নৈঃশব্দ্যের কবি : সাক্ষাৎকারে দেশের মূকাভিনয় প্রণেতা যোগেশ দত্ত

যোগেশ দত্তের বাড়িতে। সুমন সাধুর তোলা ছবি।

সাক্ষাৎকারটি নেওয়ার আগে চিন্তায় ছিলাম ৯১ বছর বয়সী এই কিংবদন্তির যোগেশ দত্ত-এর সঙ্গে ঠিকঠাক ‘কমিউনিকেট’ করতে পারবো কিনা। তাঁর একমাত্র সন্তান প্রকৃতি দত্তর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘এতক্ষণ বসে থাকতে পারবেন? কথা বলতে ওঁর কোনও সমস্যা হবে না তো?’ হাসিমুখে আশ্বস্ত করেছিলেন প্রকৃতিদি, ‘না না, কোনও অসুবিধা নেই। বাবা একদম চাঙ্গা।’ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের, নব কৈলাস আবাসনের ১১ সি-তে পৌঁছেই টের পেলাম তা। শরীর ন্যুব্জ হলেও হাঁকডাক থেকে নিজের কাজ নিজে করে নেওয়ার প্রবণতায় এখনও অটল এ-দেশের মূকাভিনয় (মাইম) প্রণেতা যোগেশ দত্ত (Jogesh Dutta)। দৃষ্টি ঝাপসা হলেও স্মৃতিশক্তি প্রখর, বাড়তে দেননি শিশুসুলভ মনের বয়স। সাউন্ড চেক করার জন্য কিছু বলতে অনুরোধ করায়, হাসিহাসি মুখে গড়গড় করে বলতে শুরু করলেন, “ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত, পাঠায়েছ বারে বারে/ দয়াহীন সংসারে, তারা বলে গেল ‘ক্ষমা করো সবে’, বলে গেল’ ভালোবাসো–/ অন্তর হতে বিদ্বেষবিষ নাশো।” আর এভাবেই শুরু হল আমাদের কথোপকথন।

আপনার জন্ম তো পূর্ববঙ্গে। ছোটোবেলায় দেখা মাদারিপুর জেলার সেই হাটশিরুআইল গ্রাম, মরে যাওয়া আড়িয়াল খাল নদী, দেশ ছাড়া—এখন এগুলো কেমন ছবি তৈরি করে? 

মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলাম—আমি কবে জন্মেছি? মা বলেছিল, ওই যে যেবারে দক্ষিণ দিকের আমগাছটা পড়ে গেল—সেবারে। পরে জেনেছিলাম সেটা ১৯৩৩ সাল। আমি হবার সময় মায়ের নাকি এত কষ্ট হয়েছিল, যে ধাই মা ও অন্য মেয়েরা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল মা’কে নিয়ে। আমি জন্মেছি এটা সবাই ভুলেই গেছিল, তাই তো ছোটোবেলায় আমার ডাকনাম রাখা হয়েছিল ভোলা। আমি ছিলাম মায়ের পঞ্চম সন্তান। আমার পরে আরও চার ভাইবোন। দাদাদের সঙ্গে নাম মিলিয়ে আমার নাম রাখা হল যোগেশ। শিয়ালদহের বৈঠকখানা বাজারে পুরোনো আসবাবপত্রের দোকান ছিল বাবার। আমার জন্মের সময় বাবা উপস্থিত থাকতে পারেনি, পরে এক জেঠিমা কলকাতায় চিঠি লিখে বাবাকে জানিয়েছিলেন, ‘তোমার একটা পোলা হইছে।’ আমার যখন ছয় মাস বয়স, বাবা আমাকে প্রথম দেখতে আসে। গ্রামের সবাই ছুটে গেল নদীর ধারে। শশীবাবু আইছেন কলকাতা থেইকা, সঙ্গে অনেক জিনিষপত্র। গ্রামের সবাই সেসব নিয়ে বাবাকে সঙ্গে করে বাড়ি আসত, মনে হত যেন সারা গ্রামের আত্মীয় এসেছে। আড়িয়াল খাঁ নামে এক মুসলমান ফকিরের নামে সেই নদীর নাম—আড়িয়াল খাল। নদীটা এখন আর নেই। মনে আছে আমার হাতেখড়ির কথা। একদিন মা কয়েকটা তালপাতা নিয়ে এসে পুঁথির মতো কেটে সেদ্ধ করলেন। পরে মুছে পরিষ্কার করে, জেঠতুতো দিদিকে বলেছিল, ‘তোর ভাইটার হাতেখড়ি দিয়া দে’। গ্রামে হেসেখেলে ভালোই কাটছিল ছোটোবেলা। সেই ছোটোবেলাতেই দেখলাম মন্বন্তর, স্বদেশি আন্দোলন, ভাগাভাগি—দেশভাগ।

