
গ্রাম থেকে শহর, অলিগলি পাকস্থলি জুড়ে একটাই আলোচনা – SIR, কে নাগরিক থাকবে আর কাকে বিদেশি তকমা নিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। তারই মাঝে একদল দুষ্টু লোক বের হয়েছে বুমহাতে বাংলাদেশি খুঁজতে, নাগরিকত্বের ঠিকা নিয়ে। কাগজ থাকলেই নাগরিক, কাগজ না থাকলে… কিন্তু কে এই নাগরিক? শুধু (তথাকথিত) নগরসভ্যতার বুকে কতগুলো ভোট দিয়ে নিজেদের শোষণযন্ত্রের নির্মাণ বিনির্মাণ যারা করেন তারাই নাগরিক? আর আমাদের চারপাশে এই যে এত গাছপালা, পশুপাখি, এত সবুজ, এত কিচিরমিচির, এত প্রাণোচ্ছলতা, এত প্রাণের স্পন্দন তারা কি নাগরিক হয়ে উঠতে পারে? পারে না, কারণ? কারণ তারা ভোট দেয় না। (দেবলীনা মজুমদারের তথ্যচিত্র জিলিপিবালার বন্ধুরা)

একরত্তি জিলিপিবালা যেমন বড়ো হচ্ছে একটু একটু করে তার পিসির সঙ্গে প্রকৃতিকে চিনতে চিনতে, একইসঙ্গে সে দেখছে সেই দুষ্টু লোকগুলোর কাণ্ডকারখানা। তারা দলবল নিয়ে এসে, এক একটা গাছের গলা চিরে রক্ত বের করে দিচ্ছে। সে রক্ত দেখে জিলিপিবালার ভয় লাগে, সে ছুঁতে ভয় পায় সেই ক্ষতস্থান। আর সঙ্গে দেখে চারপাশের নানান পশুপাখির ভয়কে।
৩১তম আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতীয় তথ্যচিত্রের প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে প্রদর্শিত ‘জিলিপিবালার বন্ধুরা’ (Friends Of Jilipibala)-র মধ্য দিয়ে সেই নাগরিক হয়ে উঠতে না পারা প্রাণগুলোর কথাই যেন আমাদের কাছে তুলে দিলেন পরিচালক দেবলীনা মজুমদার। জিলিপিবালা একজন একরত্তি শিশু। সিনেমার শুরুতে আমরা তাকে খুঁজে পাই তার পিসির (পরিচালক) সঙ্গে সে প্রকৃতিচেনার খেলায় নেমেছে। এ দৃশ্য হয়তো আমার মতো আরও অনেককেই আবেগমথিত করেছে, অন্তত যারা আমার মতোই দাদু-ঠাকুমা-পিসি-মাসির কাছে ব্যঙ্গমা ব্যঙ্গমী থেকে শুরু করে কপোত কপোতীর গল্প শুনতে শুনতে বড়ো হয়েছে। সন্ধ্যা হলে পড়াশোনা শেষ করেই শুরু হয়ে যেত আমাদের গল্পের আসর, সে গল্পের ইতি ঘটে যেত কিন্তু নটে গাছটা আর মুড়িয়ে উঠতে পারত না। আর এভাবেই শিশুমনের গভীরে খুব অজান্তেই, কোন অচেনা মায়াবলে প্রকৃতি পাঠের চেতনা জায়গা করে নিত। দাদু কিংবা ঠাকুমার সঙ্গে আমগাছ পুঁততে পুঁততে কখন যে সেই আমগাছ আমাদের জীবনে প্রখর রোদের পাশে এক টুকরো ছায়ার মতো জায়গা করে নিত ধরতেই পারতাম না। পরিচালক দেবলীনার এই সিনেমা সেসব স্মৃতিকে নাড়া দেয়। (দেবলীনা মজুমদারের তথ্যচিত্র জিলিপিবালার বন্ধুরা)
