
মাধবী মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে। ছবি-নিজস্ব
মাধবী মুখোপাধ্যায়, বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে এসেছিলেন সেই কোন শৈশবে। তখনও জানতেন না তিনিই বাংলা ছবির ভবিষ্যতের চারুলতা, সীতা বা আরতি। সেই মেয়েটিই হয়ে উঠলেন ভারতীয় নারীকেন্দ্রিক ছবির অন্যতম মুখ। যাঁর কর্মজীবন সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত। লক্ষ লক্ষ দর্শকের আইডল মাধবী মুখোপাধ্যায় আজও দেশের বাইরে কান থেকে বার্লিন, ভেনিস-এর মতো তাবড় তাবড় চলচ্চিত্র উৎসবে উদযাপিত হন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে একইসঙ্গে বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা এবং সমান্তরাল ছবির সফল অভিনেত্রী হওয়া যায়। অনুপম সৌন্দর্য, নাগরিক লাস্য, মাটির ঘ্রাণ মাখা বাঙালির সম্পদ আর স্পর্ধার আরেক নাম মাধবী। আজ বঙ্গদর্শন.কম-এ পড়ুন মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার। ওঁর সঙ্গে কথোপকথনে সুমন সাধু।
বাড়িতে ঋত্বিকদার মন টিকত না। ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। কিন্তু ট্যাক্সি ভাড়া দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় আমার কাছে একাধিকবার এসেছেন তিনি। আমিই তখন ট্যাক্সি ভাড়া দিতাম। আমার সঙ্গে নানা সময়ই, নানা বিষয় নিয়ে ঝগড়া করতেন।
_____________________
সুমন: আপনি বিভিন্ন জায়গায় আপনার মায়ের কথা বলেছেন। আপনার অভিনেত্রী হওয়ার এই দীর্ঘ জীবনে মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। তাই আমাদের সাক্ষাৎকারটা বরং আপনার মায়ের প্রসঙ্গ ধরেই শুরু হোক…
মাধবী: আমার মায়ের নাম লীলা মুখার্জী। একবার রেডিও স্টেশন থেকে স্টেশন ডিরেক্টরই বলেছিলেন মা-কে গান গাইবার জন্য। দাদু তখন বলেছিলেন, না, আমাদের ঘরের মেয়েরা রেডিওতে গান গায় না। কিন্তু আমার ছোটো বোন বেলা যখন রেডিওতে গাইবার সুযোগ পেল, মা ভেবে দেখলেন, যে সময় বদলেছে। মা’র মনে ওটাই থেকে গেল যে দিন বদলায়, সময় বদলায়, মানুষের মনও বদলায়। আমরা দুই বোন ছিলাম। দুই বোন আর আমার মা কোনো এক স্বাধীনতা দিবসে ‘বন্দেমাতরম’ গান গাইতে স্টেজে উঠলাম। তখন প্রভাদেবী আমার মা-কে বললেন, তোমার মেয়েকে আমায় দেবে? আমি মিনার্ভা থিয়েটারে নিয়ে যাব। সেই প্রভাদেবীর হাত ধরেই আমি চলে গেলাম মিনার্ভা থিয়েটারে। মা না থাকলে এই জীবনটা আমি দেখতেই পেতাম না।

ঘটক বিদায় নাটকের মুহূর্ত
সুমন: ব্যতিক্রমী ও মূলস্রোতের ছবিতে একের পর এক চরিত্রে অভিনয় করে গেলেও আপনার শিকড় জুড়ে থিয়েটার। আপনি গুরু মেনেছেন ছবি বিশ্বাস আর শিশির কুমার ভাদুড়িকে। মঞ্চের কোনো টুকরো মুহূর্ত মনে পড়ছে?
