জে এস মহম্মদ আলী : কলকাতার ১১৪ বছর পুরোনো ‘ফ্যাব্রিক’ প্রতিষ্ঠান

হানায়ক থেকে মানিকবাবু, ক্রিকেটার থেকে সেনানায়ক, জামা-প্যান্ট-স্যুটের কাপড়ের জন্য সকলের ভরসার নাম জে এস মহম্মদ আলী (JS Mohamedally)। শতবর্ষ প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠানটি দাঁড়িয়ে রয়েছে ধর্মতলার চৌরঙ্গী স্কোয়্যারে (K. C. Das থেকে কয়েকটা দোকান পরে), ১৯০৯ সালে যার পথ চলা শুরু। ‘রেডিমেড গার্মেন্টস’-র যুগে আজও ‘ফ্যাব্রিক’ অর্থাৎ জামা-প্যান্টের কাপড়ের ক্ষেত্রে কলকাতার ‘একা কুম্ভ’ বলা চলে দোকানটিকে। গত শনিবার দোকানটিতে গিয়ে দেখি, ভরদুপুরেও ভিড়। কথা হচ্ছিল প্রতিষ্ঠানের অন্যতম অংশীদার মহম্মদ জঈনুদ্দীনের সঙ্গে। তিনি চতুর্থ প্রজন্ম, জানালেন তাঁদের পঞ্চম প্রজন্মও ব্যবসায় এসে গিয়েছে।

“গুজরাত থেকে কলকাতায় এসেছিলেন জিবাজী শেখ মহম্মদ আলী (জিবাজী শেখ মহম্মদ আলীর নামেই দোকান, জে এস মহম্মদ আলী) এবং তাঁর ভাই মোল্লা আব্দুল হোসেন। ১৯০৯ সালে তাঁরা ব্যবসা শুরু করেন। দুই ভাই, তাঁদের ভাইপো শেখ আব্দেলী সারাফ আলীকেও সঙ্গে নেন। দুই কাকা ছিলেন মধ্যবয়সী, ভাইপোটি যুবক। তিনজন মিলে ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে দোকানটি ছিল আর্মেনিয়ান স্ট্রিটে, ২০০ বর্গ ফুটের ছোট্ট দোকান। সেখান থেকে ১৯৩০ নাগাদ দোকানটি রাধাবাজার স্ট্রিটে উঠে যায়। তারপর ১৯৩৮ সালে আমরা এখান চলে আসি (ধর্মতলা), তখন থেকে অদ্যাবধি এখানেই দোকান রয়েছে। আমরা এক ইংরেজ ভদ্রলোকের থেকে এই জায়গাটি কিনেছিলাম। তখন ব্রিটিশ আমল। এখানে কোনও এক ব্রিটিশ কোম্পানির অফিস ছিল। যখন তারা অফিস বন্ধ করে দেয়, ইংরেজ ভদ্রলোক আমাদের জমিটি কিনে নিতে বলেন। আমার প্রপিতামহ বলেন, এই জায়গাটা আমাদের জন্য অনেক বড়ো। ১২০০ বর্গ ফুটের দোকান থেকে এখানে! উত্তরে ইংরেজবাবু  বলেছিলেন, একদিন এমন সময় আসবে; এত বড়ো জায়গাও আপনাদের জন্য কম পড়বে। তাঁর সেই কথাই সত্যি হচ্ছে।” বঙ্গদর্শন.কম-কে একেবারে গোড়ার কথা জানালেন মহম্মদ জঈনুদ্দীন।


