হাঁটু জখম, প্রস্তুতির সময়ও বেশি নেই। তাই নিয়েই চ্যালেঞ্জ ‘লা আল্ট্রা’র…
লম্বা দৌড়ে যখন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, তখন ধীরে ধীরে কৌতূহল জন্মাল– কতটা উচ্চতায় এই দৌড় চালিয়ে যাওয়া যায়, তা দেখার।
সান্দাকফু-ফালুট রুটে এর আগে প্র্যাক্টিস করেছি। কিন্তু তার উচ্চতা ছিল ৩৬০০ মিটারের আশেপাশে। এক্সপিডিশানে গিয়েও বেসক্যাম্প উঠেছি দৌড়ে। সেটাও ওই ৪৫০০ মিটারের আশেপাশে। তার উপরে কি দৌড়নো সম্ভব? ঠিক কতটা কষ্ট হয়? কী কী লাগে? অভিজ্ঞতা নেওয়ার খুব দরকার ছিল। তাই, প্রস্তুতি নিলাম ‘লা আল্ট্রা- দি হাই’ নামে রানিং ইভেন্টে অংশগ্রহণ করার।

‘লা আল্ট্রা’ আল্ট্রাম্যারাথনের দুনিয়ায় অত্যন্ত কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং একটি রেস। হিমালয়ের রুক্ষ, উঁচু মরুভূমি লাদাখে এই রেস অনুষ্ঠিত হয়। মোট দৈর্ঘ্য ১১১ কিমি। নুব্রা ভ্যালি থেকে দৌড় শুরু হয়ে হিমালয়ের অন্যতম সর্বোচ্চ মোটরেবল পাস খার্দুংলা (১৮,৩৮০ ফুট) টপকে লেহতে গিয়ে এই রেস শেষ হয়।
অর্থাৎ, ৫৩০০ মিটার উচ্চতায় দৌড়। মোট ১১১ কিমি। যেখানে বাতাসে অক্সিজেন মেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় ২০ শতাংশ কম, তাপমাত্রা -১০ থেকে ৪০ ডিগ্রিতে পৌঁছে যায় কয়েক ঘন্টার মধ্যে। যেখানে স্নো ফলও হতে পারে আবার গরম লুও বইতে পারে। রাস্তার ধারে রয়েছে গভীর খাদ, রয়েছে অনবরত পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার ভয়। ‘লা আল্ট্রা’ সবদিক থেকেই এপিক, দেশ বিদেশের বিখ্যাত সব রানাররা এই দৌড়ের চ্যালেঞ্জ নিতে ছুটে আসেন। এই দৌড়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করা যায় না, ভারতীয়রা গাড়োয়াল রানের মাধ্যমে এই দৌড়ে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করে। যেটি আমি আগেই সময়ের মধ্যে দৌড়ে শেষ করেছিলাম।

কিন্তু, এক্সপিডিশন শেষ করে এসে লা আল্ট্রাতে দৌড়নোর মধ্যে সময় হাতে ছিল মাত্র দেড় মাস। আর, ক্লান্তিকর এক্সপিডিশন শেষে দরকার হয় লম্বা বিশ্রামের। অথচ, আমি ফের এক্সারসাইজ শুরু করলাম দু’সপ্তাহের মধ্যেই। তবে, দৌড়তে গিয়ে বুঝলাম এক্সপিডিশনে গিয়ে হাঁটু ভালোরকম জখম হয়েছে। আমার বাম হাঁটুর এসিএল লিগামেন্ট ২০১৪তে এক এক্সপিডিশনে গিয়ে ভালোরকম জখম হয়েছিল, তার উপর ১২০ কেজি ওজন বেসক্যাম্প থেকে নিচে নামানোর ফল তখন ভুগতে হচ্ছে। আর দৌড়ের তখন একমাসও বাকি নেই।

এরই মাঝে একবার চলে গেলাম টোংলু। পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ, উচ্চতা ৩০০০ মিটার। ইচ্ছে ছিল হাই অল্টিচিউড রানিং ধাপে ধাপে প্র্যক্টিস করে নেওয়া। কিন্তু, সেখানেও সেই একই সমস্যা, ৩০ কিমি দৌড়ের পরেই হাঁটুতে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হল। ফলে তারপরের পরিকল্পনা, অর্থাৎ ৪০০০ মিটার উচ্চতায় নাথুলা পাসে দৌড়, বাতিল করে আগে ডাক্তারের কাছে গেলাম। উনিও খুব বেশি আশা দিতে পারলেন না। বললেন, দৌড়নো বন্ধ রেখে হাঁটুর জোর বাড়ানোর দিকে লক্ষ্য দিতে, সেইমতো রানিং বন্ধ রেখে সাইকেলিং সুইমিং শুরু করলাম।

ধীরে ধীরে এগিয়ে এল দৌড়ের সময়। ৫০০০ মিটার উচ্চতায় দৌড়নোর জন্য শরীরকে মানিয়ে নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যাকে আমরা বলি এক্লামাইটেজেশন। এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ করে রেসের প্রস্তুতি অবধি প্রায় দু’সপ্তাহের সময় দরকার পড়ে। কিন্তু আমার মত চাকুরীজীবির জন্য একসপ্তাহের টানা ছুটি বের করাই দুঃসাধ্য ব্যপার। তাই সবমিলিয়ে মাত্র ৬ দিন পেয়েছিলাম। আবার দৌড়নো থেকেও পুরো বিরতি নিয়েছিলাম। তাই, লাদাখের আবহাওয়ায় নিজেকে দ্রুত প্রস্তুত করার জন্য পুরো নতুন এবং অন্যরকমের পরিকল্পনা নিতে হয়েছিল আমায়।

সেই প্রস্তুতির গল্প আর রেসের অভিজ্ঞতা এক জন্মে ভোলা মুস্কিল।
(ক্রমশ)