গোটা পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র ভারতবর্ষেই এই শিল্পচর্চা হয়
সভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, মানুষের সঙ্গে অস্ত্রের এক বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। একসময় একটা পাথরের টুকরোকে মানুষ অস্ত্র হিসেবে আবিষ্কার করেছিল। প্রস্তরযুগ অতিক্রান্ত হবার পর মানুষ ধীরে ধীরে ধাতু আবিষ্কার করেছে। তারপর একসময় মানুষের হাতে উঠে এসেছে তলোয়ার। গাদাবন্দুক আসার আগে অবধি মূলত তলোয়ার নিয়েই রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হতেন যোদ্ধা। প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের তলোয়ারগুলির আকারে স্বকীয়তা লক্ষণীয়। সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে মানুষ যখন সম্পূর্ণ ‘মানুষ’ হিসেবে নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিলো হয়তো সেইসময় থেকেই শিল্পের সঙ্গে তাঁর সহাবস্থান। 'আর্ট' এবং 'আর্মস' এই দুটো বিষয়কে মিলিয়ে দেওয়া বেশ কঠিন, এই বিষয়ে হয়তো কেউই দ্বিমত পোষণ করবেন বলে মনে হয়না। কিন্তু, আমাদের দেশেই এমন একধরনের শিল্পকলার চর্চা হয় যা মিলিয়ে দেয় হাতিয়ার এবং হস্তকলা! এই শিল্পকলার নাম — ‘কোফতগিরি’। গোটা পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র ভারতেই এই শিল্পচর্চা হয়। জয়পুর, উদয়পুর, চিতোরগড় এইসব জায়গায় এখনো বেশ কিছু শিল্পী 'কোফতগিরি'-কে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় মগ্ন ।
মূলত তলোয়ারের উপর নানান 'ডিজাইন' রচনা থেকেই এই শিল্পের সূচনা। তলোয়ারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলে সিরিয়া এবং ভারতের মাঝামাঝি কোন জায়গায় এই শিল্পের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। যদিও সঠিকভাবে 'কোফতগিরি'র উৎসস্থল বলা একটু মুশকিল। আসলে তলোয়ারের সঙ্গে যোদ্ধার বড় নিবিড় সম্পর্ক। তাই কেউ হয়তো ভেবেছিল কোমরে ঝুলে থাকা এই সঙ্গীকে একটু সাজিয়ে তুললে কেমন হয়! সেখান থেকেই হয়তো কোফতগিরির সূচনা! রাজস্থানের 'সিগলিগর' গোষ্ঠীর লোকেরা এই শিল্পকলায় পারদর্শী। তাঁদের বিশ্বাস তাঁদের পূর্বপুরুষরা 'রব'-কে সন্তুষ্ট করতে সোনা, রুপা খোদাই সম্পর্কিত এমন এক অপরুপ শিল্পকলা সৃষ্টি করেন। যদিও কোফতগিরির সঙ্গে 'দামাস্কাস স্টিল' তথা 'দামাসসিনিং' শিল্পের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। 'দামাসসিনিং' বলতে একটি ধাতুর উপর অন্য একটি ধাতুর (মূলত তারের ফর্মে) শিল্পকলাকে বোঝায় । ভারত, স্পেন, এবং পার্সিয়ায় 'দামাসসিনিং'-এর চর্চা হয়। 'দামাস্কাস স্টিল' মূলত তলোয়ার তৈরিতে কাজে লাগতো । যদিও 'দামাসসিনিং'-এর আসল পদ্ধতিটি অধুনালুপ্ত। এই শিল্পের হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে কারণ হিসেবে কেউ কেউ মনে করেন এই শিল্পকলা গোপনে চর্চা করা হতো এবং এই বিদ্যে এক কারিগর থেকে অন্য কারিগরের কাছে সেভাবে পৌঁছতে পারেনি আবার কেউ কেউ নানান অর্থনৈতিক কারণ খুঁজে পেয়েছেন। ভারতে প্রায় ৭০০ বছর আগে মুঘলদের শাসনকালে 