
সাতের দশকের সিনেমাহলের বাইরে সাদা-কালো বিজ্ঞাপনী কাটআউটের পোস্টার সময়ের হাত ধরে আটের দশকের মাঝামাঝি আর নয়ের দশকে পুরোপুরি রঙিন ঝলমলে প্রাণ পায়। তখন হাতে আঁকা বড়ো পোস্টার কাটআউট ছিল ছবির প্রচার তথা প্রমোশনের একমাত্র সর্বজন গ্রাহ্য চিত্তাকর্ষক মাধ্যম। যার কালার প্যালেটে নির্দিষ্ট কিছু গুণাগুণ সদা বিরাজমান। যেমন নায়কের ছবি ফুঁটিয়ে তুলতে অবশ্যই তার গায়ের রং ফর্সা। হয় লালচে কিংবা গোলাপি আভায় দুধে আলতা রং। (মিঠুন কিংবা অজয় দেবগনের ও গায়ের রং থাকতো ওই রঙেই) রেসিজিমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছবির হিরো মানেই সবাই সমান রঙের, অন্তত রক্তিম নয়তো উজ্বল গোলাপি। আর গালের কাছে নীলচে সবুজ আভা, সদ্য কামানো মাখন ত্বকের চুঁইয়ে পড়া গ্ল্যামার বোঝাতে। মায় ভিলেন মানেই মহিষাসুরের মতন সবুজ নয় নীল রঙে কিছুটা হিংস্র অবয়ব। নায়কের মতনই যে কোনো হিরোইনের মোম পালিশ মোলায়েম পেলবতা বোঝাতে গায়ের রং গোলাপি ঘেঁষা পিঙ্ক শেডের ঔজ্বল্য। (হাতে আঁকা সিনে পোস্টার কাটআউট)

নয়ের দশকের শেষ অবধি হইহই করে এই পন্থায় জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছিল ভূ-ভারতের তামাম সিনেমাহলগুলি। পথ চলতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সর্বাগ্রে থাকতো, শিল্পীদের হাতে আঁকা সিনেপ্রেমীদের ম্যাটিনি আইডলদের বিরাট বিরাট সব কাটআউট।
রীতিমতন বাঁশের মঞ্চ বেঁধে আঁকতে হতো ঐসব ছবি, নয়তো আলাদা আলাদা করে কাঠ বোর্ডের ওপর রঙিন মোম রঙে স্কেচ করে, তার ওপর একে একে তুলির আঁচড়ে রং চড়িয়ে এঁকে জোড়া লাগিয়ে ফুটিয়ে তোলা হত আটের দশকের সমস্ত সিনেমাহলের বাইরে জ্বলজ্বল করতে থাকা রুপোলি পর্দার তারকাদের কুহকিনী হাতছানি। নয়ের দশকের শেষ অবধি হইহই করে এই পন্থায় জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছিল ভূ-ভারতের তামাম সিনেমাহলগুলি। পথ চলতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সর্বাগ্রে থাকতো, শিল্পীদের হাতে আঁকা সিনেপ্রেমীদের ম্যাটিনি আইডলদের বিরাট বিরাট সব কাটআউট। একটু লাউড প্রেমের কিংবা রগরগে অ্যাকশনধর্মী ছবির পোস্টারগুলো আরও রঙিন আরও জমজমাট। নতুন শতাব্দীর শুরুর দিক থেকেই একে একে ফুরিয়ে যেতে লাগলো এই সব গুণী চিত্রকরদের কদর। বিশ্বায়ন আর কম্পিউটারের ক্লিকে হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছুর মতনই আস্তে আস্তে ওই ধরনের হাতে আঁকা সিনে পোস্টার কাটআউটগুলো হারিয়ে গেলো… এখন আর দেখাই যায় না। ইদানীং কিছু ছবিতে আট-নয়ের দশকের ঢিসুম ঢিসুম সব ছবির ফ্লেভার আনতে পার্টিকুলার এই ধরনের পোস্টার ডিজাইন কিছুটা চোখে পড়ে যদিও। (হাতে আঁকা সিনে পোস্টার কাটআউট)
