তাঁদের সংস্থা এগরা এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি
গ্রাম-মফস্সলের রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছেন এক প্রৌঢ়। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, তাঁর চলার বিরাম নেই। গ্রামের তস্য গরিব, প্রান্তিক পরিবারগুলো পথের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। না-পাওয়া, বঞ্চনার ভার বাড়তে বাড়তে তাঁদের যুগ কেটে যায়, তবু আলো ফোটে না। তাঁদের জীবনে চিরকালীন ঝড়। ভাঙা ঘরে অলক্ষ্মী অচঞ্চলা। তবু সেই চিরন্তন অন্ধকার ঢেউয়ের পাড়ে দাঁড়িয়ে কারও কারও ভরসার হাত দেখা যায় বজ্রবিদ্যুতের ঝলকে। হাত ধরলে একটু ভালো করে বেঁচে থাকা যায়। সেই ভরসার নাম কমলা কান্ত জানা (Kamala Kanta Jana)। বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের এগরাতে। কিন্তু আদিবাসী মানুষগুলোর টানে বহু বছর পড়ে আছেন বীরভূম, বর্ধমান এবং বাঁকুড়াতে।

সংস্থার তরফ থেকে বস্ত্র বিতরণ
কমলা কান্ত জানা এগরা এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (Egra Agriculture and Rural Development Society) স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সম্পাদক। সংস্থাটির রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল ২০০৫-০৬ সালে। কিন্তু আসল কাজ শুরু হয় ২০১৫ সাল থেকে। এতটা সময় লাগলো কেন? প্রশ্ন করায় তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “বহুদিন থেকেই ইচ্ছা ছিল পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কাজ করার। কিন্তু এই ধরনের কাজ করার জন্য দুটো জিনিস জরুরি। টাকা আর অভিজ্ঞতা। বলতে পারেন, এই দুটি সঞ্চয়ের লক্ষ্যেই কাটিয়েছি বাকি দশ বছর।” একসময় যুক্ত ছিলেন বেশ কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে। পরে বেরিয়ে আসেন তাদের ছত্রছায়া থেকে। কয়েকজনকে নিয়ে শুরু করেন নিজের উদ্যোগ। স্বাধীনভাবে কাজ করার উদ্দেশ্যে। তিনি যোগ করলেন, “আমি কারও নিন্দা করছি না। অনেকেই খুব ভালো কাজ করছেন। নিজের ঢাক পেটানোও উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেকক্ষেত্রে কিছুদিনের ওয়ার্কশপ, সেমিনার হওয়ার পর কাজের কাজ তেমন কিছুই হয় না। এটাও নিজের উদ্যোগে, স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করার একটা কারণ।” তাঁর কাজ মূলত আদিবাসী মহিলা এবং শিশুদের নিয়ে। গুসকরার যাদবগঞ্জ এবং শান্তিনিকেতনের সরপুকুরডাঙাতে গ্রামোন্নয়ন কেন্দ্র আছে। নাম পূর্বিতা। এছাড়াও বাঁকুড়া, মেদিনীপুর-সহ অন্যান্য জেলাতেও কাজ চলে।

আদিবাসী মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী
প্রান্তিক মানুষদের বড়ো সমস্যা অপুষ্টি। গ্রামের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান তিনি। তাঁদের বোঝান সুষম আহারের গুরুত্ব। লকডাউনের সময় চাল, ডাল, আলু, তেল প্রভৃতি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছিল তাদের। বিভিন্ন সবজি গাছের চারা দেওয়া হয় চাষ করার জন্য, যাতে তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনীয় আহার্য নিজেরাই ফলিয়ে নিতে পারেন, উদ্বৃত্ত হলে বিক্রিও করতে পারেন বাজারে।
কী রকমের কাজ হয় তাঁর সংস্থায়? কমলা কান্তবাবু বললেন, “এইসব বাচ্চাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং প্রতিভা-অন্বেষণের মাধ্যমে তাদের দিশা দেখানো, এটাই আমাদের কাজের মূল লক্ষ্য। তার সঙ্গে চলে আদিবাসী মহিলাদের স্বনির্ভর করার কাজ।” এখন গুসকরা আর শান্তিনিকেতন মিলিয়ে তাঁর সংগঠনের তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুদের সংখ্যা প্রায় ১৫০। তাঁর কথায়, “লকডাউনের সময় গ্রামের কিছু আদিবাসী বাচ্চাকে পড়ানো শুরু করেছিলাম। এখন সেই সংখ্যা যে এতটা বেড়েছে, সেটা আমাকে খুব তৃপ্তি দেয়।” প্রাথমিক পাঠদানের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। তাইকোন্ডো, দৌড়, হাইজাম্প, লংজাম্প, ফুটবল, ছবি আঁকা, গান, নাচ, মূকাভিনয় ইত্যাদি। প্রতি বিষয়ের জন্য আছেন আলাদা শিক্ষক। তাঁরা স্থানীয় শিক্ষকদেরই প্রাধান্য দেন। “নাহলে ভাষার একটা ব্যবধান এসে পড়ে। তবে আমরা চেষ্টা করি ওদের বাংলা ভাষার প্রাথমিক পাঠ দেওয়ার। কারণ, স্কুলে ওদের পড়াশোনা করতে হয় বাংলা ভাষাতেই।” প্রতিদিন সকালে বাচ্চাদের জন্য থাকে টিফিনের ব্যবস্থা। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির সহায়তায় মাঝে মাঝে দুপুরের খাবারেরও বন্দোবস্তও করা হয়।

