শেষবারের মতো মাঠে নামছেন বিশ্বকাপের সর্বাধিক উইকেটের মালিক ঝুলন গোস্বামী

‘আগুনপাখি’ ঝুলন গোস্বামীর মেগাসফর

হাতে মাত্র দিন পাঁচেক। খেলা শেষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও নিজের সেরাটা দেখিয়ে দিলেন ক্রিকেটার ঝুলন গোস্বামী (Jhulan Goswami)। প্রতিবারের মতো এবারও দর্শক সাক্ষী থাকলো একটি ঝোড়ো ইনিংসের। গত রবিবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দশ ওভারে ঝুলন দিলেন মাত্র ২০ রান, তার মধ্যে দুটি মেডেন। নিয়েছেন একটি উইকেটও। ঝুলনের বলে এল.বি হলেন ইংল্যান্ডের ওপেনার ট্যামি বিউমন্ট। বাঙালি কন্যার দাপুটে বোলিংয়ের সামনে সেদিন যেন নিমেষে উড়ে গেল ইংল্যান্ডবাহিনী।

ভারতীয় বোলারদের মধ্যে সেরা ইকনমি ঝুলনেরই। ওয়ানডে, টেস্ট ও আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেট মিলিয়ে মোট ২৮১টি ম্যাচে ৩৫২টি উইকেট নিয়েছেন ঝুলন।

চলতি ইনিংসটিই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঝুলনের শেষ সফর। দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দাপিয়ে খেলেছেন ঝুলন। ২০০২ সালে জানুয়ারিতে চেন্নাইয়ের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম খেলতে নেমেছিলেন তিনি, এতগুলো বছর পার করে এসে আবারও সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই শেষ ম্যাচ। আগামী শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, লর্ডসে নীলরঙা জামাটায় শেষবারের মতো বল হাতে দেখা যাবে ঝুলনকে।

ঝুলন গোস্বামী, যেন এক আগুনপাখি। দলকে তিনি দিয়েছেন অনেককিছু। ভারতীয় বোলারদের মধ্যে সেরা ইকনমি ঝুলনেরই। ওয়ানডে, টেস্ট ও আন্তর্জাতিক টি-২০ ক্রিকেট মিলিয়ে মোট ২৮১টি ম্যাচে ৩৫২টি উইকেট নিয়েছেন ঝুলন। মাস পেরোলেই চল্লিশে পা দেবেন তিনি। অথচ এখনও একইরকম রাজকীয় ভূমিকায় ৫০টা ওভার জুড়ে মাঠে দাপিয়ে বেড়ালেন তিনি।

১৯৯২ সাল, ওয়ার্ল্ড কাপ (World Cup) ক্রিকেট নিয়ে চারদিকে যখন জোর তর্জা, ঝুলনের বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। সেই সময় থেকেই ক্রিকেটের প্রতি প্রাথমিক ঝোঁক। তাঁর বয়সী অন্য মেয়েরা যখন লুকোচুরি, কানামাছি, কিত্‌কিত্‌ অথবা রান্নাবাটি খেলা নিয়ে মত্ত, ঝুলন তখন ছেলেদের সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিচ্ছে মাঠে। ছোটোবেলা থেকেই সে মাঠের মেয়ে। ক্রিকেটকে কোনোদিনই ‘পুরুষদের খেলা’ বলে ভাবেননি। এই শিক্ষা তাঁর পরিবার তাঁকে দিয়েছে। নিরন্তর জীবন সম্পর্কে বোধ তাঁকে শিখিয়েছে খেলার যেমন কোনো জাত-ধর্ম হয় না, তেমন লিঙ্গও নেই। ঘরোয়া মাঠের মেয়ে পরিচিতি নিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। ঠিক করেছিলেন পেশাদারি ক্রিকেট (Cricket) খেলবেন। লড়াইয়ের শুরু হয়েছিল ঠিক এভাবেই। সমাজের তথাকথিত ‘মেয়েলি’ তকমা ঝেড়ে ফেলে ডানপিটে, খেলুড়ে হয়ে ওঠার লড়াই। নদিয়ার চাকদহের মতো মফস্‌সলে এ ঘটনা তখন বিরল। কঠিন লড়াই, কিন্তু সাহসের অন্ত ছিল না বাংলার মেয়ের। স্কুলে পড়ার বয়স থেকেই চাকদহ-কলকাতা ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে বিবেকানন্দ পার্কে কোচ স্বপন সাধুর কাছে শুরু করেন প্রথাগত ট্রেনিং।

চাকদহের (Chakdaha) বাবুল থেকে আজকের ‘দ্য ঝুলন গোস্বামী’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে একদিকে ছিল অদম্য জেদ, অন্যদিকে স্বপ্নপূরণের খিদে। ঘরোয়া ক্রিকেট ম্যাচ থেকে বিশ্বকাপের ২২ গজ, সবেতেই দুরন্ত পারফরমেন্স দিয়েছে ঝুলন গোস্বামী। ঝুলনের উপস্থিতি দলকে চিরকাল ভরসা জুগিয়েছে। বিপক্ষকে ভয় পাইয়েছে। অদ্ভুত এক রসায়ন তাঁর, বিন্দুমাত্র ছন্দপতন ঘটেনি তাতে। এমনকি শেষবার হ্যামিলটন বিশ্বকাপ খেলতে নেমেও নতুন জয়ের নজির গড়েছেন তিনি। মেয়েদের ওয়ান ডে বিশ্বকাপে সব থেকে বেশি উইকেটের দাবিদার হয়েছেন ঝুলনই।

রোহিত শর্মা সম্প্রতি একটি সাংবাদিক বৈঠকে বারবার প্রশংসা করেছেন ঝুলনের বোলিং-এর। তিনি ঝুলন গোস্বামীর বিদায়ী সিরিজ প্রসঙ্গে বলেছেন, বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ক্রিকেট আকাদেমিতে তাঁকে করা ঝুলনের ইনস্যুইং সামলানো বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

চাকদহের ফ্রেন্ডস ক্লাব আর নবারুণ সমিতির মাঠ থেকে ক্রিকেট শুরু করে ঘরোয়া, আন্তর্জাতিক, বিশ্বকাপ সবেতেই ভারতের মহিলা ক্রিকেট টিমের আইকন যে ঝুলন গোস্বামী, তাঁর অবসরের প্রাক্কালে মাঠে ময়দানে এখন টানটান উত্তেজনা। ৪০ বছর বয়সেও যেরকম দুরন্ত ফর্মে তিনি বারবার ধরা দিচ্ছেন শেষ সিরিজে, তা যে আগামী প্রজন্মের কাছে শুধু দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে তাই নয়, পাশাপাশি উৎসাহ জোগাবে অনেক নতুন খেলুড়েদের। আগামী শনিবারের দিকে তাকিয়ে বাংলা। এদিন বাংলার ধন্যি মেয়ে কি পারবে শেষবারের মতো আগুন চোখে জ্বলে উঠতে? সময়ই কথা বলে।

Post Tags
Developed by DXDasia