
বাংলার আধুনিক শিল্পের প্রাণকেন্দ্র লুকিয়ে আছে প্রাচীন লোকশিল্পের মধ্যে। বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী লোককলা ধর্মীয় ও সামাজিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করেই উদ্ভব। আলপনা, মনসাঘট, লক্ষ্মীর সরা ইত্যাদি সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরা শিল্প হল তেমনি একটি লোকশিল্প। যে সরাকে মানুষ কেবল মাত্র খাবারের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছিল, সেই সরাকে বাঙালি শিল্পের আধারে রূপ দিয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ সরাকে গ্রহণ করেছে পূজার সামগ্রী হিসেবে। মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষ সরাকে গ্রহণ করেছে শিল্পের আধার হিসেবে। তবে দুইয়ের মধ্যে ফুটে ওঠে শিল্পের প্রতীক।
কোনোরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই হাতে-কলমে কাজ করতে করতে দক্ষ কারিগরে পরিণত হয়। শিল্পের মোটিফ সংগ্রহ করেন সমাজ ও প্রকৃতি থেকে। সাধারণ ও সুলভ উপকরণ দিয়েই কারুকার্যখচিত সুন্দর শিল্পদ্রব্য তারা তৈরি করে।
হিন্দুদের সরাতে চিত্রিত হয়েছে হিন্দু দেবদেবীর ছবি, মুসলিম সরায় কোনো মূর্তি নয়, চিত্রিত হয়েছে ফুল, পাতা, লতা ইত্যাদি। সেগুলি গাজির সরা, মহরমের সরা নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে সাধারণত লক্ষ্মী সরার বিপুল প্রচলন রয়েছে। তবে এই শিল্পের জন্ম পদ্মাপারের মাটিতে। স্বপন ঠাকুরের ‘কৌলাল’ পত্রিকা থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশে কোজাগরী পূর্ণিমাকে ভিত্তি করেই ফরিদপুর, ঢাকা অঞ্চলে লক্ষ্মী সরার উৎপত্তি ঘটে। বাংলাদেশে এই সরার চারটে প্রকারভেদ পাওয়া যায়। ১) ঢাকাই সরা, ২) ফরিদপুর সরা, ৩) সুরেশ্বরী সরা, ৪) গনকী সরা। বলা বাহুল্য ঢাকাতেই এই শিল্পের জন্ম। ঢাকাই সরায় নারায়ণ ও লক্ষ্মীকে পরস্পরের মুখোমুখি দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখা যায়। সুরেশ্বরী সরায় মধ্যভাগে দেখা যায় সপরিবার দুর্গাকে। নীচের অংশে পৃথকভাবে থাকে লক্ষ্মীর ছবি। গণকী সরাকে বলা হয় হিন্দু সমাজের প্রান্তিক স্তরের লোকজনের ব্যবহৃত লক্ষ্মীর পট। এই সরার প্রধান দেবীমূর্তি হল দুর্গা ও তাঁর পরিবার। নীচের অংশে থাকেন লক্ষ্মী ও তাঁর বাহন পেঁচা। শুধু আশ্বিন মাসের শেষে নয়, প্রতি পূর্ণিমায় সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর উপাসনা করেন বাঙালি। কথিত আছে, কোজাগরী লক্ষ্মী কাঁসর ঘণ্টা, ষোড়শোপচার পছন্দ করেন না। তিনি সাংসারিক মানুষের শান্ত ঘরে ও হৃদকমলেই থাকতে চান। তাঁর পূজার জন্য সংস্কৃত মন্ত্র প্রয়োজন হয় না, হয় না পুরুষ পুরোহিতেরও। আবার তিনি শুধু ধনসম্পদ দান করেন তা নয়, তিনি খ্যাতি, সাহস, শক্তি, জয়, সুখ, সৌন্দর্য প্রদান করে থাকেন। তাই তাঁর পূজা উপলক্ষেই বাঙালি তৈরি করেছিলেন মাটির সরা। সেই সরার গায়ে আঁকা থাকে লক্ষ্মী, পেঁচা, নারায়ণ, কড়ি, ধানের শিষের ছবি। এই সরার আবার বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন- একলক্ষ্মী সরা, তিনপুতুল সরা, জয়া-বিজয়া সরা ইত্যাদি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলার ব্রত’ বইতে লক্ষ্মী পুজো সম্পর্কে লেখেন, দেবীর কাছে ক্ষেতে ভালো ফলনের কামনা করাই আসলে এই পুজোর নৃতাত্ত্বিক কারণ। পূজা বা ব্রতকথার সঙ্গে আলপনা বা আঁকার একটি সম্পর্ক রয়েছে।