ওই যে লেকে সব জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ওদের সংলাপ তো বোঝা যায় না, কিন্তু এদের চালচলন দেখে বোঝা যায়। কোনও জোড়া ভাই-বোন, কোনও জোড়া স্বামী-স্ত্রী বা কোনও জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা। তখন আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। এদের কথা তো আমরা শুনতে পাই না, কিন্তু এদের বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি দেখে চরিত্রগুলো বোঝা যায়।

তখন ও এখন

হঠাৎ শুনলাম দেশ স্বাধীন হবে, চারিদিকে আনন্দ, কারো মুখ ভার। শুনলাম আমাদের দেশটা পড়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে। মায়ের মুখে কোনও কথা নেই, বাবা নীরব, গ্রামের সকলে কানে কানে কী কথা বলছে বুঝতে পারছি না। দেবুদা আমাদের বাড়িতে কাজ করতো। একদিন রাত্রে দেবুদাকে ডেকে বাবা বললেন, আজ থেকে এই ঘরে তোরা থাকবি। দেবুদা কান্নায় ভেঙে পড়লো। বাড়ি থেকে বেরোবার আগে তুলসী মঞ্চে একটা প্রদীপ জ্বেলে দিয়ে দেবুদাকে মা বললো, যতদিন পারবি এটা জ্বালিয়ে রাখিস। আমরা রাতের অন্ধকারে নৌকায় উঠলাম। মনে হচ্ছিল যেন নিজের বাড়ি থেকে নিজেরাই চুরি করে পালাচ্ছি।

সেখান থেকে কি সোজা কলকাতায়?

হাটশিরুআইল থেকে যখন আমরা রানাঘাটে এসে পৌঁছলাম, পৃথিবীর অন্যরূপ দেখতে পেলাম। স্বেচ্ছাসেবকেরা আমাদের পাঁউরুটি, চিড়ে, গুড়, কাপড় দিল। আর একটা কার্ড দিল। বললো, কলকাতায় গিয়ে এই কার্ড দেখালে সব পাবে। আমাদের নাম হল ‘ছিন্নমূল’।

শিয়ালদায় এসে যখন নামলাম, এটাও দেখি আলাদা একটা পৃথিবী। সেই প্রথম আমি ঘোড়ার গাড়ি দেখলাম ও উঠলাম। সারপেনটাইন লেনের একটা খোলার চালের বাড়িতে গাড়িটা এসে দাঁড়ালো। সে বাড়িতে অনেক লোকের বাস। একটা পায়খানা, একটা মাত্র স্নানের চৌবাচ্চা, মেয়েদের জন্য চট দিয়ে ঘেরা স্নানের জায়গা। কত অচেনা লোক, সবাই ছুটে এল আমাদের দেখতে। সবাই বললো, তোমরা কলকাতায় নতুন এলে? নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হয়েছিল, পরে সবাই আত্মীয়ের মতো হয়ে গেল। মা একা থাকলেই কাঁদতো। আমরা ভর্তি হলাম পাশেই একটা কর্পোরেশন স্কুলে, নাম শশীভূষণ সে স্কুল। এই প্রসঙ্গে বলি, আমার বাবার নাম ছিল শশীভূষণ দত্ত ও মায়ের নাম কুসুমকুমারী দত্ত। মনটাও ছিল কুসুমের মতো। যে কেউ বাড়িতে এলে যেখানেই থাকতো, বলতো, দুগা খাইয়া যাও। এটাই ছিল তখনকার মানুষের ব্যবহার। সেসব দিন আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। এখন এসেছে মেনে চলার দিন।

এরপরই  তো বাবা-মা দুজনকেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে হারানো, মামার বাড়িতে গিয়ে ওঠা, সেখান থেকে পালিয়ে শিশুশ্রমিক হিসেবে নতুন জীবন শুরু…