মাধবী: প্রথম যেদিন নাটক করি ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে, সেখানে ভুল হয়। আমার সংলাপ ছিল, “এক্ষুনি ঘট ভরতে যাবে বাবা। একটু পরেই বলিদান হবে। রাত্রে বাবুদের বাড়িতে থিয়েটার হবে। ম্যারাপ বাঁধছে। একটু পরেই কিন্তু ছুটি দিতে হবে।” তখন আরেকজন বলছে, ও তোমাদের ছুটি দিতে হবে? ঠিক আছে। এমন সময়ে বিমলা আসে। বলল, না তুমি এরকম ছুটি-টুটি দিও না। আরেকজন বলছে, না না যা যা, তোরা ছুটিতে যা। আমি যেই মুহূর্তে বললাম, “এক্ষুনি ঘট ভরতে যাবে বাবা। একটু পরেই বলিদান হবে।” সঙ্গে সঙ্গে উনি মাথায় হাত দিয়ে এমন আদর করলেন, পুরো পার্টটাই ভুলে গেলাম। ওঁর দিকে তাকিয়ে আছি, তখন উনি বলছেন,
– এরপরে কী হবে?
– এরপরে বলিদান হবে।
– বলিদানের পর কী হবে? রাত্রে কী হবে?
– রাত্রে বাবুদের বাড়িতে ম্যারাপ বাঁধছে।
– ম্যারাপ বাঁধছে তো কী হবে?
– থিয়েটার হবে।
– তা থিয়েটার হবে তো তোর কী?
– একটু পরেই কিন্তু ছুটি দিতে হবে।
তখন আমার সব মনে পড়ে গেল। বললেন যাও যাও, তোমাদের ছুটি। এই শুরু। মিনার্ভায় একসঙ্গে দশ বছর কাজ করেছি। অন্যদিকে বড়োবাবু (শিশির কুমার ভাদুড়ি) তো দারুণ মানুষ ছিলেন। এখানে আরেকটি ঘটনা বলি। কোনো এক নাটকের সংলাপ ছিল, “শান্ত হও শান্ত হও জননী আমার। বারবার দুঃখের আঘাতে মস্তিষ্ক বিকৃতি বুঝি ঘটিল মাতার। শান্ত হও শান্ত হও জননী আমার।” গড়গড় করে পুরো সংলাপটা বললাম। শুধু ‘মস্তিষ্ক’টা আর বেরলো না। ওটা কি যেন একটা উচ্চারণ হল। তা সেটা বড়োবাবু দেখলেন। দেখে বললেন, দ্যাখো যদি পারো। আমার খুব আত্মসম্মানে লেগেছিল।
সুমন: কিন্তু মৃণাল সেন আপনার নামটাই তো বদলে দিলেন…
মাধবী: মৃণাল সেনের ছবিতে যখন গেলাম, উনি বললেন, তোমার নামটা যদি একটু বদলে দিই? এমন কথা শোনার পর প্রত্যেকেরই একটা অস্বস্তি হয়। নামটাই বদলে দেবে? ভাবছি যে কী করবো, নাম বদলাবো নাকি বাড়ি চলে যাবো? কিন্তু মৃণালবাবু বারবার বলছিলেন, ‘নবাগতা’ না দিলে আমাদের হচ্ছে না, অসুবিধে হচ্ছে। তোমার নামটা বদলে দিয়ে যদি ‘মাধবী’ দিই, তাহলে ‘নবাগতা’টা আমরা ব্যবহার করতে পারি। অগত্যা বললাম, হ্যাঁ, ঠিক আছে।
উত্তমবাবু এসে আমায় বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনি এখানে বসুন।’ আমাকে ‘ম্যাডাম’ বলায় ভীষণ অসুবিধেয় পড়লাম। বললাম, ‘আপনি আমাকে ম্যাডাম বলবেন না। মানুষকে চিহ্নিত করবার জন্য সব মানুষের একটা নাম দেওয়া হয়, আমারও একটা নাম আছে। আমার নাম মাধবী। আপনি মাধবী বলেই ডাকবেন।’

ছবির সেটে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে মাধবী
সুমন: সত্যজিৎ রায় আপনার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হলেন সম্ভবত ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’ দেখার পর। কিন্তু ওঁর ছবিতে ডাক এল কীভাবে?