কমলা কান্ত জানার উদ্যোগে বিভিন্ন প্রকার দেশি ধান চাষ
প্রান্তিক মানুষদের বড়ো সমস্যা অপুষ্টি। গ্রামের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান তিনি। তাঁদের বোঝান সুষম আহারের গুরুত্ব। লকডাউনের সময় চাল, ডাল, আলু, তেল প্রভৃতি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছিল তাদের। বিভিন্ন সবজি গাছের চারা দেওয়া হয় চাষ করার জন্য, যাতে তাঁরা নিজেদের প্রয়োজনীয় আহার্য নিজেরাই ফলিয়ে নিতে পারেন, উদ্বৃত্ত হলে বিক্রিও করতে পারেন বাজারে। এইসব চাষ করতে কোনও কীটনাশক বা রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হয় না, স্পষ্ট জানালেন কমলা কান্তবাবু। কিন্তু গ্রামের দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষের কাছে নিজের জমি থাকা তো সহজ নয়। “তাই আমরা এমন ধরনের সবজি চাষ করতে পরামর্শ দিই, যা ফলাতে খুবই কম জায়গা লাগবে। আমাদের মূল উদ্দেশ্য যাতে মানুষগুলো পুষ্টিকর কিছু খাবার, অল্প পরিমাণে হলেও নিজেরাই জুটিয়ে নিতে পারেন,” উত্তর দিলেন কমলা কান্ত জানা। তাঁর সংস্থায় আদিবাসী ও তফসিলি মহিলাদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেলাইয়ের কাজ, বাঁশ-বেতের কাজ, পাথর খোদাই করে মূর্তি তৈরি, নকশিকাঁথার কাজ ইত্যাদি। কমলা কান্ত বলেন, “আমি শুধু কাজ শিখিয়ে তৃপ্ত নই। চাই সেসব কাজ শিখে ওঁরা উপার্জন করুন। কোনও সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়েই আমাদের কাজ শেষ হয়ে যায় না।” প্রতি রবিবার ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প বসে। সেখানে এসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারেন গ্রামের যে কেউ। নিয়মিত বসে বিনামূল্যের বাজার। তার জন্য সবার কাছ থেকে উদ্বৃত্ত জামাকাপড়, জিনিসপত্র সংগ্রহ করা হয়। সেই সব জিনিসপত্র নিজের প্রয়োজন মতো বিনামূল্যে নিয়ে যেতে পারেন এলাকার গরিব মানুষেরা। তবে শুধু গুসকরা আর শান্তিনিকেতনেই নয়, কমলা কান্ত জানা কাজ করেছেন অন্যান্য জায়গাতেও। একসময়ে, বীরভূমের বিভিন্ন ব্লকে মাছ চাষের মাধ্যমে আদিবাসী মহিলাদের সেলফ হেল্প গ্রুপ-কে স্বনির্ভর করে তোলার কাজ করেছেন।

শিশুদের শিক্ষাদান
কমলা কান্ত জানা একজন দেশি ধান সংগ্রাহক এবং দেশি ধান সংরক্ষক। জানালেন, বর্তমানে তাঁর কাছে প্রায় ১৫০ রকমের দেশি ধান আছে, যা নিয়মিত চাষ করা হয়। এইসব ধানের বীজ বিলি করেন চাষিদের মধ্যে। তিনি বললেন, “এগুলো চাষ করতে কোনও ধরনের রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। তাই চাষের পদ্ধতি যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমন এই ধান চাষ করলে জমির উর্বরতারও ক্ষতি হয় না। পাশাপাশি, এদের পুষ্টিগুণও অনেক বেশি। তাই আমরা এই ধান চাষ করতে উৎসাহ দিই চাষিদের। কিন্তু চালকলগুলি এই ধান কিনতে চায় না। কারণ, এই চালগুলিকে কাটিং করা যায় না। আমরা তাও চাষি এবং স্থানীয় ক্রেতা দু-পক্ষকেই সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
অকৃতদার এই মানুষটির নিরলস চেষ্টায় জীবনের অপ্রাপ্তির অন্ধকার থেকে উঠে এসে আলো খুঁজে পাচ্ছেন প্রান্তিক মানুষগুলো। তাঁর শেষ কথায় ঝরে পড়ল প্রতিজ্ঞা, “আমি খুব কষ্ট করে বড়ো হয়েছি। তাই এঁদের জীবনের যন্ত্রণার সঙ্গে কিছুটা হলেও নিজের জীবনকে মেলাতে পারি। সেটা আমার কাজের অন্যতম প্রেরণা। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই কাজ চালিয়ে যাবো, যতই বাধাবিপত্তি আসুক না কেন।”