হ্যাঁ। জর্জ টেলিগ্রাফ কলেজের উত্তর দিকে, মানে বউবাজার স্ট্রিটের ওপারে একটা পুরোনো ফার্নিচারের বাজার। এখানেই আমার বাবার দুটো দোকান ছিল। রাজা ও জমিদারদের পুরোনো ফার্নিচার এখানে বিক্রি হত। কলকাতায় আসার পর আমার একটা ছোটো ভাই হয়। ইতিমধ্যে বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে, মাঝে মাঝে বড়দাকে দোকানে বসতে হত। বাড়ির এবং মায়ের অর্ধেক কাজ মেজদা করে দিত, আমি ছিলাম সব থেকে কুঁড়ে। কিছুদিন পর জানা যায়, বাবার টিবি হয়েছে। অনেক চেষ্টা করে যাদবপুরে কুমুদিনী যক্ষ্মা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মায়ের সেই করুন মুখ আজও আমাকে কষ্ট দেয়। আমাকে তখন জেঠিমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একদিন মামা সেখানে গিয়ে বললেন, তোমার বাবা আর নেই। মামার সঙ্গে চলে এলাম গলায় উত্তরীয় নিয়ে। মায়ের মুখে কথা বলার কোনও ভাষা ছিল না। একটা হাঁড়িতে ভাত ফুটিয়ে আমাদের পাতায় করে খেতে দিত। মা ছিল হাই ব্লাড প্রেসারের রোগী। আমরা গঙ্গায় গিয়ে চান করে এসে দেখি মা অজ্ঞান হয়ে গেছে। তারপরের দিন বাবার শ্রাদ্ধ, বড়দাই সব কাজ করলো। ছোটো ভাই হারুর দায়িত্ব নিল দিদি। চারদিন অজ্ঞান অবস্থায় থাকার পর মা দেহত্যাগ করলো। মায়ের শ্রাদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর মামা-মামিমা আমাদের বললেন, এখন থেকে তোরা সবাই আমাদের এখানে থাকবি। বড়দা তখন ক্লাস এইটের ছাত্র, বললো, আমি এখন থেকে দোকান দেখবো, তিনভাই তোমাদের কাছে থাকবে। ভর্তি হলাম সালকিয়ার হিন্দু হাইস্কুলে। কিন্তু পড়াশোনায় আমার মন বসতো না। স্কুলে নাটক, আবৃত্তি আমি ভালোই করতাম, মাঝে মাঝে নকল করার একটা প্রবণতা ছিল। কমিক করতাম। মাঝে মাঝে মামার পা টিপে দিতাম, তাঁর ম্যানেজারের সঙ্গে বাজার যেতে হত থলে বয়ে আনার জন্য, মোবাইল ছিল না বলে সালকিয়া থেকে আড়াই মাইল দূরে, ঘুসুড়ি থেকে ড্রাইভারদের ডেকে আনতে হত। একদিন রাত্রে মামাতো ভাই ও মামিমা আমাকে একটা কটু কথা বলায়, সেদ্ধ ছোলার ডাল, কাঁচা তেল দিয়ে মেখে ভাত খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম রাতের অন্ধকারে অজানার উদ্দেশ্যে।

মূকাভিনয় কী, তা ভারতকে শিখিয়েছিলেন যোগেশ দত্ত

হেঁটে হাওড়া স্টেশন গিয়ে দেখলাম প্লাটফর্মে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তাতে উঠে একটা সিটে ঘুমিয়ে পড়লাম। এভাবে পৌঁছে গেলাম রামপুরহাট। একটা চায়ের দোকানের অবাঙালি মালিককে মিথ্যে কথা বললাম, ‘আমার বাবা-মাকে পূর্ব পাকিস্তানে কেটে ফেলেছে, তাই আমি ভয়ে পালিয়ে এসেছি। আমাকে একটা কাজ দেবেন?’ মালিক বললো, ‘তুই কাপ প্লেট ধুতে পারবি? লোককে চা দিতে পারবি?’। বললাম, পারবো। শুরু হল আমার কর্মজীবন, একটা অধ্যায়।

তারপর আর দাদাদের কাছে ফিরলেন না?   

ফিরলাম। চায়ের দোকান, হোটেল, মুদির দোকান, রেলে কন্ট্রাক্টরির ঠিকা কাজ করতে করতে একদিন ভাবলাম বাড়ির সবাই কি আমাকে ভুলে গেছে? খুব মন খারাপ করলো, কাউকে কিছু না জানিয়ে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে পড়লাম। এসে পৌঁছালাম মামাবাড়ি, সালকিয়ার সীতানাথ বোস লেনে। দূর থেকে দেখলাম মামাবাড়িতে আলো জ্বলছে। খুব জল তেষ্টা পেতে কর্পোরেশনের কল খুলে জল খাচ্ছি, এমন সময় মেজদা এসে আমার কান ধরলো, বললো, কোথায় ছিলি? আমরা তোকে কত খুঁজেছি। আমি বললাম কই নিরুদ্দেশের পাতায় আমার নাম তো দেখিনি। মেজদা হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল বাড়িতে। সেই রাত্রে সবাই একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করেছিলাম, আমার পাতে একটু বেশি বেশি মাছ-মাংস পড়েছিল।

ব্যঙ্গকৌতুক থেকে মূকাভিনয় শুরু করলেন কবে? কথা না বলেও শুধুমাত্র অঙ্গভঙ্গি বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, এক্সপ্রেশনের মাধ্যমেও যে মনের ভাব বোঝানো যায়, এই বোধ কোথা থেকে পেলেন?