মাধবী: সেই সময়কার অন্যতম প্রধান সাউন্ড রেকর্ডিস্ট দুর্গা সেন আর প্রোডাকশনের একজন আমার বাড়িতে এসেছিলেন। এসে বললেন, সত্যজিৎ রায় ডেকে পাঠিয়েছেন। ঠিকানাটা দিয়ে গেলেন, তিন নম্বর লেক টেম্পল রোড। সত্যজিৎবাবুর বাড়িতে গেলাম একদিন। উনি মহানগর-এর স্ক্রিপ্টটা শোনালেন। শোনার পরেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, যে আমি করছি আরতির চরিত্রটা।
সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে একেবারেই সাধারণ একটি শাড়ি পরে দেখা করতে গিয়েছিলাম। মুখে সামান্যতম মেকআপও ছিল না। আমি যেমন, ঠিক সেই ভাবেই তাঁর কাছে নিজেকে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলাম।

মহানগরে মাধবী
সুমন: ‘মহানগর’ বিশ্ব চলচ্চিত্রের সম্পদ। যেকোনো সিনেমাপ্রেমীর কাছেই মাস্টারক্লাস। আপনার দৃপ্ত অভিনয় দক্ষতায় ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।
মাধবী: হ্যাঁ, সেই ছবি আজ ইতিহাস। তো তারপর উনি হাতে আমাকে স্ক্রিপ্টটা দিলেন। বললেন, এটা ভালো করে পড়ুন। তখন বুঝলাম যে তাহলে আমিই চরিত্রটা পাচ্ছি।
সুমন: মহানগর-এর মতো কাল্ট ছবি দেখতে দেখতে মনে হয়, মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের বধূ আরতির অপটু হাতে লিপস্টিক পরার মধ্যেই ঘটে যায় নিঃশব্দ বিপ্লব। আর আরতির হাত ধরেই আটপৌরত্ব দূর হয় বাঙালি মধ্যবিত্ত গৃহবধূদের। এবং একমাত্র আপনার পক্ষেই ওই মাপের অভিনয় সম্ভব। আজও বারবার ফিরে যাই সেই ছবির কাছে।
মাধবী: আর সবচেয়ে সহজ হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করা। কোনো কিছুর টেনশন করতে হয় না। শুধু যে চরিত্রটা করছি, সেটা নিয়ে একটু ভাবলেই হয়ে যায়। আলাদা করে অভিনয় করার কোনো প্রয়োজন হয় না। চরিত্রটাকে শুধু অনুভব করা। আর কিছু না।
সুমন: আপনার আরেকটি পৃথিবীখ্যাত ছবি ‘চারুলতা’। অমন চাহনি, প্রেম, উল্লাস, দুঃখ, একাকিত্ব আজও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল।
মাধবী: হ্যাঁ, দেশে বিদেশে যেখানেই যাই… যেমন বিদেশে গেলে কেউ আমাকে মাধবী বলে না, চারু-ই বলে। চারুলতা বলে।
সুমন: বাংলার প্রায় সমস্ত বর্ষীয়ান পরিচালকদের সঙ্গে আপনি কাজ করেছেন। এই প্রসঙ্গে ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেনের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা যদি অল্প করে বলেন…
