
দোকান না বলে একে শিল্প-সৃষ্টির আঁতুড়ঘর বলা চলে
তখনও মানবজীবনে আমাজন, ইনস্টাগ্রাম আসেনি। কলকাতা তো বটেই এ দেশের তাবড় তাবড় শিল্পীদের চাহিদা মেটানোর অন্যতম বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান ছিল ধর্মতলার ‘জি সি লাহা’। রবীন্দ্রনাথ, অবন ঠাকুর ছাড়াও নন্দলাল বসু, বিকাশ ভট্টাচার্য, মকবুল ফিদা হুসেন, গণেশ পাইন, সত্যজিৎ সহ অসংখ্য কেউকেটা শিল্পীদের নিয়মিত ঠেক ছিল এই ঐতিহ্যবাহী দোকান। এখনও আর্টিস্টরা এবং আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীরা এই দোকানের নিত্য খদ্দের। তাঁদের মাসের যাবতীয় সরঞ্জাম আসে এখান থেকেই।
‘জি সি লাহা’র নাম শোনেননি এ শহরে এরকম শিল্পী খুঁজে পাওয়া ভার। সবধরনের আঁকার সামগ্রী মজুত রয়েছে এই দোকানে। দোকান না বলে একে শিল্প-সৃষ্টির এই আঁতুড়ঘর বলা চলে। সত্যজিৎ রায় নাকি এ দোকান ছাড়া অন্য কোনও দোকানের মাল কিনতে ভরসা পেতেন না। কলাভবন থেকে ফেরার পর থেকে লাহা’র সঙ্গে দীর্ঘ ষাট বছরের অটুট সম্পর্ক ছিল সত্যজিতের। সত্যজিৎ ‘চাইনিজ পেলিকান’ কালি এবং ‘স্ট্যাডলার’-এর পেন্সিল কিনতেন এই জায়গা থেকেই। ‘জি সি লাহা’-এ নানা বিদেশি সরঞ্জাম পাওয়া যেত। তখনও তিনি পরিচালনার পাশাপাশি ‘ডি জে কেমার’-এ গ্রাফিক শিল্পী হিসাবে কর্মরত ছিলেন। নিজের অনেক ছবির পোস্টারও নিজে ডিজাইন করতেন। এই দোকান থেকে যেত লেআউট আঁকার খাতা এবং বিভিন্ন আঁকার ব্লক। “আমি নিজেই ওঁকে আঁকাআঁকির জিনিসপত্র ওঁর হাতে তুলে দিয়েছি”। বলছিলেন জে সি লাহা’র বর্তমান কর্ণধার সিদ্ধার্থ লাহা।
বহু বিখ্যাত শিল্পী নানা সময়ে এই দোকান থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনেছেন। সে সব গল্প এখনও এই দোকানের কর্মচারীদের মুখে শোনা যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পী রাজা রবি বর্মার গল্প। তিনি নাকি এক সময় প্রুশিয়ান ব্লু রংটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না কোথাও। তখন গিরীন্দ্রকে চিঠি লিখে সে কথা জানান। কোনও রকম অগ্রীম টাকাপয়সার কথা না বলেই গিরীন্দ্র তাঁকে রং পাঠিয়ে দেন। তাতে রবি বর্মা এতই অবাক হয়ে যান যে পরবর্তীকালে এই দোকান ঘুরে যান। তার পর থেকে বহু বার এসেছিলেন।
সন্দীপ রায় একটি বইতে লিখেছিলেন, “পথের পাঁচালী-র চিত্রনাট্য গোটাটাই যেমন ছবি এঁকে করা, লেখা ছিল না কিছু, রবিশঙ্করকে নিয়ে স্টোরিবোর্ডটাও পুরো আঁকা, যে ক’টা শব্দ লিখেছেন, সেগুলো সিনেমার টেকনিক্যাল নির্দেশ। আঁকাজোকার জন্য জি সি লাহা থেকে ড্রয়িং ব্লক কিনতেন বাবা, সে রকমই একটা ড্রইং ব্লক-এ রবিশঙ্করকে নিয়ে ছবি এঁকে এই চিত্রনাট্যটা সাজিয়েছিলেন। ৩২টা স্কেচ আছে এতে। সম্পূর্ণ ড্রয়িং বুকটা মূল অক্ষুণ্ণ অবস্থায় প্যারিসে রয়েছে।”

