এই হোটেল মাংস বলতে শুধুই বোঝে খাসির মাংস
মাটিতে বসে কলাপাতায় বা কাঁসার থালায় গরম গরম ভাত খাওয়া হাপুস হুপুস নয়নে। তার পাশে সুন্দর করে রাখা আছে মাটির ভাঁড়ে জল। সমগ্র কলকাতার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে রয়েছে বহু পুরোনো পাইস হোটেল। ইংরেজরা পয়সাকে বলত পাইস। এক আনার চার ভাগের এক ভাগ হল পাইস। এই পয়সার বিনিময়ে সে যুগে পাওয়া যেত এক থালা ডাল, ভাত, মাছ। দোকানে ঢুকতেই দেখা যাবে বড়ো একটা সাইনবোর্ড। সেই সাইনবোর্ডে আপনার চোখ আটকে যেতে বাধ্য। কারণ কলকাতার বুকে ওড়িয়া ভাষার ব্যবহার বিরলই বটে। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ওড়িয়াতে লেখা রয়েছে জগন্মাতা হোটেল। একসময় ওড়িশা থেকে থেকে কলকাতার বুকে ব্যবসা করতে এসেছিলেন বিকলচন্দ্র দাস। তারপর বংশপম্পরায় চলছে এই হোটেল। বর্তমান মালিক গঙ্গাধর দাস।

উত্তর কলকাতার কৈলাশ বোস স্ট্রিটের জগন্মাতায় আজও খাবার পরিবেশন করা হয় কাঁসার থালা এবং কলাপাতায়। মাটিতে আসন পেতে বাবু হয়ে বসে খাওয়ারও ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে এলে পাওয়া যেতে পারে ইলিশ মাছ থেকে পাবদা, চিতল, চিংড়ি, খাসির মাংস-সহ আরও রকমারি বাঙালি খাবার। নানান ব্যাঞ্জনে মশলাদার পদে সাজানো রয়েছে জগন্মাতার হেঁসেল। যা দেখলেই জিভে জল আসতে বাধ্য। চাইলেই খেতে পারবেন কাঁসার থালায়। সাদা ভাত, আলু করলা ভাজা, শাকভাজা, আলুভাজা, আলু সেদ্ধ, মাটন, কাতলা মাছ, মুড়ি ঘণ্ট, ডাল, পেঁয়াজ, লেবু ও লঙ্কা – এই এতকিছু এক পাতে থাকলে খাদ্যপ্রিয় বাঙালির কি আর কিছু দরকার হয়? আজ থেকে প্রায় ১৫১ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল উত্তর কলকাতার জগন্মাতা হোটেল। এখন দোকান চালান তৃতীয় প্রজন্ম। কাঁসার থালার পাশাপাশি চাইলে কলাপাতাতেও খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

কৈলাস বসু স্ট্রিটের এই জগন্মাতা হোটেল মাংস বলতে শুধুই বোঝে খাসির মাংস। খাবার ঘরে নারায়ণ অধিষ্ঠিত আছেন, তাই আজও হেঁসেলের ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দেওয়া হয় না মুরগিকে। কোলেস্টেরল-ইউরিক অ্যাসিড-ট্রাইগ্লিসারাইডাদি জাতীয় অসুখ/শত্রুর নাম করে যাবতীয় চোখরাঙানিতেও এখানে খাসির টানে চলে আসেন প্রবীণ-নবীন বাঙালিরা। খাসির মাংসের দাম মোটামুটি ৯০ টাকার মতোন। আর রয়েছে হরেকরমের মাছ। ১৫০ টাকায় ইলিশ, ৪০ টাকায় বাটা, ১০০ টাকায় ট্যাংরা, ১৬০ টাকায় চিংড়ি, ২৫ টাকায় রুই ঝোল, ৪০ টাকায় রুই পোস্ত, ১২০ টাকায় ভেটকি, ১৫০ টাকায় পাবদা, ৪০ টাকায় তেলাপিয়া, ১০০ টাকায় কাতলা, পারশে ১০০ টাকা। এই দামগুলো একটু এদিক ওদিক হতে পারে। মাছের যোগানের উপর তা নির্ভর করে।

বিবেকানন্দ রোড থেকে আপনাকে কলেজস্ট্রিটের দিকে আসতে হবে। তাহলেই বাঁ হাতে পেয়ে যাবেন ‘ঘোষ এন্ড কোং’ মিষ্টির দোকান। তার ঠিক পাশের রাস্তা দিয়ে ভেতরে গেলেই ডান হাতে পাওয়া যাবে জগন্মাতা হোটেল। নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান জনপ্রিয় জগন্মাতা হোটেল। তরুণরাও রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করে ফেলেন জগন্মাতাকে। সনাতন খাবার, সাবেকি পরিবেশনের কায়দা সবমিলিয়ে জগন্মাতা হোটেলে বসে খাওয়া মানে তিলোত্তমা কলকাতার একচিলতে ইতিহাসের স্বাদ পাওয়া। ছুঁয়ে দেখা নিজের শিকড় এবং ঐতিহ্যকে।