মাধবী: বাংলার প্রায় সমস্ত বর্ষীয়ান চলচ্চিত্র নির্মাতা যেমন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার, পূর্ণেন্দু পত্রী, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, ঋতুপর্ণ ঘোষ – প্রত্যেকের ছবিতেই অভিনয় করেছি। ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা হচ্ছে ওঁর সব জিনিসটা নিজের মাথায় থাকত। অন্য কাউকে কিছু বলবেন না। এমনকী স্ক্রিপ্টও বলতে চান না। আমাকে অবশ্য পড়ে শুনিয়েছিলেন সুবর্ণরেখা-র স্ক্রিপ্ট। কিন্তু সবাই বলতেন যে স্ক্রিপ্ট নেই ওঁর। কথাটা খানিক ভুল। স্ক্রিপ্ট পুরোপুরিই আছে। কিন্তু উনি কাউকে দেখাবেন না। একটা ঘটনার কথা বলি, “মোরা দুখুয়া কাসে কহু/ মোহন বিনা জিয়া নেহি লাগে” – সুবর্ণরেখায় এই গানের কথাগুলো বলে দিলেন। মুখস্থ করে নিলাম। এটা ছিল একটা ভৈরবী বন্দিশ। আরতি মুখার্জি গেয়েছিলেন। প্রথম প্রথম অসুবিধা হলেও এক্সপ্রেশন অনুযায়ী দৃশ্যটা হয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে ঋত্বিকদার মন টিকত না। ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। কিন্তু ট্যাক্সি ভাড়া দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় আমার কাছে একাধিকবার এসেছেন তিনি। আমিই তখন ট্যাক্সি ভাড়া দিতাম। ঋত্বিকদার চরিত্রের মধ্যে অনেকরকম শেড ছিল। কখনও খুব মজা করতেন, কখনও খুব সিরিয়াস থাকতেন। আমার সঙ্গে নানা সময়ই, নানা বিষয় নিয়ে ঝগড়া করতেন। অনেক সময় বলতেন, তুই এই ছবিগুলো কেন করিস! আমি বলতাম, আপনার কোনও দায়িত্ব নেই, কিন্তু আমার রয়েছে। আমি বলতাম, এই ট্যাক্সি ভাড়া দেওয়ার জন্যই বাণিজ্যিক ছবি আমাকে করতে হয়।
আর মৃণাল সেনকে নিয়ে কী বলব! এরকম সুন্দর মানুষ আমি আর দেখিনি। প্রত্যেকের সঙ্গে, তাঁর থেকে জ্ঞানীগুণী মানুষের সঙ্গে উনি যেমন ব্যবহার করতেন, একজন প্রোডাকশনের ছেলের সঙ্গেও সেই একই ব্যবহার করতেন। ভীষণ ভালো মনের শিক্ষিত মানুষ ছিলেন উনি।

সুবর্ণরেখায় মাধবী
কাননদেবী টেলিফোন করে বলেছিলেন, ‘জানিস মাধু, তুই একটা প্রাইজ পেয়েছিস।’ আমি বললাম, ‘প্রাইজ? কোথায়?’ তারপর কাননদেবী বললেন, দিবারাত্রির কাব্যের জন্য নাকি আমি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি।
সুমন: আপনার কমার্শিয়াল-বক্স অফিস সাকসেস ছবিগুলোর মধ্যে সবার আগে আসে উত্তমকুমারের নায়িকা হয়ে করা কাজগুলি। সেটা ‘থানা থেকে আসছি’ হোক বা ‘ছদ্মবেশী’, ‘বিরাজ বউ’ হোক বা ‘শঙ্খবেলা’। আপনার চোখে উত্তমকুমার কেমন?