‘জি সি লাহা’র প্রতিষ্ঠাতা গিরীন্দ্র কুমার লাহার দাদু নবীন চন্দ্র দত্ত ছিলেন এ দেশের প্রথম রং বিক্রেতা। ঘরবাড়ির রঙের জোগান দিতেন, সেটাই ছিল তাঁর ব্যবসা। নাতি গিরীন্দ্র নিজের মতো করে দাদুর দেখানো পথই অনুসরণ করেন। আঁকার জন্য রং-তুলির চাহিদাও কম নয়, এই কথা বিচার বিবেচনা করে ১৯০৫ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে শিল্পসামগ্রী নিয়ে শুরু করেন ‘জি সি লাহা’র যাত্রাপথ।
বহু বিখ্যাত শিল্পী নানা সময়ে এই দোকান থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনেছেন। সে সব গল্প এখনও এই দোকানের কর্মচারীদের মুখে শোনা যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পী রাজা রবি বর্মার গল্প। তিনি নাকি এক সময় প্রুশিয়ান ব্লু রংটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না কোথাও। তখন গিরীন্দ্রকে চিঠি লিখে সে কথা জানান। কোনও রকম অগ্রীম টাকাপয়সার কথা না বলেই গিরীন্দ্র তাঁকে রং পাঠিয়ে দেন। তাতে রবি বর্মা এতই অবাক হয়ে যান যে পরবর্তীকালে এই দোকান ঘুরে যান। তার পর থেকে বহু বার এসেছিলেন। গিরীন্দ্রর সঙ্গে তাঁর বিশেষ বন্ধুত্বও হয়ে যায়। শোনা যায়, তিনি নাকি তাঁর আঁকা ছবিও উপহার দিয়েছিলেন গিরীন্দ্রকে।

‘উইনসর অ্যান্ড নিয়টন’-এর সঙ্গে গোড়াতেই সুসম্পর্ক তৈরি হয় গিরীন্দ্রর। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তাদের মাল সরাসরি এই দোকানেই আসত। তা ছা়ড়াও ‘পেলিকান’, ‘ফ্যাব্রিয়ানো’, ‘লাইফলং কেট’-এর মতো বেশ কিছু সংস্থার সরঞ্জাম থাকত এই দোকানে। ধীরে ধীরে অন্য বিশ্বখ্যাত কিছু ব্র্যান্ড যেমন জার্মানির ‘স্ট্যাডলার’ বা ‘ফেবার ক্যাস্ল’-এর জিনিসও নিয়মিত বিক্রি হত এখানে। পরবর্তীকালে ভারতীয় ব্র্যান্ড ‘ক্যামেল’-এর জিনিসও জায়গা করে নেয় এই দোকানে।
সময় বদলেছে, আগে যে ভিড় জে সি লাহার সামনে দেখা যেত, এখন তা দেখা যায় পার্শ্ববর্তী জুতো, জামা এবং অন্যান্য সামগ্রীর দোকানগুলোতে। অবশ্য, যাঁরা জানার তাঁরা ঠিকই জানেন নিজেদের কাঙ্খিত ঠিকানা –ধর্মতলার মোড়ে ঠিক টিপু সুলতান মসজিদের উল্টো দিকের ‘জি সি লাহা’। ফোন করলে মাল পৌঁছে যেত বাড়িতেই, যেহেতু সে যুগ থেকেই এই সুবিধা ছিল এ দোকানের, তাই এ যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে যে অসুবিধা হয়নি। ব্ররতমানেও তাঁদের ওয়েবসাইট এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নানা সরঞ্জাম বাড়ি বসেই পাওয়া যায়। তবে, অনলাইন ব্যবসার এই দুনিয়ায় ঐতিহ্যবাহী এই দোকানটি রকমারি রঙ-ব্রাশ-কাগজের পসরা সাজিয়ে এখনও পথ চেয়ে থাকে ছবি আঁকিয়েদের। আঁকিয়েরাও সশরীরে হাজির হন এই দোকানের ভিক্টোরিয়ান চেকারবোর্ড মেঝেতে পা রাখার জন্য, যেখানে এখনও বিশিষ্টদের পায়ের ছাপ রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: জি সি লাহার ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাফ পত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবি সৌজন্য: জি সি লাহার ওয়েবসাইট