অধুনা ডিজিটালের রমরমায় তুলি ইজেল নিয়ে পোস্টার আঁকার চল হারিয়ে গেছে প্রায় সম্পূর্ণ রূপে। এখন তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও ওই ধরনের বিরাট মাপের সিনে পোস্টার বা ওরকম গুণী আঁকিয়ে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শুধু পশ্চিমবাংলার বুকে নয়, ভারতবর্ষে শুধুমাত্র দক্ষিণের কিছু রাজ্যে এখনও ওরকম পোস্টার আঁকবার চল রয়েছে কিছুটা। যদিও সেই সব শিল্পীরও আকাল বর্তমানে। পছন্দের নায়ক নায়িকার প্রমাণ সাইজের বিরাট সব রঙিন হাতে আঁকা কাটআউট যাতে ভক্তরা দুধের অর্ঘ্য চড়ায়, অর্ডারি ফুলের মালার হার পরিয়ে দেয় এখনও। (হাতে আঁকা সিনে পোস্টার কাটআউট)
আর রয়েছেন মুম্বাইয়ের একমাত্র সিনেমার বিরাট মাপের পোস্টার আঁকিয়ে শিল্পী আখতার সাহেব। মুম্বাইয়ের শেষ পোস্টার আঁকিয়ে, যাঁর হাতযশের খ্যাতি ছিল, তাঁর আঁকা ছবির বিরাট কাটআউটের মতনই। যদিও তিনি ইদানীং পোস্টার কাটআউট আঁকা ছেড়েছেন। ইদানীং ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর-এ দক্ষ শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলতে পারেন মাউসের ক্লিকে হুবহু একই ফিলের এই রকম বিরাট মাপের পোস্টার। যার পোশাকি নাম ‘টিফো’। তাই বাঁশের ভাড়া বেঁধে উঁচুতে উঠে কার্যত ম্যাজিশানের মতন নিজের হাতে অত বড়ো পোস্টার আঁকিয়ে শিল্পীদের কদর ও ফুরিয়েছে। রুটি রুজি হারিয়েছেন বহু শিল্পী। বিগত শেষ দুই বছরে একমাত্র মুক্তি প্রাপ্ত হিন্দি ছবি ‘গদর টু’ রিলিজের প্রমোশনে শেষবার দেখা গেছিল এই ধরনের বিরাট মাপের হাতে আঁকা রঙিন পোস্টার কাটআউট। (হাতে আঁকা সিনে পোস্টার কাটআউট)
নন্দনে চলতে থাকা ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে, এই হারিয়ে যেতে বসা শিল্প, হাতে আঁকা ছবির বিরাট বড়ো সিনেপোস্টার কাটআউটের রঙিন উপস্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং মঞ্চ সজ্জায় এর ব্যবহার নিঃসন্দেহে তারিফ যোগ্য প্রচেষ্টা।

নন্দনে চলতে থাকা ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে, এই হারিয়ে যেতে বসা শিল্প, হাতে আঁকা ছবির বিরাট বড়ো সিনেপোস্টার কাটআউটের রঙিন উপস্থিতি ফিরিয়ে আনা এবং মঞ্চ সজ্জায় এর ব্যবহার নিঃসন্দেহে তারিফ যোগ্য প্রচেষ্টা। ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘অযান্ত্রিক’-এর মতো চিরন্তন কালজয়ী বাংলা ছবির পাশাপাশি হলিউডের আইকনিক নানা ছবি, যেমন ‘পাইরেটস অফ দি ক্যারিবিয়ান’, হিন্দি ছবির ‘লাপাতা লেডিজ’ ও অন্যান্য আরও ছবির মুহূর্তের মঞ্চায়ন, ফুটিয়ে তোলা, নিঃসন্দেহে কুর্নিশ যোগ্য। পুরোপুরি হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পে ভর করে ফেলা আসা দিনের স্মৃতির, সেপিয়া টোনের ধূসর নস্টালজিয়া নিমেষে রঙিন হয়ে ওঠা যেন কার্যত ম্যাজিক। এখনকার জেনজি প্রজন্মের অনেকের কাছেই এই শিল্পকে চাক্ষুষ করবার সুযোগ, হয়তো শেষবার। আজই চলচ্চিত্র উৎসবের শেষদিন।