তখন ব্যঙ্গকৌতুক করে একটু পরিচিতি হয়েছে, মাঝেমধ্যে এখানে ওখানে ডাক পাই। জনক রোডে থাকার সময় প্রায়দিনই দুপুরবেলা আমি একা লেকে বসে থাকতাম। লেকে যেখানে দুটো কামান আছে সেখানে বসে আছি। হঠাৎ মনে হল, ওই যে লেকে সব জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ওদের সংলাপ তো বোঝা যায় না, কিন্তু এদের চালচলন দেখে বোঝা যায়। কোনও জোড়া ভাই-বোন, কোনও জোড়া স্বামী-স্ত্রী বা কোনও জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা। তখন আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল। এদের কথা তো আমরা শুনতে পাই না, কিন্তু এদের বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি দেখে চরিত্রগুলো বোঝা যায়। কাছেই ছিল সুর ও বাণী গানের স্কুল, যেটা সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের উলটো দিকে। সেখানে গিয়ে কেয়াদিকে (কেয়া চ্যাটার্জি) বললাম, তোর ড্রেসিং টেবিলটা একটু ব্যবহার করতে দিবি? সেই ড্রেসিং টেবিলের সামনে কয়েক দিন অবিরাম মহড়া দেওয়ার পর, একদিন কেয়াদিকে বললাম, এটা নির্বাক কৌতুক। দ্যাখ, একটা মেয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে কী করে। ও পুরোটা দেখে বললো, মেয়েরা তোকে ধরে মারবে। অজান্তেই জন্ম নিল আমার নির্বাক কৌতুক—মূকাভিনয় বা মাইম।

ওএকদিন লন্ডন থেকে এইচএমভি-র অরুণ বসাক এলেন। আমার নির্বাক কৌতুক দেখে বললেন, তুমি এটা করেছো কী? এই শিল্প নিয়ে ফ্রান্স ও ইউরোপে খুব আলোড়ন চলছে। একে বলে ‘মাইম’। আমি বললাম, দাদা, বাংলায় এটার কী নাম দেওয়া যায়? তিনি বললেন, মঞ্চে যখন কিছুই নেই, তখন নির্বাক কথাটা এখানে প্রযোজ্য নয়। আমি বললাম, মূকাভিনয় যদি বলি?

যোগেশ দত্তের গৃহকোণ, সুমন সাধুর তোলা ছবি

এরপর একদিন বালির একটা জলসায় আমার নাম ঘোষণা হল ব্যঙ্গকৌতুক করার জন্য। আমি মঞ্চে উঠে বললাম, ব্যঙ্গকৌতুক করার আগে আমি একটা নির্বাক কৌতুক দেখাচ্ছি। তখন ভি বালসারা কলকাতায় নতুন এসেছেন। হারমোনিয়াম (পিয়ানো অ্যাকোর্ডিয়ান) বুকে করে বাজাতেন। আমি তাঁকে বললাম, আমার সঙ্গে একটু বাজিয়ে দেবেন? উনি বললেন, হাঁ বেটা, জরুর। তখন আমার পোশাক ছিল চাইনিজ পাঞ্জাবি ও পাজামা। একটা চেয়ারে বসে দেখালাম মেয়েদের সাজগোজ। দর্শক তা সাদরে গ্রহণ করলো, ২৫ টাকা পারিশ্রমিকও পেলাম। ভি বালসারা বললেন, সাবাস বেটা। তারপর একদিন লন্ডন থেকে এইচএমভি-র অরুণ বসাক এলেন। আমার নির্বাক কৌতুক দেখে বললেন, তুমি এটা করেছো কী? এই শিল্প নিয়ে ফ্রান্স ও ইউরোপে খুব আলোড়ন চলছে। একে বলে ‘মাইম’। আমি বললাম, দাদা, বাংলায় এটার কী নাম দেওয়া যায়? তিনি বললেন, মঞ্চে যখন কিছুই নেই, তখন নির্বাক কথাটা এখানে প্রযোজ্য নয়। আমি বললাম, মূকাভিনয় যদি বলি? উনি খুশি হয়ে বললেন, বাঃ, এটাই ঠিক নাম। স্বীকৃতি পেল মূকাভিনয় শিল্প।

এরপর, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষে আমি ব্যঙ্গকৌতুক তৈরি করলাম ‘এক্সপ্লয়টেশন অফ রবীন্দ্রনাথ’। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনকে কী করতে চেয়েছিলেন আর কী হয়ে দাঁড়ালো, এই ছিল ব্যক্তব্য। সেটা দর্শকমহলে খুব সাড়া ফেলেছিল। তৈরি করলাম ‘আমার ডায়েরির একটি পাতা’। বেহালার ভেজাল তেল খেয়ে, অন্ধ হয়ে যাওয়া একটি ছেলেকে কেন্দ্র করে। এভাবেই একের পর এক মাইম সৃষ্টি করে গেছি।

পঞ্চাশের দশকের বিখ্যাত ফরাসি মূকাভিনেতা মার্সেল মার্সো যখন কলকাতায় এসেছিলেন, আপনি নাকি টাকার অভাবে তাঁর অনুষ্ঠানে পৌঁছাতে পারেননি?