মাধবী: উত্তমকুমার কিছু বলতেন না। অন্য একজন যেভাবে অভিনয় করতেন, উত্তমকুমারও সেইভাবে রিয়্যাক্ট করতেন। আমি যদি একটু কমজোরি হই, উনিও কমজোরি হয়েই অভিনয় করতেন। উত্তমবাবুর সঙ্গে আমার একটা ছবি ‘থানা থেকে আসছি’। উনি সেখানে একজন পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। আর আমার চরিত্রটি ছিল সমাজের এক নির্যাতিতা মেয়ের। ওই ছবিতে উত্তমবাবুর সঙ্গে আমার তেমন কোনো দৃশ্যই ছিল না। মনে আছে, একদিন উত্তমবাবু শট দিচ্ছেন, উনি চলে গেলে তারপর আমার শট নেওয়া হবে। আমি তো সেটে চলে গিয়েছি অনেকক্ষণ আগে, কিন্তু বসার জায়গা পাইনি, দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন উত্তমবাবু এসে আমায় বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনি এখানে বসুন।’ আমাকে ‘ম্যাডাম’ বলায় ভীষণ অসুবিধেয় পড়লাম। বললাম, ‘আপনি আমাকে ম্যাডাম বলবেন না। মানুষকে চিহ্নিত করবার জন্য সব মানুষের একটা নাম দেওয়া হয়, আমারও একটা নাম আছে। আমার নাম মাধবী। আপনি মাধবী বলেই ডাকবেন।’ ওঁর সঙ্গে কথোপকথনের এই শুরু। তারপর তো একের পর এক সুপারহিট ছবি একসঙ্গে করেছি। খুব মনে পড়ে সেসব দিনের কথা। যখন আউটডোরে গেছি, সুপ্রিয়াদেবী রান্না করতেন। উত্তমবাবু, সুপ্রিয়াদেবী আর আমি তিনজন একসঙ্গে বসে খেতাম। আমি নাকি সবকিছু দেখতে পাই, তাই উত্তমকুমার আমার নাম দিয়েছিলেন ‘এক্স-রে আইজ’।

উত্তমকুমারের সঙ্গে মাধবী
সুমন: উত্তমকুমারের পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে আপনি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করে অন্যতম চর্চিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন। আপনাদের ‘চারুলতা’, ‘কাপুরুষ’, ‘জোড়াদিঘির চৌধুরী পরিবার’, ‘গণদেবতা’ ছবিগুলি তার উদাহরণ।
মাধবী: হ্যাঁ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অনেক ছবি করেছি। থিয়েটারও করেছি। বাইরে বিদেশে একসঙ্গে গিয়েছি, একসঙ্গে সম্বর্ধনা পেয়েছি। ওঁর সঙ্গে কাজ করতে দারুণ লাগত। সিনেমার সেটে ওঁর মতো হাসি-ঠাট্টার মানুষ আর দেখিনি। কিন্তু উনি যখন মঞ্চের পরিচালক, তখন কারোর ক্ষমা নেই। একটা ছোট্ট ভুল হলেই উনি ধরে ফেলতেন, বলতেন, ‘এই তুমি এটা কেন করেছ?’ খুব ভয়ের সঙ্গে থাকতে হত।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মাধবী, চারুলতায়
সুমন: আর আপনার অন্যান্য নায়ক? ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞানেশ মুখোপাধ্যায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়?
মাধবী: ভানুদা মানুষটা ভীষণ ভালো। উনি তো শুধুমাত্র পর্দার কমেডিয়ান নন, উনি দেশের কথাও ভাবতেন, দশের কথাও ভাবতেন। অমন সৎ মানুষ আর দেখি না কোথাও। জ্ঞানেশ মুখার্জী ভীষণ ভালো অভিনেতা এবং তাঁর কন্ঠস্বর এত ভালো ছিল, আর এত সুন্দর গান গাইতে পারতেন যে ভাবা যায় না! সেগুলো তো মানুষ শোনেনি, তাই জানে না। শুধু অভিনয়টাই দেখেছে। আমরা সেটে বসে ওঁর গান শুনতাম মন দিয়ে। আর অনিল চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও আমি অনেক কাজ করেছি। বিখ্যাত সব ছবি। ‘মহানগর’ তো আমাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। উনি খুব বড়ো মাপের অভিনেতা। অনিলবাবুর বাড়িতেও যেতাম, ওঁর স্ত্রী ভীষণ ভালোবাসতেন আমায়। এতই হৃদ্যতা ছিল যে, ওঁদের বাড়িতে কোনো স্পেশাল রান্না হলে টিফিন বক্সে করে আমার জন্য নিয়ে আসতেন। ইন্ডাস্ট্রিতে এখন এসব আর দেখা যায় না।
সুমন: প্রায় শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন আপনি। প্রথম বাঙালি অভিনেত্রী হিসেবে ১৯৭০ সালে ‘দিবারাত্রির কাব্য’ ছবির জন্য পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। প্রথম বাঙালি অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় পুরস্কারের ওই মুহূর্তটা কেমন ছিল?