একটা গাছ শুধু শিকড় বিস্তার করে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাণযুক্ত জড় নয়, তার সেই শিকড়ের জালে থাকে ইতিহাসের গল্প, নানান হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি যা হতেই পারত অসাধারণ কিন্তু হয়ে ওঠা হয়নি আর। গাছকে আমরা চিরকালই খুব ভোগবাদী ভাবনার জায়গা থেকেই দেখে এসেছি। সমগ্র প্রকৃতিকেই। ঠিক যতটুকু অক্সিজেন, যতটুকু কাঠ, যতটুকু ছায়া পেলে একটি গাছ অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠতে পারে, হয়ে উঠতে পারে জীববৈচিত্রের রসদ, ততটুকুর বাইরে আমরা প্রকৃতিকে কোনোদিন চিনতেই চাইনি, চিনতে শেখাইওনি। তাই একটি গাছ যে কোনো ভোগের বস্তুর বাইরে গিয়েও একটি ইতিহাসের দলিল হতে পারে তা বুঝে উঠতে পারিনি। অনায়াসেই উন্নয়নের নামে তার গলায় কোপ বসাতে আমাদের দ্বিধা হয়নি। সেরকমটাই ঘটছিল দক্ষিণ কলকাতার বিদ্যাসাগর কলোনিতে স্বাধীনতা সংগ্রামী পারুল মুখার্জির পুঁতে যাওয়া একটি সুবিশাল তেঁতুল গাছের প্রতিবেশীদের সঙ্গে। যে তেঁতুল গাছকে বাঁচাতে মরিয়া পরিচালক ও তার কিছু প্রতিবেশী। আর জিলিপিবালা। একরত্তি জিলিপিবালা যেমন বড়ো হচ্ছে একটু একটু করে তার পিসির সঙ্গে প্রকৃতিকে চিনতে চিনতে, একইসঙ্গে সে দেখছে সেই দুষ্টু লোকগুলোর কাণ্ডকারখানা। তারা দলবল নিয়ে এসে, এক একটা গাছের গলা চিরে রক্ত বের করে দিচ্ছে। সে রক্ত দেখে জিলিপিবালার ভয় লাগে, সে ছুঁতে ভয় পায় সেই ক্ষতস্থান। আর সঙ্গে দেখে চারপাশের নানান পশুপাখির ভয়কে। নিজেদের থাকবার জায়গা কেড়ে নিয়ে কেউ যদি বলে “কাগজ দেখাও, নইলে পালাও” তখন ঠিক যতটা ভয় লাগে, ততটা ভয়। তারা জিলিপিবালার বেড়ে ওঠার সঙ্গী, তারাই আসলে জিলিপিবালার বন্ধুরা। (দেবলীনা মজুমদারের তথ্যচিত্র জিলিপিবালার বন্ধুরা)

জল্লাদের মতো দুষ্টু সব ‘করাত’ এসে এক একটা গাছের বুক চিরে দেয় আর গাছে বসা প্রতিটি পাখির মানসিক টানাপোড়েন যেন আমরা দেখতে পাই। অনুভব করতে পারি তাদের ঘর হারাবার দুশ্চিন্তাকে। চলচ্চিত্র সম্পাদনার সুনিপুণ কৌশলে সেই মানসিক টানাপোড়েনকে তুলে ধরার এমন উদাহরণ ভূয়সী প্রশংসার দাবি রাখে, সম্পাদক রফিনা খাতুন সেই প্রশংসার দাবিদার। প্রশংসার দাবিদার সব্যসাচী পাল ও মেঘ ব্যানার্জি যাঁরা সেই ভয়কে শব্দের জাদুর মাধ্যমে দর্শকের কাছে জীবন্ত করে তুলেছেন। আর ভয় পাওয়াটাও খুব জরুরি কারণ ধ্বংসের উন্মত্ততা, উন্নয়নের পাগলামি যে কোন পর্যায়ে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে তা সাম্প্রতিককালের যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের দিকে নজর দিলেই সহজে অনুধাবন করা যাবে। (দেবলীনা মজুমদারের তথ্যচিত্র জিলিপিবালার বন্ধুরা)