হ্যাঁ, সেবার আলিয়াঁস ফ্রঁসে (Alliance Française du Bengale) নিয়ে এসেছিল মার্সেল মার্সোকে। নিউ এম্পায়ারে তাঁর অনুষ্ঠান আমি টিকিট না পাওয়ায় দেখতে পারলাম না। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছিল। তার বদলে দেখেছিলাম উদয়শঙ্করের ‘কল্পনা’, ‘সামান্য ক্ষতি’, বালা সরস্বতীর ‘কৃষ্ণ ও যশোদা’, গুরু গোপীনাথের ‘জটায়ুবধ’ ও বিভিন্ন রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য। অনেকদিন পর বুঝেছিলাম, জীবনের প্রথম দিকে যদি মার্সোর শো দেখতাম তাহলে সবাই আমাকে বলতো ওয়াটার প্রিন্ট মার্সেল মার্সো।

মার্সো’র সঙ্গে পরে দেখা হয়নি আর?

ভিয়েনা থেকে ওয়ার্ল্ড মাইম ফেস্টিভ্যাল ওয়ার্কশপে শিক্ষকতা করার জন্য এবং অনুষ্ঠান করার জন্য ডাক পাই। সেখান থেকে  ভারত সরকার আমাকে প্যারিসে পাঠায়। এখানেই মার্সেল মার্সোর সঙ্গে আলাপ হয়। এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়লো, মুদিয়ালিতে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে প্রথমবার গেছি। আমার সঙ্গে আলাপ হওয়ার মুহূর্তে ওঁর প্রথম বাক্য ছিল, ‘তুমি তাহলে ইন্ডিয়ার মার্সেল মার্সেলো’। আমি আর আইসিসিআর যৌথ উদ্যোগে মার্সেল মার্সোকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলাম। ততদিনে যোগেশ মাইম অয়াকাডেমি হয়ে গেছে। উনি আমার মাইম দেখে বললেন, ফাদার অফ ওরিয়েন্টাল মাইম।

      একবার, অহীন্দ্র চৌধুরী যখন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ ডান্স ড্রামা অ্যান্ড মিউজিক’-এর ড্রামা বিভাগের কর্ণধার ছিলেন, সেই সময় ঐ বিভাগে রাশিয়া থেকে থিয়োলেসুল্লা নামে এক মাইম শিল্পী এসেছিলেন। অহীন্দ্র চৌধুরী তাঁর মূকাভিনয় আপনাকে দেখতে দেননি বলে শুনেছি।  

রবীন্দ্রভারতী ইউনিভার্সিটি তখন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ ডান্স ড্রামা অ্যান্ড মিউজিক’ ছিল। আমি অ্যাকাডেমির ছাত্র নই বলে, অহীন্দ্র চৌধুরী আমায় ঢুকতে দেননি থিয়োলেসুল্লার মূকাভিনয় দেখতে। সেদিন মেজদার এক বন্ধু সুনীল ব্যানার্জী অহীন্দ্র চৌধুরীকে বলেছিলেন, ভারতবর্ষের মূকাভিনয়ের এই হবে পথিকৃৎ। সেদিন থেকে আমার মনে আরও জেদ চেপে গেল। রোজ রাত্রে সিএলটি-র ছাদে ও রাতের অন্ধকারে প্র্যাকটিস করতে লাগলাম। হঠাৎ একদিন ভি বালসারা আমায় খবর দিলেন দেখা করার জন্য। তাঁর সংগঠন ‘সাজ অউর আওয়াজ’-এ আমাকে যোগ দিতে বললেন। সেই গ্রুপে আমি মূকাভিনয় ও কমিক করতাম। রবীন সরকার নামে একটি ছেলে ভালো মাউথঅর্গান বাজাতো গ্রুপে, তাকে প্রস্তাব দিলাম, আমার শো-তে আমার পারফরম্যান্সের সঙ্গে বাজাতে। তারপর থেকে আমার সঙ্গে সঙ্গে সে-ও যেত, যেখানেই অনুষ্ঠান করতে যেতাম। একদিন রমেন ঘোষ এসে জানালেন, স্টুডেন্টস হলে আমার প্রথম শো হবে। চারিদিকে পোস্টার পড়ে গেল। সাংবাদিক বৈঠক হলো। ভানুদা বললেন, ভয় করবি না, ভালো হইবো। আমার পোশাক ছিল চোস্ত ও বেনিয়ান। মেকআপের দায়িত্ব নিল আমার সুন্দরম-এর বন্ধু, সত্যজিৎ রায়ের মেকআপ আর্টিস্ট অনন্ত দাস। মূকাভিনয় যেহেতু এক্সপ্রেশনের ব্যাপার, অনেকটা কথাকলি নাচের মতো ‘ওরিয়েন্টাল মেকআপ’ করে দিলেন। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মূকাভিনয়ের আজকের এই মেকআপ ওঁরই অবদান।