মাধবী: কাননদেবী টেলিফোন করে বলেছিলেন, ‘জানিস মাধু, তুই একটা প্রাইজ পেয়েছিস।’ আমি বললাম, ‘প্রাইজ? কোথায়?’ তারপর কাননদেবী বললেন, দিবারাত্রির কাব্যের জন্য নাকি আমি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি। আমায় দিল্লি যেতে হবে। তখন দিল্লি যাওয়াটা আমার কাছে খুব অসুবিধার ছিল। সবে আমার প্রথম সন্তান মিমি হয়েছে। মিমিকে আমার মায়ের কাছে রেখে দুদিনের জন্য গেলাম। তো সেবার উৎপল দত্তও পুরস্কার পেয়েছিলেন। আমায় বললেন, শুনুন মাধু কী করতে হবে! খুব গম্ভীর একটা এক্সপ্রেশন নিয়ে বসে থাকতে হবে। যখন নাম অ্যানাউন্স করবে একদম হাসবেন না। গাম্ভীর্যের সঙ্গে যাবেন। এইভাবে খুব ইয়ার্কি মেরেছিলেন উনি।

অদ্বিতীয়ায় মাধবী
সুমন: কিন্তু একাধিকবার সুযোগ পেয়েও আপনি বাংলা ছেড়ে হিন্দি ছবিতে গেলেন না কেন?
মাধবী: একবার বিএফজেএ পুরস্কারের সময় রাজ কাপুরের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। উনি আমায় বলেছিলেন, ‘দ্যাখো সবকিছুরই একটা নিয়ম আছে, যদি কোনো নদী সমুদ্রে না যায় তাহলে তার পূর্ণতা আসে না।’ কথাটি সত্য। সেদিন রাজ কাপুরের এই কথার কোনো জবাব দিতে পারিনি। উনি তারপরেও আমাকে বম্বেতে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি আমার জায়গাতে থেকেই কাজ করব, এমনটাই ভেবে রেখেছিলাম।
সুমন: অভিনয়ের পাশাপাশি দক্ষ হাতে আপনি একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন, ‘আত্মজা’। কী বলবেন সে ছবি নিয়ে?
মাধবী: স্বামী-স্ত্রীর যদি মিল না হয় তাহলে তারা চলে যায়। তারপর হয়তো স্বামী একটা বিয়ে করে, স্ত্রীও একটা বিয়ে করে। এই যে বনলো না, এটাই নাকি আধুনিকতা। ঠিক আছে মানলাম আধুনিকতা। কিন্তু যে সন্তানটি হল সে কোথায় যাবে? তার যাওয়ার তো একটা জায়গা দরকার। এই ভাবনা থেকেই ‘আত্মজা’ করেছিলাম।

৮৩ বছরের মাধবী মুখোপাধ্যায়। ছবি-নিজস্ব
সুমন: এই যে পৃথিবী জুড়ে এত ভালোবাসা পেলেন, এই বয়সে এসে কী বলবেন?
মাধবী: যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছি আগে, তাঁদের কাছ থেকে প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছি। নষ্ট হয়ে যাবার মতন ভালোবাসা। এখন যাঁদের সঙ্গে মিশছি, তাঁদের কাছ থেকেও ভালোবাসা পাই। কাজেই কোথাও কোনো আসুবিধা নেই। আমার ভালোবাসার খামতি পড়েনি। হয়তো লক্ষ লক্ষ দর্শক আমায় আইডল মানে। নায়িকা তো হতে চাইনি কোনোদিন, তাই বলে জনপ্রিয়তায় ভাটাও পড়েনি। একইসঙ্গে বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা এবং সমান্তরাল ছবির অভিনেত্রী হওয়া যায়, সেটা তো আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে সম্ভব হয়েছে। আর বিশেষ কিছু চাই না এ-জীবনে। যা পেয়েছি, তা সীমাহীন, অনন্ত।