জিলিপিবালা তার বেড়ে ওঠার পথে যেভাবে প্রকৃতিপাঠের শিক্ষা নিয়ে বড়ো হচ্ছে, যেভাবে এক টুকরো আমগাছের চারা হাতে নিয়ে সে তার নিষ্পাপদৃষ্টিতে ক্যামেরার দিকে তাকায় সেই দৃষ্টি আসলে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা নিয়ে গর্ব করতে থাকা উন্নয়নকামী সমাজকে অনেকখানি প্রশ্নের সম্মুখীন করে। দিনের পর দিন আমরা একটু একটু করে প্রকৃতির থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করেছি। বিচ্ছিন্ন হতে হতে আজ আমরা এমন দিনের কাছে এসে ঠেকেছি যেখানে আমরা প্রকৃতিকে আর আমাদের জীবনের অংশ ভাবতেই পারছি না।

চলচ্চিত্র সম্পাদনার সুনিপুণ কৌশলে সেই মানসিক টানাপোড়েনকে তুলে ধরার এমন উদাহরণ ভূয়সী প্রশংসার দাবি রাখে, সম্পাদক রফিনা খাতুন সেই প্রশংসার দাবিদার। প্রশংসার দাবিদার সব্যসাচী পাল ও মেঘ ব্যানার্জি যাঁরা সেই ভয়কে শব্দের জাদুর মাধ্যমে দর্শকের কাছে জীবন্ত করে তুলেছেন।
আর ঠিক সেই কারণেই কোনো জঙ্গল ধ্বংসের খবর আমাদের নাড়া দেয় না। নাড়া দেয় না সেখান থেকে ভেসে আসা ময়ূরের কান্না কারণ আমরা কখনোই জিলিপিবালার মতো তাদের বন্ধু ভাবতে পারিনি, ভাবতে শেখাইওনি। টেক পার্কের নকল দুনিয়ার হাতছানি আমাদের অনেক বেশি আনন্দ দেয়, আমরা মোহগ্রস্ত হই। সে মোহের নাগপাশে নিজেদের ভালো থাকাকে জলাঞ্জলি দিই তবুও জিলিপিবালার নিষ্কলঙ্ক মন নিয়ে প্রশ্ন করতে পারি না। কারণ আমাদের ভালো থাকার চাহিদা আমাদের প্রশ্ন করার অভ্যাসকে কখন আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে, নিজেরাই জানি না।
অধ্যাপক মনোবিদ মাইলস রিচার্ডসন একটি গবেষণাপত্রে লিখেছিলেন, যে মানুষ যতবেশি প্রকৃতির কাছে থাকে সে ততবেশি নিজেদের আপন সত্তাকে আবিষ্কার করেন, তাত্ত্বিক ভাষায় যাকে বলে Eudemonic Wellbeing। অপরদিকে মানুষ যখন এই দীর্ঘস্থায়ী ভালো থাকাকে দূরে ঠেলে ক্ষণিকের আনন্দ নেওয়ায় অনেক বেশি মত্ত হয়ে ওঠে (মনোবিদ্যায় যাকে বলে Hedonic Wellbeing), তখন নিজের প্রকৃত ভালো থাকার রাস্তা আর খোঁজা হয়ে ওঠে না। একটু ভাবলেই বোঝা যায়, ভোগসর্বস্ব সমাজব্যবস্থা আসলেই মানুষকে দ্বিতীয়টিতে মনোনিবেশ করতে শেখায়।
পরিচালক দেবলীনার এই তথ্যচিত্র আসলে জিলিপিবালার চোখ দিয়ে আমাদের Eudemonic Wellbeing-এর স্বপ্ন দেখাতে চায় আসলে। জিলিপিবালা তার আধো আধো স্বরে আমাদের সেই কথাগুলোই বলতে চায় যা আমরা হাজার কেতাবি পাঠ পড়েও আজও শিখে উঠতে পারলাম না এই পৃথিবীটা শুধু আমাদের একার নয়, এই পৃথিবীটা ওই তেঁতুল গাছটারও। এই পৃথিবীটা ওই হনুমানটারও। এই পৃথিবীটা ওই শালিক, চড়াই, কাঠঠোকরা সকলের। সিনেমার শেষে তাই দেবলীনা সকলের নামোল্লেখ করতে গিয়ে তাদেরও নাম নেন যারা ভোট দেয় না, যাদের SIR লিস্টে কোনোকালেই নাম উঠবে না, কিন্তু যাদের অস্তিত্ব না থাকলে পৃথিবীর কোনো ভোটেই আর বোধহয় কেউ দাঁড়াতে পারবে না। তারা ভোট দিতে নাই পারুক, জিলিপিবালার মতো আমাদের বন্ধু তো হতেই পারে। কারণ, বন্ধু বিনে যে প্রাণ বাঁচে না…