যোগেশ দত্তকে নিয়ে নির্মিত ভাস্কর্য, সুমন সাধুর তোলা ছবি

কখনও  কি কাউকে মনে মনে গুরু মেনেছেন?

আমার একমাত্র গুরু- আয়না। আয়নার সামনেই তো শুরু করেছিলাম। জনক রোডে ৬ স্কোয়ার ফুটের একখানা ঘর ভাড়া নিয়ে, সেখানে একটা আয়না লাগিয়ে প্র্যাকটিস করতাম, মেঝেতে একটা জুট কার্পেট পেতে নিয়েছিলাম। এছাড়া আমি গুরু মানতাম উদরশঙ্কর-কে। ‘কল্পনা’-য় দেখেছিলাম উনি কীভাবে মাইম ব্যবহার করেছেন। আমার ‘জন্ম থেকে মৃত্যু’ দেখে উদয়শঙ্কর বলেছিলেন, শিল্পী জন্মায়, শিল্পী তৈরি করা যায় না। শিল্পীর দায়িত্ব তার শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা।

কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়াই দেশ-বিদেশে পেশাদারি মাইম উপস্থাপন করা আয়ত্ত করলেন কীভাবে?

ভালো মূকাভিনয় করতে গেলে, বুঝলাম, অনেক কিছুর প্রয়োজন। নাড়া বাঁধলাম নারুথাপ্পা পিল্লাইয়ের কাছে। ব্যালে শিক্ষা নিতে শুরু করলাম বব দাসের কাছে। শরীর ঠিক রাখার জন্য ভর্তি হলাম বজরঙ্গ ব্যায়ামাগারে। কোরিওগ্রাফি শিখলাম মেজদা সুরেশ দত্তের কাছে। নাটক শিখলাম মুক্ত অঙ্গনের কাছে, কারণ সময় পেলেই নাটক দেখতে যেতাম সেখানে, কেউ পয়সা নিত না। আনন্দবাজারের দিকপাল সাংবাদিক প্রবোধবন্ধু অধিকারী ব্যবস্থা করে দিলেন, এক সপ্তাহ একটা সার্কাস পার্টির সঙ্গে থাকার জন্য। সেখানে শিখলাম শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠা কাকে বলে।

বাস প্যাসেঞ্জার, আমিও একদিন ছিলাম, চোর, মধ্যবিত্ত বাড়িতে টিভি এসেছে, মজুর, সেলুন, ফোটোগ্রাফার, কৈশোর-যৌবন-প্রৌঢ়ত্ব, জেলে, স্নানাগার, বৈদ্যুতিক গোলোযোগ, ছেলেটা, বেকার যুবক – আপনার মাইমের সব গল্প তো জীবন থেকে নেওয়া। আপনার সবচেয়ে পছন্দের মাইম কোনটা বা কোনগুলো?

‘বাস প্যাসেঞ্জার’, ‘চোর’, ‘পাস্ট প্রেজেন্ট ফিউচার’ সহ আরও অনেকগুলোই, বলতে গেলে সবগুলোই আমার মনের খুব কাছাকাছি। সব বাস্তব জীবনের গল্প। নিজের সময়কে তুলে ধরা। একটা মজার ঘটনা বলি, বুলগেরিয়ার সোফিয়াতে যখন ‘কাচের দেওয়ালে চোর’ করছি, দর্শকরা উঠে এসে দেখে গেছিল সত্যি কোনও কাঁচের দেওয়াল আছে কিনা। ইনিডিয়া তো ম্যাজিশিয়ানের দেশ, তাই বোধহয় কেউ বিশ্বাস করছিল না।

‘পোয়েট অফ সাইলেন্ট’—প্রথমবার কবে এই আখ্যা পেয়েছিলেন, মনে আছে?