প্রথমদিকে সরাতে লক্ষ্মীর ছবিই আঁকা হত, এবং এখনও আঁকা হয়। তার কারণ লক্ষ্মীর পূজা হিন্দুদের প্রত্যেকের ঘরে ঘরে হয়ে থাকে, অন্যান্য পূজা কিন্তু হয় না। তাই লক্ষ্মী হলেন সবার ঘরের মেয়ে। সরাতে দেখা যায় উপরে ও নীচে দু-জায়গায় মূর্তি আঁকা। লক্ষ্মীর ছবি নীচে আঁকা হয়। কারণ তিনি মর্ত্যে সবার ঘরে ঘরে থাকেন। কালক্রমে হিন্দু ধর্মের ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ লক্ষ্মী সরাতে অন্য ছবিও আঁকা শুরু করেন। যেমন বৈষ্ণবরা লক্ষ্মীর বদলে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি আঁকেন। শাক্তদের সরাতে যুক্ত হয় দুর্গার ছবি। শৈবরা যুক্ত করেন শিবের ছবি। এভাবে সরার অনেক ভাগ তৈরি হয়। যেমন- ফুলসরা, ঢাকনাসরা, মুপিসরা, আমসরা, আঁতুড়সরা ইত্যাদি। মাটির তৈরির সরার উত্তল দিকে ছবি আঁকা হয়। তার ওপর দেওয়া হয় সবুজ আঠা অথবা তেঁতুল বীজের গাদের প্রলেপ। এতে সরা আরও চকচকে হয়। মুসলিম সমাজে সরার যে ব্যবহার, টাঙ্গাইলে বানানো গাজির সরা, মহরমের ছবি আঁকা সরা, লতা পাতার নকশা আঁকা সরা মুসলমান ধর্মের মানুষেরা যত্ন করে ঘরে সাজিয়ে রাখেন। একসময় হিন্দু-মুসলিম সব ধর্মের মানুষই লক্ষ্মীর সরা ব্যবহার করতেন। মুসলিমদের সরাতে কাবাব ছবি-সহ বিভিন্ন সংখ্যা-মান লেখা থাকত যা গনকী সরা নামে পরিচিত।
বাংলাদেশের এই শিল্পের কারিগর কুমোরেরা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েন পশ্চিমবঙ্গেও। পশ্চিমবঙ্গে সেরকম কয়েকটি জায়গা হল নদিয়া জেলার তাহেরপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পানিহাটি, সোদপুর, দত্তপুকুর, হাওড়া জেলার হাওড়া সদর। বর্ধমান শহরের কাঞ্চননগর, উদয়পল্লি, ভাতছালা, ইছালাবাদ, নীলপুরে এখনও ওপার বাংলা থেকে আসা বিভিন্ন পরিবার সরায় আঁকা লক্ষ্মীর প্রতিমূর্তিকে পূজা করে। তারা কোনোরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই হাতে-কলমে কাজ করতে করতে দক্ষ কারিগরে পরিণত হয়। শিল্পের মোটিফ সংগ্রহ করেন সমাজ ও প্রকৃতি থেকে। সাধারণ ও সুলভ উপকরণ দিয়েই কারুকার্যখচিত সুন্দর শিল্পদ্রব্য তারা তৈরি করে।

বর্তমানে বাংলার এই লোকশিল্প আজ বিপন্ন। শিল্প শিক্ষার বাইরে সরা শিল্প আধুনিক শিল্পের কাছে ব্রাত্য। একদিকে রং তুলির বাজারমূল্য অনেক, কিন্তু পণ্যের চাহিদা কম, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্প বাজারে প্লাস্টিক আকারেও বিক্রি হতে শুরু করেছে। অনেক সরা শিল্পীদের মুখে এখন দেখা যায় হতাশার ছাপ। ভবিষ্যতে কতখানি সরা শিল্প টিকে থাকবে সে বিষয়ে প্রশ্ন জাগে।

