অসংখ্য জড়ানো পট, ভাঁজ করা পট, ক্যালেন্ডারের মতো ঝোলানো পট…
কমল পাইক উত্তর চব্বিশ পরগনার ‘ছাত্র কল্যাণ বিদ্যাপীঠ’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক। স্কুলটি প্রাইমারি। আশেপাশের গ্রামের ছেলেমেয়েরাই এখানে পড়ে। আগে এই স্কুলে দু’জন মাত্র শিক্ষক ছিলেন, এখন আরো দু’জন যোগ দিয়েছেন। কাজের একটু সুবিধা হয়েছে। কমল পাইক এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। কিন্তু কমল আসলে একজন শিক্ষা-শিল্পী। ওঁর শিল্পীমন ছাত্রদের শুধু পড়া শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পড়া ছবির মতো করে তুলতে কমল গত কয়েক বছরে বানিয়ে ফেলেছেন প্রায় একশোটি নানা মাপের, নানা রঙের ছবিতে পাঠ-সহায়িকা। সারা দেশেই এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় টিচিং এইড, এটা তাই। কিন্তু বাজারে যে সব এইড পাওয়া যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে তৈরি এই সব পাঠ-সহায়িকা।
পটুয়ার যেমন পট, প্রধান শিক্ষক কমল পাইকেরও তেমনি আছে অসংখ্য জড়ানো পট, ভাঁজ করা পট, ক্যালেন্ডারের মতো ঝোলানো পট। অঙ্ক যে এত রঙিন হতে পারে কমলবাবুর এই টিচিং এইড না দেখলে ভাবাই সম্ভব ছিল না। আর এই রঙিন পাঠ সহায়িকা দিয়ে ক্লাসের ছেলে মেয়েরা শিখছে ভাষা, ব্যাকারণ, অঙ্ক নামতা। জলের মতো হয়ে যাচ্ছে রং-ছবির কাগজের কারকুরির লসাগু-গসাগু।
ছোট ছেলেমেয়েদের নামতা, অঙ্কে দক্ষতা আনতে কত সহজ টিচিং এইড বা টিচিং লার্নিং মেটিরিয়াল( টি.এল.এম) যে কমলবাবু নিজে হাতে বানিয়েছেন, তার সংখ্যা গুণে বলা যায় না। এই টি.এল.এম-গুলির প্রতিটি শিক্ষক কমল পাইকের মস্তিষ্ক প্রসূত। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ‘অপ্রয়োজনীয়’ জিনিসপত্র নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন অসাধারণ এক একটি ‘টি এল এম.(teaching learning material)’। দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, ছোটবেলায় এই সব হাতে পেলে আমারও হয়তো অঙ্কের মজাটা জানা হয়ে যেত। ছোট ছেলেমেয়েদের হাতে উনি এনে দিয়েছেন নামতা পড়ার নানা কারিকুরি। ল.সা.গু, গ.সা.গু সহজভাবে শেখার সহজ পদ্ধতিও আছে টি.এল.এম এর সাহায্যে। বিভিন্ন কার্ড ছড়িয়ে দিয়ে প্রাণী জগতের কোন শ্রেণীর জীব সরীসৃপ, কারা উভচর কারা স্তন্যপায়ী প্রাণী নিমেষে বুঝিয়ে দিচ্ছেন ছোটদের। প্রায় ১০০টি টিএলএম তৈরি করেছেন। প্রতিদিনই কিছু কিছু বানাচ্ছেন, খেলাচ্ছলে পড়ানোর জন্য।

কমল পাইক-কে নিয়ে লিখতে বসে, তাঁর সম্পর্কে দুচারটে কথা বলতেই হবে। কমলের মা বেশ কষ্ট করেই ওঁকে বড় করেন, মামাতো দাদার সহযোগিতায় ফ্যাক্টরিতে কাজও পান কমল। ট্রেনিং প্রায় শেষ, পাকা চাকরি প্রায় হাতের কাছে, কিন্তু ছেড়ে দিলেন। ভাল লাগছিল না কলকারখানার পরিবেশ, হাঁপিয়ে যাচ্ছিলেন। পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষক জীবনে চলে এলেন। শুরু হল তাঁর ছাত্রদের মন জয় অভিযান।
ছোটদের পড়াতে গিয়ে বোর্ডে ছবি আঁকা দরকার। কিন্তু শিল্পী মন বলে যে তাঁর আঁকা ঠিক হচ্ছে না, তখন শুরু করলেন এই টি.এল.এম বানানো। আসলে ছোটদের আনন্দপাঠ পড়াতে গিয়ে কমলের মন বলে উঠেছে, তাঁর আঁকা ছবিগুলি ছোটদের মনে স্পষ্ট ধারণা দিচ্ছে না। যে কোনও আদর্শ শিক্ষকের মন খুঁজে বেড়ায় কত সুন্দর ভাবে পাঠকে শিশু মনের উপযোগী করে তোলা যায় – সেই বিষয়টি। এই ভাবনায় কমলের শিল্পী সত্তা বারবার নতুন পথ দেখিয়েছে। কখনও রাখি উৎসবে, কখনও সরস্বতী পুজোতে।

টিএলএম দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। ইন্টারনেট থেকেও ডাউনলোড করা যায়। তবু কমল পাইকের এই প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। গোটা উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন প্রাইমারি স্কুলে সেগুলি নিয়ে ওয়ার্কশপ করান। কমলের তৈরি টিএলএম-এ যেন প্রাণ আছে। কোনও দামি জিনিস দিয়ে নয়, চারদিকের ফেলে দেওয়া, ছড়িয়ে থাকা জিনিস দিয়ে এগুলি তৈরি।

পড়াতে গিয়ে আমরা অনেকেই টি.এল.এম তৈরি করে ক্লাসে যাই, বা যেতে হয়। কিন্তু কমলের এই teaching learning material যেন অন্য কথা বলে। নামতা শেখানোর সহজ পদ্ধতি আমায় বেশ উৎসাহ দিয়েছে। ৪ থেকে শুরু করে ১৯ নামতা বেশ সহজ ভাবে শেখানো হয়েছে। সাদা কাগজের একদিকে সংখ্যা লিখে অন্যদিকে গুণিতক লিখে সুতো বেঁধে বেঁধে কী অসাধারণ ভাবে নামতা শেখানো হচ্ছে, তা বলার কথা নয়। বিভিন্ন ঘরের নামতা। নামতা লিখে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে স্কুলের দেওয়ালে। এর থেকে গ.সা.গু ল.সা.গু শেখানো চলছে। সে এক অভিনব পদ্ধতি। প্রতিদিন কোনও না কোনও নতুন ভাবনা কমলের মাথায় আসছে ছোটদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

সম্প্রতি ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে পাপেট বানিয়ে স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে পথ নাটিকার মতো করে সাড়া জাগিয়েছেন কমল। ছাত্র কল্যাণ বিদ্যাপীঠের শিশুদের নিয়ে প্ল্যাকার্ডে স্লোগান আবৃত্তির মধ্য দিয়ে ডেঙ্গু মশা ছবি আঁকিয়ে অসাধারণ ভাবে চারিদিকের মানুষদের সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেছেন। স্থানীয় পঞ্চায়েত থেকেও উৎসাহ পেয়েছেন এ-ব্যাপারে।
এই ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে ‘শিশু মিত্র’ পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ২০১৬তে পেয়েছিলেন ‘নির্মল বিদ্যালয়’ সম্মান। কেউ যদি প্রশ্ন করে, ‘আপনি এই টিএলএম-গুলি বিক্রি করেন না কেন’? কমল হেসে উত্তর দেন, ‘আমি তো বানাই ছাত্রছাত্রীদের পড়া বোঝাবার জন্য’। অমায়িক এই মাষ্টারমশাইকে আমাদের অভিবাদন।