্গার প্রকারভেদ নিয়ে লেখা দীপঙ্কর ঘোষের ‘পটের দুর্গা’ বইটি খুবই উল্লেখযোগ্য। আমিও বহু জায়গায় এসব নিয়ে লেখালেখি করেছি। শনিবারের কড়চা পত্রিকার একটি সংখ্যায় এ নিয়ে বিশদে লিখেছিলাম। তবে পটচিত্র মানে শুধু দুর্গা নয়। রামায়ণ, মহাভারত, বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনির চিত্রে সমৃদ্ধ এই চিত্ররীতি। 

কালিঘাটের পট

বাংলার বিভিন্ন রাজা বা জমিদারেরা সাহিত্য-শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। পটচিত্রের ক্ষেত্রেও কি এমন নিদর্শন মেলে?

অঞ্জনঃ অবশ্যই। বাঁকুড়ার ফৌজদার সম্প্রদায় ছিলো বিষ্ণুপুরের রাজবাড়ির সঙ্গে যুক্ত। শান্তিপুরের রাজবাড়ির কালীপট তৈরি করেন স্থানীয় কুম্ভকার সম্প্রদায়ের মানুষরা। সেখানে দেবীর নাম ‛পটেশ্বরী’। এমন আরও বেশ কিছু উদাহরণ দেওয়া যায়। তবে মজার কথা, ‘জাত পটুয়া’রা সবাই মুসলমান সম্প্রদায়ের। কিন্তু তাঁরা হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে ছবি আঁকেন, গান বাঁধেন। 

পটুয়াদের পট : গুরুসদয় দত্ত সংগ্রহ

ফিরি আপনার সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে। এখানে কী ধরনের কাজ করেছেন আপনি?

অঞ্জনঃ যেমন প্রথমেই বললাম, আমরা বিভিন্ন পত্র পত্রিকা প্রকাশ করতাম। সেখান থেকেই আমার লেখালেখিতে হাতেখড়ি। বিভিন্ন সাহিত্যিক, শিল্পীদের সান্নিধ্য পেয়েছি। গণেশ পাইনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো। আমাদের মধ্যে প্রচুর চিঠিপত্রের আদানপ্রদান হতো। সেইসব চিঠিপত্রে গণেশ পাইন বিভিন্ন স্কেচ এঁকে দিতেন। আমার কার্টুনও এঁকেছেন। সেইসব চিঠিপত্রের সংকলন করে একটা বই প্রকাশ করার কথা চলছে। আগের বছর বেরিয়েছে আমার সম্পাদিত করা গণেশ পাইনের ডায়রি। তবে গণেশ পাইনকে নিয়ে আমার লেখা প্রথম বই ‘চিত্রক্রম চিত্রকর’। ‘বাংলার উত্তরআধুনিক সাহিত্যচিন্তা’ বইটির যৌথ সম্পাদনা করেছিলাম আমি আর উদয়নারায়ণ সিংহ। এছাড়াও নন্দলাল বসু, যামিনী রায় আর গণেশ পাইনকে নিয়ে লেখা ‘বাংলার তিন শিল্পী’ বইটি আমার একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। কবিতাও লিখেছি। আমার একটি কবিতা ‘গঙ্গা’-র ছবি এঁকেছিলেন গণেশ পাইন। এছাড়াও আমার কবিতা সংকলন ‘পাঠ ভারতবর্ষ’ বইটির সম্পূর্ণ অলংকরণ করেছিলেন তিনি। এছাড়াও রয়েছে বাংলার লোকগান, কবিগান, সাহিত্যতত্ত্বের উপর বিভিন্ন গবেষণাধর্মী কাজ ও বই। পুঁথিপাটার অলংকরণ বাংলা তথা ভারতের খুবই প্রাচীন শিল্পরীতি, যা এখন হারিয়ে গেছে। সেই বিষয়ে লিখেছিলাম ‘মধ্যযুগের বাংলা পুঁথিপাটার চিত্র’, ‘চিত্রিত পদ্মাপুরাণের পুঁথি’। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। একসময় আমরা কলেজ স্ট্রীটের বসন্ত কেবিনে নিয়মিত আড্ডা দিতাম। সেখানে প্রচুর শিল্পী, সাহিত্যিকরা আসতেন। বিমল কুণ্ডু, বিজন চক্রবর্তী, গণেশ পাইন। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা! সেই আড্ডা থেকে সমৃদ্ধ হয়েছি, প্রেরণা পেয়েছি। সেই আড্ডাটা আমার শিল্প-সাহিত্য অনুরাগের একটি অন্যতম কারণ।  

বকাসুর বধ পুঁথির পাটা : বিড়লা একাডেমি সংগ্রহ

ফিরে আসি পটচিত্রের কথায়। বাংলায় পটচিত্রের ভবিষ্যৎ কী?

অঞ্জনঃ পটচিত্র বাংলার অতি প্রাচীন শিল্পরীতি। অনেক প্রাচীন শিল্পরীতির মতনই এই ধারায় কাজ করার মানুষের সংখ্যাও কমে আসছে। নতুন প্রজন্ম অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। তবে এখনও কিছু মানুষ এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। পূর্ব মেদিনীপুরের পটুয়ারা কলকাতার বিভিন্ন মেলায় আসেন। অনেক গবেষক এই শিল্পরীতি নিয়ে গবেষণা করেছেন ও করছেন। বাংলার আরেকটি শিল্পরীতি হলো চালচিত্র। তারও অনেক প্রকারভেদ রয়েছে। সেটাও অনেক কমে এসেছে। তবু কিছু শিল্পী এখনও চালচিত্র আঁকেন। অনেক মেয়েরাও চালচিত্র আঁকেন। এটা বেশ ভালো ব্যাপার। রাজ্যের কিছু সংগ্রহশালায় বিভিন্ন পটচিত্র সংরক্ষিত করা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ পটচিত্রই ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন সংগ্রাহকের জিম্মায় রয়েছে। তবে তাঁরা খুবই যত্নের সঙ্গে পটগুলিকে সংরক্ষিত করে রেখেছেন। আর একটা কথা, যেটা আগে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কীভাবে পটচিত্রের প্রতি আকর্ষিত হই এবং গবেষণা শুরু করি। খানিকটা আগেই বলেছি। বাকিটা এখানে বলি। আমি বাংলার শিল্পরীতি নিয়ে বই লিখতে চেয়েছিলাম। সেই সূত্রে বিভিন্ন শিল্পরীতি নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। চৈতন্য পরবর্তী সময়ের শিল্প থেকে কালীঘাটের পট- এই সময়কাল পর্যন্ত শিল্পরীতি নিয়ে কাজ করেছি, বইটির নাম ‘বাংলার চিত্রকলাঃ মধ্যযুগ থেকে কালীঘাট’। এর পরের সংস্করণটি ছিলো শুধুমাত্র বাংলার মধ্যযুগের চিত্রকলা নিয়ে। তৃতীয় সংস্করণের কাজ চলছে। বাংলায় বিভিন্ন ধরনের পটচিত্র রয়েছে। অনেকেই সেগুলোকে এক করে ফেলেন। আমার উদ্দেশ্য, নিজের গবেষণা আর লেখনীর মধ্যে দিয়ে সেগুলির মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করা, এবং নিজের সাধ্য অনুযায়ী বাংলার পটচিত্রের বিভিন্ন রীতির বিশদ ইতিহাস জনসমাজে তুলে ধরা। 

Developed by DXDasia