জে এস মহম্মদ আলী’র পুরোনো বিজ্ঞাপন

প্রায় ১১৪ বছর যাবৎ তাঁরা মানুষকে উৎকৃষ্ট মানের কাপড় সরবরাহ করে যাচ্ছেন। জঈনুদ্দীন জানাচ্ছিলেন, তাঁরা ভারতের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কাপড় কেনেন। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কাপড় পাওয়া যায় জে এস মহম্মদ আলীতে, ভারতের সব বিখ্যাত ব্র্যান্ডের কাপড়ও রয়েছে। তাঁদের গ্রাহক বলতে মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তরা। ‘কাস্টমার’ প্রসঙ্গে  তিনিই জানাচ্ছিলেন, প্রধানত কলকাতার মানুষজনই তাঁর ক্রেতা। এছাড়াও বাংলার নানান প্রান্তের মানুষরা আসেন। আসানসোল, বর্ধমানের মানুষরা আসেন। বাংলার বাইরে থেকে ধানবাদ, বিহার, পাটনা থেকেও ক্রেতারা আসেন। পুরোনো ক্রেতারা তো আসেনই পাশাপাশি নতুন নতুন ক্রেতারাও বিপুল সংখ্যায় আসছেন।

 

জে এস মহম্মদ আলী

সত্যজিৎ রায় থেকে উত্তমকুমার, এমন অনেক ব্যক্তিত্বই এই দোকানে আসতেন। জামা, প্যান্ট, স্যুটের কাপড়ের জন্য তাঁদের ভরসা ছিল জে এস মহম্মদ আলী। দোকানের বিখ্যাত ক্রেতাদের প্রসঙ্গে জঈনুদ্দীন জানাচ্ছিলেন, “আমাদের সেলিব্রিটি কাস্টমারদের মধ্যে রয়েছেন ভুটানের মহারাজা, ক্রিকেটার সেলিম দূরানী, ঊষা উত্থুপ, শর্মিলা ঠাকুর, নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট টিম, উত্তমকুমার, সত্যজিৎ রায়, বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড় নরেশ কুমার, তাঁর স্ত্রী বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সুনীতা কুমার। এছাড়াও ক্রিকেটার অরুণলাল, জেনারেল স্যাম মানিক’শ। সত্যজিৎ রায়, উত্তমকুমার এঁদের আমি দেখিনি কিন্তু শুনেছি তিনিও কাপড় কিনতে আসতেন। আমি শর্মিলা ঠাকুর, ঊষা উত্থুপকে দেখেছি। এখনও তাঁরা আসেন, কাপড় নেন। একবার কলকাতায় খেলতে এসে গোটা নিউজিল্যান্ড টিম দোকানে এসেছিল। বর্তমান রাজ্যপাল সহ বাংলার অন্যান্য রাজ্যপালরা আমাদের দোকান থেকে ফ্যাব্রিক কিনেছেন। আমি শুনেছি দাদার (সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়) টেলর এখান থেকেই তাঁর জন্য কাপড় কেনেন। দাদা কখনও নিজে আসেননি।”

বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য’র ইতিহাস সুপ্রাচীন, মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে বাংলার বণিকদের কথা উল্লেখ রয়েছে। সাহেবরা বঙ্গদেশে ব্যবসা করতেই এসেছিল। সপ্তদশ থেকে বিংশ শতকের গোড়া অবধি ভারতের বাণিজ্যের ঘাঁটি ছিল বাংলা… জে এস মহম্মদ আলীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলা-বাণিজ্যের গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।

জে এস মহম্মদ আলী’র পরবর্তী প্রজন্মের হাতে উঠে এসেছে একাধিক পুরস্কার

আপাতত তাঁদের একটিই প্রতিষ্ঠান। কোনও শাখা নেই। সম্প্রতি তাঁরা পাশেই আরেকটি দোকান নিয়েছেন, সেখানে ইন্টেরিয়রের কাজ চলছে। সেখানে সেমি রেডিমেট, কাস্টমাইজেশন, টেলরিং রাখবেন বলে ভাবছেন জঈনুদ্দীন। বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্য’র ইতিহাস সুপ্রাচীন, মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে বাংলার বণিকদের কথা উল্লেখ রয়েছে। সাহেবরা বঙ্গদেশে ব্যবসা করতেই এসেছিল। সপ্তদশ থেকে বিংশ শতকের গোড়া অবধি ভারতের বাণিজ্যের ঘাঁটি ছিল বাংলা, কালের নিয়মে আজ যা অনেকটাই ম্লান। কিন্তু জে এস মহম্মদ আলীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলা-বাণিজ্যের গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।

ছবি: শৌভিক রায়, মহম্মদ জঈনুদ্দীন

Written by