'কোফতগিরি' শিল্পের সূচনা। সম্রাট আকবর ছিলেন 'কোফতগিরি'র পৃষ্ঠপোষক। খুব সম্ভবত আকবরের শাসনকালে 'কোফতগিরি'র নতুন নতুন ডিজাইন রচনা করা হয়। মুঘলরা এই আর্ট সৃষ্টি করলেও কিছুসময় পরে তা হারিয়ে যায়। পরবর্তীকালে 'সিগলিগর' গোষ্ঠীর লোকেরা এই শিল্পের পুনরুদ্ধার করেন এবং বর্তমানে এঁদের পঞ্চম প্রজন্ম এই শিল্পের সাধনা করছেন। তলোয়ার, তলোয়ারের বাঁট, তলোয়ারের খাপ, ঢাল, ছুরি, বর্ম, শিরস্ত্রান ইত্যাদির অলংকরণে কোফতগিরি প্রয়োগ করা হত। তলোয়ার, ছুরি, ঢাল, বর্ম ইত্যাদি সবই প্রায় তৈরি হতো দামাস্কাস স্টিল বা চলতি কথায় 'ফওলাদ' থেকে। তারপর এইসব অস্ত্রের গায়ে সোনা বা রুপোর তার দিয়ে নানান অলংকরণ করা হত। রাজারা যে রাজবেশ পরবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, তাঁদের বর্ম, শিরস্ত্রাণ, কোমরে ঝুলে থাকা তলোয়ার, ঢাল ইত্যাদির মধ্যেও একটা অলংকরণ প্রয়োজন। কারণ সম্রাট যখন যোদ্ধার পোশাক পরছেন তখন তো সেটা রাজবেশের মতন হবে না। কিন্তু, যোদ্ধার পোশাক পরলেও সম্রাটের সেই পোশাক, অস্ত্র সবকিছু হতে হবে একদম অন্যরকম। হয়তো এই জায়গা থেকেই 'কোফতগিরি' শিল্পের কথা মানুষ ভেবেছিল। যদিও সবটাই অনুমান। প্রামাণ্য তথ্য নেই।
সাধারণত তিন ধরনের কোফতগিরি টেকনিকের সন্ধান মেলে।
তে-হেন-শাহ — একটি বিশেষ প্যাটার্ন খোদাই করা হয় ধাতুর উপর এবং রুপোর তার বসিয়ে দেওয়া হয় পরে। হাত দিয়ে স্পর্শ করে এই বিশেষ প্যাটার্ন অনুভব করা যায় না।
প্রচলিত কোফতগিরি — বিশেষ সূচালো যন্ত্রের দ্বারা ধাতুর উপর 'ক্রস-হ্যাচ' প্যাটার্ন আঁকা হয়। এরপর উত্তাপ প্রয়োগ করে হাকিক স্টোন দিয়ে চাপ দেওয়া হয়। হাত দিয়ে স্পর্শ করে এই 'প্যাটার্ন' অনুভব করা যায়।
তেহ-তুলা — রুপো অথবা সোনার মোড়ক ধাতুর উপর আঁকা 'ক্রস-হ্যাচ' প্যাটার্ন অথবা খোঁচা পৃষ্ঠে ঠুকে দেওয়া হয়। হাত দিয়ে খুবই স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায় সোনা বা রুপোর এই প্যাটার্ন।
কোফতগিরিতে নানান ডিজাইন ব্যবহার করা হয়। যদিও ভারতীয় কারিগর এবং পার্সিয়ার কারিগরদের ডিজাইন আলাদা। ভারতীয় কারিগরদের সঙ্গে মেবারের নিবিড় যোগ রয়েছে। ঘোড়া, শিকার করা পশু, ঈগল ইত্যাদি খুঁজে পাওয়া যায় থেকে এইসব ডিজাইনে। পার্সিয়ার কারিগরদের ডিজাইনে নানান আরব দেশীয় আর্টের খোঁজ মেলে। তবে ভারত এবং পার্সিয়া দুই দেশের কারিগররাই প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নানান ডিজাইন তৈরি করেছেন।
এখন কোফতগিরি শিল্পীরা নানান সমস্যায় আছেন। সেভাবে ক্রেতা নেই। অনলাইনে যদিও বিক্রি মন্দ নয়। তাছাড়া এই শিল্পের সমঝদার লোক খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। এখন যারা কোফতগিরি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁরা এই শিল্পকলাকে বাঁচিয়ে রাখতে নানান 'আপডেট' করেছেন ডিজাইনে। এখন 'ক্লায়েন্ট'-এর দাবি অনুযায়ী নতুন ডিজাইন বানাচ্ছেন তাঁরা। কিন্তু অনেক শিল্পীই অর্থের অভাবে অন্য পেশায় চলে গেছেন বলে শোনা যায়।
ছবি ও তথ্য ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত