
ছবি সৌজন্যে: সন্দীপ কুমার
যাত্রাদুনিয়ার অন্যতম প্রধান নাম কাকলি চৌধুরী। ৪০টা বসন্ত পার করে ফেলেছেন। কাজ শুরু করেছিলেন মাত্র পঞ্চাশ টাকা রোজে। এখন যাত্রাদুনিয়ার মধ্যগগনে আসায় খ্যাতি, সাম্মানিক বেড়েছে বহু গুণ। একাধিক দলের প্রস্তাব এলেও কাকলি চান, নিজের পছন্দসই কাজ করতে। কথায় কথায় বলেন, শো না থাকলে বাড়িতে বসে থাকতে ভালোলাগে না। মরশুমে তিনি যেন রাত জাগা পাখি। চোখে ঘুম না থাকলেও দর্শকদের হাততালি, চিৎকার, ভালোবাসাগুলো আজও একই আছে। যাত্রা দুনিয়ায় কাকলি-অনল জুটি হয়ে উঠেছে সুচিত্রা-উত্তম। ‘সেদিন ঠিকানা হারিয়ে’, ‘একদিন রাত্রে’, ‘প্রেমের ঘাটে নৌকাডুবি’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’-সহ আরও মঞ্চসফল প্রযোজনা উপহার দিয়েছেন তাঁরা। বঙ্গদর্শন.কম-এর পক্ষ থেকে সুমন সাধু যোগাযোগ করলেন যাত্রা অভিনেত্রী কাকলি চৌধুরীর সঙ্গে। ভোলেননি শৈশবে সংসারের অভাব, মায়ের হাত ধরে যাত্রায় আসা আর ভৈরব গাঙ্গুলির অবদান। গ্রামবাংলার মানুষ এখনও তাঁকে উজাড় করে ভালোবাসায় ভরিয়ে রেখেছেন। বাকি কথা রইল এই সাক্ষাৎকারে।
—–
যাত্রাজগতে কাকলি চৌধুরী-অনল চক্রবর্তী জুটিকে সুচিত্রা-উত্তম বলা হয়। এত বছর ধরে দর্শকদের এই ভালোবাসা কতটা অনুভব করেন?
প্রচণ্ড অনুভব করি। ওই নিয়েই তো বেঁচে আছি। তবে আমরা কিন্তু নিজেদের উত্তম-সুচিত্রা ভাবি না। ওই তকমাটা আমাদের সাহস জোগায়। কাকলিদি আর অনলদার যাত্রা মানেই একটা অন্য ঘরানা দেখব – দর্শক এখনও এটাই বিশ্বাস করেন। এটুকুই আমাদের প্রাপ্তি। এই ভালোবাসাই আমাদের ভালো কাজের প্রেরণা দেয়।
আপনার যাত্রা জীবনের একেবারে শুরুর দিনগুলোর কথা জানতে চাইব…
১৯৮৬ সালে আমি প্রথম যাত্রা করতে আসি মায়ের হাত ধরে। আমাদের তখন অভাবের সংসার। আমার মা কাজল চৌধুরীও একজন বর্ষীয়ান যাত্রাভিনেত্রী। তখন যাত্রামঞ্চের গুরুত্ব অত বুঝিনি। দুই বছর অভিনয় করার পর ব্যক্তিগত কারণে বসে গিয়েছিলাম। আবার ১৯৮৯ থেকে পুরোদমে যাত্রা করছি, এক বছরও বিশ্রাম নিইনি। যাঁর জন্য আমাকে আজ সারা পশ্চিমবাংলার মানুষ চেনেন, তাঁর নাম ভৈরব গাঙ্গুলি। ভৈরবমামার স্ক্রিপ্টে আমি তেরো বছর কাজ করেছি। তাঁর সমস্ত ইতিহাস তৈরি করা চরিত্রে অভিনয় করেছি। এরপর ভৈরবমামার কলম থেকে বেরিয়ে আমার আর অনলের জুটি তৈরি হল ১৯৯৭ সালে। প্রথম পালাতেই দর্শক আমাদের জুটিটাকে গ্রহণ করে নিল। আর তখন যাত্রাজগৎ বেশ কিছুটা টালমাটালের মধ্যে দিয়েও যাচ্ছিল। বেলাদি ছাড়ার পথে, বীণাদি ক্যারেক্টার রোলে চলে গেলেন… ঠিক নায়ক-নায়িকা বলতে যা বোঝায়, তখন নতুন করে সেটা আর তৈরি হচ্ছিল না। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছিল কাকলি-অনলের জুটি। এ কথা সত্যি যে, এতগুলো বছর আমাকে তৈরি করেছিলেন ভৈরব গাঙ্গুলি, কিন্তু ভৈরব অপেরা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমার আর অনল চক্রবর্তীর জুটি যখন তৈরি হল, তখন মাননীয় উৎপল রায়ের সুপারহিট দুটো পালায় আমরা কাজ করেছিলাম। তারপর থেকে ২৪ বছর অনল চক্রবর্তীর কলমে অভিনেত্রী কাকলি চৌধুরীকে পশ্চিমবাংলা চিনেছে। ২৪টা বছর ধরে অনল আমার জন্য এত ভালো ভালো চরিত্র সৃষ্টি করেছে, আমি সত্যিই আমার নাট্যকারের কাছে কৃতজ্ঞ।
আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগের পৃথিবীটা অতি-আধুনিকতায় মোড়া ছিল না। গ্রাম্য পরিবেশে পালা করতাম। মেদিনীপুরে পালা করতে গিয়ে দেখতাম দূরদূরান্তে কোনো দোকানপাট নেই। এখন তো গ্রামগুলোও সব আধাশহর হয়ে গিয়েছে। এছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন-মানসিকতা পাল্টে গিয়েছে। আমাদেরও সেইমতো নিজেদের বদলাতে হয়েছে। এই পুরো জার্নিটাই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি আমি। কোনোদিন ছুটি থাকলে মনে হয় বয়স হয়ে যাচ্ছে, অথচ শো থাকলে পুরো চাঙ্গা।

অনলবাবুর সঙ্গে জুটিতে এখনও অবধি কতগুলি পালা করেছেন?
২৬ বছর ধরে আমরা প্রায় ৪০-৪২টা পালা করেছি।
অন্য কোনো নায়কের সঙ্গে কাজ করলেন না কেন?
অন্য কারোর সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন হয়নি। অন্য কারোর সঙ্গে অভিনয় করলে মানুষ মেনে নেবেন না। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত হয়তো আমরা একসঙ্গে কাজ করে যাব। কারণ দর্শক এটাই চান।
তরুণ প্রজন্মের কাছে যাত্রা কি একটি ব্রাত্য শিল্প?
ব্রাত্য হলে যাত্রা রমরমিয়ে চলছে কীভাবে গ্রামেগঞ্জে! যাত্রার দর্শক কিন্তু শুধুমাত্র বয়স্করাই নন, প্রচুর তরুণরাও অংশগ্রহণ করে। পাশাপাশি এটাও ঠিক তথাকথিত কিছু শহুরে মানুষ নানান অঙ্গভঙ্গি করে খানিক ব্যঙ্গের ছলেই বলেন ‘বাবাহ্ যাত্রা!…’। এটা শুনতে বেশ খারাপই লাগে।

পাশাপাশি বলব, বর্তমান রাজ্য সরকার পাড়ায় পাড়ায় যাত্রা নিয়ে একটি প্রকল্প চালু করেছিলেন আজ থেকে তিন বছর আগে। যার কল্যাণে কলকাতাতেও যাত্রা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নতুন করে। বাগবাজারের ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ মঞ্চে প্রতিবছর আমরা প্রচুর শো করি। কিন্তু হ্যাঁ, কোথাও কোথাও যাত্রাকে এখনও অছ্যুৎই ধরা হয়। যাত্রায় মেলোড্রামা থাকবে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আবার যাত্রা মানেই যে মেলোড্রামা তাও কিন্তু নয়। সেই জায়গা থেকে যাত্রা বেরিয়ে গিয়েছে, যাত্রা অনেক আধুনিক হয়েছে, সমসাময়িক হয়ে উঠেছে। আমি আর অনলদা দায়িত্ব নিয়ে যাত্রাকে সমসাময়িক করে তোলার চেষ্টা করেছি। এবং এতে অন্যান্য অভিনেতাদেরও অবদান রয়েছে। মঞ্চে অবাস্তব জিনিসপত্র হলে তরুণরা যাত্রা দেখতে আসবেই বা কেন!
যাত্রায় মেলোড্রামা থাকবে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আবার যাত্রা মানেই যে মেলোড্রামা তাও কিন্তু নয়। সেই জায়গা থেকে যাত্রা বেরিয়ে গিয়েছে, যাত্রা অনেক আধুনিক হয়েছে, সমসাময়িক হয়ে উঠেছে।
সিনেমা, থিয়েটার সবেতেই আমূল বদল এসেছে। শিল্পের ভাষা বদলেছে, আঙ্গিক বদলেছে। যাত্রায় কী কী বদল এল?
আগের মতো চারদিক খোলা মঞ্চেও যাত্রা হয়, আবার কেউ কেউ পিছনে একটা ব্যাকড্রপ দেন। আমরা যেমন পিছনে ব্যাকড্রপ দিতেই পছন্দ করি, কারণ মঞ্চের চারদিকে লোক আর আগের মতো বসেন না। তাছাড়া সাউন্ডে একটা বড়োসড়ো পরিবর্তন এসেছে। আগে মঞ্চের মাঝে একটা ক্যাচার থাকত, সাউন্ডের কোয়ালিটিও ভালো ছিল না। ফলে অভিনয় করতে গিয়ে চেঁচাতে হত। এখন তো মঞ্চে প্রায় ফিসফিস করে সংলাপ (হিসিং ডায়ালগ) বলি আমরা। ফলে যাত্রা বাস্তবমুখী হতে পেরেছে।

অর্থাৎ যাত্রা মানেই এখন আর জোরে চিৎকার নয়…
না, একদমই নয়। আমি আর অনল ন্যাচারাল অ্যাকটিং-এ বিশ্বাসী। আর স্ক্রিপ্টকে সমসাময়িক করার চেষ্টা করি। যাত্রা এখন অনেক আধুনিক হয়ে উঠেছে।
তরুণ প্রজন্ম কি আদৌ যাত্রামুখো?
সারা পশ্চিমবাংলায় এখনও কিন্তু ৩৫০-র উপর দল আছে। উদাসীন ঠিক বলব না। হ্যাঁ, যাত্রার মঞ্চ নতুন ছেলেমেয়েদের রাতারাতি বিখ্যাত করে না। তবে একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, অনেক নতুন অভিনেতারা যাত্রায় কাজ করতে আসছেন। তরুণরা না এলে কোনো শিল্পই বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখা যায় না। তাঁদের কয়েকজন খুব ভালো কাজও করছেন। আমার সঙ্গে কাজ করেছিলেন এমন একজন, যিনি আজ অন্য দলে প্রধান চরিত্র হয়ে কাজ করছেন। তরুণদের আমরা সবসময় স্বাগত জানাচ্ছি। তাছাড়া যাত্রায় এখন টিকিট বিক্রির সংখ্যা কমে গেছে, ফ্রি টিকিটের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। তার নানবিধ কারণও রয়েছে। অন্য একদিন বলব না হয়!
কলকাতার প্রাচীন ও একমাত্র যাত্রাপাড়া চিৎপুর। সেখানে যাত্রাদলগুলো কি আগের মতো হইহই করে চলছে?
কোভিডের পর এবছর যাত্রার বাজার খুবই ভালো। আমার এখনও পর্যন্ত ৮৩ নম্বর রজনী হয়ে গেল। যেখানে গত বছর সারা মরশুমে ৮২ রজনী হয়েছিল। কোভিডের বছর সারা মরশুমে ৫২ রজনী হয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এবছরের পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে যে যাত্রা আগের চেয়ে আশাপ্রদ।

যাত্রায় আপনার এত বছর হয়ে গেল। পুরোনো দর্শকরা কি এখনও আপনার শো দেখতে আসেন? তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথাবার্তা হয়?
হ্যাঁ, প্রতিনিয়ত কথাবার্তা হয়। মঞ্চ থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে বলেন, দিদি আপনার ওই পালাটা দেখেছিলাম, ওটা আবার করুন। সবার সব কথা তো মানা যায় না। তাঁরা আবেগতাড়িত হয়ে কথাগুলো বলেন। আজ থেকে ২৫ বছর আগে আমি যে চরিত্র করতাম, এখন নিশ্চয় তা পারব না বা করব না। এখন বয়স হয়েছে। তাই বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চরিত্রই বেশি করে করব। একটা জিনিস মানতে হবে, দর্শকদের জন্যই আমরা টিকে আছি। তাঁরা যদি এখনও না চাইতেন, তাহলে মঞ্চে আমায় দেখা যেত না।
২৪ বছর অনল চক্রবর্তীর কলমে অভিনেত্রী কাকলি চৌধুরীকে পশ্চিমবাংলা চিনেছে। ২৪টা বছর ধরে অনলদা আমার জন্য এত ভালো ভালো চরিত্র সৃষ্টি করেছে, আমি সত্যিই আমার নাট্যকারের কাছে কৃতজ্ঞ।
তরুণ অভিনেতা এখন অনেকেই যাত্রায় কাজ করতে আসছেন। তাঁদের ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল বলে মনে হয়? এবং নতুন প্রজন্ম কেন যাত্রায় কাজ করতে আসবেন?
কোভিডের পরে যাত্রা ইন্ডাস্ট্রির ছবিটা পাল্টে গিয়েছে। সমস্ত শিল্পীদেরই আপোষ করে প্রযোজকদের পাশে দাঁড়াতে হয়েছে। তার মধ্যেই পেট ভরিয়ে নেবার চেষ্টা করেছেন কিছু শিল্পী। সামথিং ইজ বেটার দ্যান নাথিং – এই মানসিকতা নিয়েই আমরা লড়াই করেছি। আর নতুনদের মধ্যে যারা জুনিয়ার আর্টিস্টের কাজ করছে, তাঁরা নিশ্চয় ভালো পারিশ্রমিক পাবে না। কিন্তু তাঁরা যদি একবার দর্শকদের নজরে চলে আসেন, তাহলে প্রযোজক দায়িত্ব নিয়ে তাঁকে ভালো চরিত্রের প্রস্তাব দেবেন। এমন উদাহরণ প্রচুর আছে। পুরোটাই নির্ভর করছে তুমি কেমন কাজ করছ তার উপর।