আমার তখন নামডাক হয়েছে একটু। একদিন বম্বের বিকাশ ভট্টাচার্য নামের এক ভদ্রলোক এসে বললেন, তিনি বম্বের সব গুণীজনদের দেখাতে চান আমার এই শিল্প। বম্বেতে শো করতে পারা ভাগ্যের কথা, কারণ ওখানে তো তামাম শিল্পের সমাবেশ। বিড়লা মাতুশ্রী হলে আমার দুদিন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হয়েছিল। অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির সঙ্গে সেই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন বিশিষ্ট মারাঠি শিল্পী পি. এল. দেশপাণ্ডে। আমার সঙ্গে দেখা করে, আমাকে জড়িয়ে ধরে দু’গালে দুটি চুম্বন দিয়ে বলেছিলেন, এই শিল্প পশ্চিমবঙ্গেই সম্ভব। হিন্দুস্তান টাইমস আমাকে ‘চকোবয়’ বলে সম্বোধন করলো। টাইমস অফ ইন্ডিয়া আমাকে ‘পোয়েট অফ সাইলেন্ট’ আখ্যা দিল।

যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমির এখনকার প্রজন্ম

একবার নাকি দর্শকরা জুতো ছুঁড়েছিল আপনার অনুষ্ঠান দেখবে না বলে?

আমার প্রথম শো’র পরে, যুব সংঘ আমায় জানালো, সর্বভারতীয় যুব উৎসব হবে রঞ্জি স্টেডিয়ামে, সাতদিন ধরে। চারটে মঞ্চ তৈরি হয়েছিল, মূল মঞ্চে আমার অনুষ্ঠান। আমার আগে ছিলেন ভি বালসারা। তাঁর বাজনা শুনে দর্শকরা মুগ্ধ। আমার নাম ঘোষণা হতেই দর্শকরা খুব চেঁচামেচি করতে লাগলো—আমরা দেখবো না যোগেশ দত্ত’র অনুষ্ঠান, ওকে ফুটিয়ে দাও। আমি মঞ্চে আসতেই চারদিক থেকে জুতো ছোঁড়া শুরু হল। আমি সব জুতো এক জায়গায় জড়ো করলাম। তার মধ্যে কয়েকটা জুতো মাথায় নিয়ে দর্শকদের উদ্দেশে বললাম, আমাকে ১০ মিনিট সময় দিন। দর্শক তখন কিছুটা শান্ত হল। প্রথম মূকাভিনয় করলাম ‘বেকার যুবক’, পরে ব্যঙ্গকৌতুক করলাম, ‘আমি  বাঁচতে চাই’—একটি এমএ পাশ যুবকের বেকার জীবনের কাহিনি। করার পর আমি ইমোশনাল হয়ে গেলাম যে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। ইডেনের মাঝখানে যেখানে পিচ আছে, সেখানে অস্থায়ী বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিল। সেখানে আমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। জ্ঞান হতেই দেখি, বেড়ার চারদিকে অসংখ্য জনতা আমাকে ঘিরে রয়েছে। চোখ মেলতেই মুগ্ধ জনতা করতালিতে আমাকে উৎসাহিত করতে লাগলো।

অন্তন্ত দাস, খালেদ চৌধুরী, তাপস সেন, দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়, ভি বালসারা – আপনার মাইমে এঁদের ভূমিকা তো অনেক বড়ো…

আমার মেজদা পদ্মশ্রী সুরেশ দত্ত সিএলটি-তে যুক্ত থাকার দরুন অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সেসময়। খালেদদা আমার কস্টিউম বানিয়ে দিয়েছেন, আজকেই এই পোশাক ওঁরই অবদান। যখন প্রথম বিশ্ব যুব-উৎসবে সোফিয়া গেলাম, পি সি সরকার আমায় উপদেশ দিয়েছিলেন, বিদেশিরা তোমার মধ্য দিয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি দেখতে চায়। তারপর থেকে যখনই বিদেশে গেছি ওঁর কথা মতো, খালেদদার বানিয়ে দেওয়া ভারতীয় পোশাক, চোস্ত ও বেনিয়ান পরে শো করতাম। ভি বালসারার বানানো আবহসংগীতে ছিল কাঁসর ঘণ্টা, বাঁশের বাঁশি ও ঢাক-ঢোল। এই অনুষ্ঠান থেকেই তাপসদা আমার আলো করতে শুরু করেন। শুরুতেই ভরসা দিয়েছিলেন, ‘লাইটের জন্য চিন্তা করবি না, আমি আছি।’ অনন্ত দাসের অবদানের কথা তো আগেই বলেছি। কোনও নতুন কমিক বা নির্বাক কৌতুক করলে আগে ভানুদাকে (ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়) দেখাতাম। ভি বালসারা, দেবদুলালদা সবসময় আমাকে আগলে রাখার চেষ্টা করতেন।

আপনি মাইম-কে নিজের অস্ত্র/নিজের ‘স্টেটমেন্ট’ বানিয়েছিলেন, ব্যক্তি জীবনের ত্রুটি-বিচ্যুতি, অসঙ্গতি প্রকাশ্য মঞ্চে তুলে ধরে, বিশেষ রাজনৈতিক শিবিরের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, মূকাভিনয়ের মাধ্যমে কার্যত সেই একই কাজ কি এখনও  হচ্ছে?

হ্যাঁ। অল্প পরিমাণে হলেও হচ্ছে। অনেকে করছে। যে জীবনে স্ট্রাগল করেনি, তার অনুভূতি সত্ত্বা কম। মাইমের স্ক্রিপ্টে  বাস্তবতা না থাকলে বা যদি দেখা যায়, মাইম কমিকের সাবস্টিটিউট হয়ে গেছে, তাহলে বুঝতে হবে সেই মূকাভিনয় বেশি দূর যেতে পারবে না, মানুষও তা বেশিদিন মনে রাখবে না।

সন্দীপ কুমারের তোলা ছবি

এদেশে মাইমের ভবিষৎ কী? তরুণ প্রজন্ম কতটা ঝুঁকছে এদিকে?

মাইম-এর ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল, তার কারণ যে শিল্পটার জন্ম হয়েছিল ১৯৫৬-এ, এই ক’বছরে তা এ দেশে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়েছে। মাইম আগে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন, বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে মাইম যুক্ত হয়েছে। মাইম একটা ক্লাসিক ফর্ম। মাইমের ওপর ফেলোশিপ, স্কলারশিপ, জাতীয় পুরস্কার, আকাদেমি পুরস্কার চালু হয়ে গেছে।

পাখিদের যেমন কোনও সীমানা নেই, মাইম-ও শব্দহীন, মৌখিক ভাষাহীন বলে পৃথিবীর যেকোনও প্রান্তে যেকোনও মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। মূকাভিনয়কে তাই শিল্পের ‘বৈশ্বিক ভাষা’বলা হয়। আপনি নিজেই ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জার্মানি, সোভিয়েত রাশিয়া, ফ্রান্স, চেকোস্লোভাকিয়া, কানাডা, পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশেই পারফর্ম করেছেন এবং মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সুনাম ও সম্মান পেয়েছেন। বিশ্ব যুব উৎসবে বুলগারিয়ার সোফিয়াতে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন, ডিলিট পেয়েছেন, শিরোমণি পুরস্কার, সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন, নিজস্ব মূকাভিনয় সংস্থা পদাবলি ও পরে মূকাভিনয় শিক্ষাকেন্দ্র যোগেশ মাইম আকাদেমি প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফিল্ম ডিভিশন অব ইন্ডিয়ার উদ্যোগে নির্মিত তথ্যচিত্র – ‘সাইলেন্ট আর্ট অফ যোগেশ দত্ত’ ১৪টি ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়াও জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্সেও আপনার ওপর তথ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। ২০০৯-এ রবীন্দ্র সদনে শেষ পারফরমেন্সের দিন রেকর্ড সংখ্যক দর্শক হয়েছিল। শো শেষে শিশুর মতো কেঁদে ফেলেছিলেন, প্রিয় ‘নির্বাক কবি’-র এমন আবেগঘন মুহূর্তে ভিজেছিল দর্শকদের চোখও। সে ভিডিও ইউটিববে পাওয়া যায়।

৫০ বছরের দীর্ঘ যাত্রাপথের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। শেষ শো’র দিন স্বাভাবিকভাবেই খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। তখন আমি বুড়ো হয়েছি, শারীরিক অক্ষমতা এসেছে। মূকাভিনয়ের শো’তে তৎপরতার সঙ্গে এবং মুক্তভাবে শারীরিক চলাচলের প্রয়োজন, যা আমার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছিল।

শেষ মঞ্চ-উপস্থাপনার পর তো নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন  শিক্ষকতায়। শারীরিক বিশেষ ভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েদের দিয়ে পরিবেশন করিয়েছিলেন ‘খোল দ্বার’, যা আসলে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র রূপান্তর। তারপর থেকে এতগুলো বছর কেটে গেছে, পারিপার্শ্বে অনেক কিছু বদলে গেছে। এই পারিপার্শ্ব থেকেই তো আপনি রসদ পেতেন, অবসর নেওয়ার পর থেকে কখনও ইচ্ছে হয়নি মাইম করি?

হ্যাঁ, হয়েছে। আমি এখনও স্বপ্ন দেখি।

_______________________
সাক্ষাৎকার সহযোগিতা: সুমন সাধু

Written by