“বামেরা চায় ‘বাবু’ দলিত” – বলাগড়ের তৃণমূল প্রার্থী মনোরঞ্জন ব্যাপারী

মনোরঞ্জন ব্যাপারীর এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার

স্কুল-কলেজের ডিগ্রি তাঁর নেই। মুটে-মজুরি করেছেন, রিক্সা চালিয়েছেন, মেথরের কাজ করেছেন, রান্নার কাজও করেছেন। এর মধ্যেই সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য সাহিত্য। পশ্চিমবঙ্গ দলিত সাহিত্য আকাদেমির সভাপতি পদে থাকার পর এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি বলাগড় কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী। সেই মনোরঞ্জন ব্যাপারী একান্ত সাক্ষাৎকারে জানালেন ভোটের ময়দানে তাঁর লড়াইয়ের কাহিনি। 

লেখালেখির জগতে আপনি যথেষ্ট পরিচিত নাম। সংসদীয় রাজনীতির আঙিনায় কেন পা রাখলেন? 

আমি যে সব দরিদ্র দলিত নিপীড়িত মানুষদের কথা লিখছিলাম, লিখে তাঁদের কোনো উপকার তো করতে পারছিলাম না। রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হলে আমি তাঁদের জন্য কিছু করতে পারব।  তাই আমি ভোটে দাঁড়ালাম।

একজন রিক্সাওয়ালা থেকে বিধানসভা প্রার্থী – এই জার্নি আপনার কেমন লাগছে? 

সেরকম অনুভূতি কিছুই হচ্ছে না। কারণ একটা লড়াই আমি চল্লিশ বছর ধরে লড়েছি। জীবনে বহু রকম চাপের মোকাবিলা করতে হয়েছে। তার মধ্যেই আমাকে লিখতে হয়েছে। তার পরিণতিতে মাননীয়া দিদি মনে করেছেন, এই দায়িত্ব আমার হাতে দিলে ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারব। বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া আমার চলার পথে একটা মাইলস্টোন। 

আপনি যে রিক্সায় চড়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলেন, তার প্রভাব কি ভোট বাক্সে পড়বে? 

পেট্রোল-ডিজেলের যা দাম বাড়ছে, তার বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি প্রতিবাদ। দ্বিতীয়ত আমি একজন শ্রমজীবী মানুষ, সেটাও মানুষকে জানিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। সবাইকে বলে দেওয়া, যে আমি ‘বাবু’ সমাজের লোক নই। খেটে খাওয়া সমাজের লোক। এটাই ছিল উদ্দেশ্য। 

আপনি এখন দলিত সাহিত্য আকাদেমির সভাপতি। বিধায়ক হলে কি সেই কাজে সময় দিতে পারবেন? 

আমি দলিত সাহিত্য আকাদেমির সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিয়েছি। ভোটে জিতলে এটা নিয়ে পরে ভাবব। 

বামেরা দলিতদের উন্নয়নে কতটা আগ্রহী বলে মনে করেন?

আমি এক বাম নেতার ইস্কুলে রান্নার কাজ করতাম। বলতাম, উনুন থেকে মাত্র ১০ হাত দূরে আমাকে সরিয়ে দাও। যাতে আমি লিখতে পারি। কত বছর ধরে এই আবেদন করেছি। কর্ণপাতই করেনি। বামেরা তো লেখাপড়া জানা ‘বাবু’ দলিত চায়। প্রকৃত দলিতদের নিয়ে ওরা কিছুই ভাবে না। 

আব্বাস সিদ্দিকির আইএসএফ-এর ছাতার তলায় বহু দলিত এবং আদিবাসী সংগঠন একত্রিত হয়েছে। এই নিয়ে আপনার কী মতামত? 

এরা কিছু অঞ্চলে খানিকটা ভোট কাটবে। আর কিছুই করবে না। মায়াবতীরও তো দলিত সংগঠন। তারা রামবিলাস পাসোয়ান, উদিত রাজদের পদলেহন করছে। দলিত সংগঠন মানেই দলিতদের হিতৈষী নয়। 

দলিত-বিরোধী বলে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের একটা পরিচিতি গড়ে উঠেছে। তা সত্ত্বেও বহু সংখ্যক দলিত যোগ দিচ্ছেন বিজেপিতে। এর কারণ কী? 

অনেক মানুষই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আবার ফিরে এসেছেন। মতুয়াদের অনেকেই বুঝতে পেরেছেন, বিজেপি তাঁদের নাগরিকত্ব হরণ করছে। তাঁরা তো ভারতের নাগরিক ছিলেন। ২০০৩ সালে একটা বিল এনে নাগরিকতা কেড়ে নিল বিজেপি। এখন তারাই বলছে নাগরিকত্ব্ দেবে। যে শর্তগুলো চাপিয়েছে, কেউ পূরণ করতে পারবে না। যে সব দলিতদের মধ্যে বিজেপি মুসলিম-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, তাঁরাও অনেকে বুঝে গিয়েছেন যে এই বিভাজন ঠিক নয়। বিজেপির প্রচুর ছেলে আমার সঙ্গে চলে এসেছে। আমার সমর্থনে কাজ করছে এখন। 

বলাগড় কৃষিপ্রধান অঞ্চল। কৃষকদের জন্য কী কী কাজ করার ভাবনা আছে?

এই মুহূর্তে আমি কোনও ঘোষণা করব না। মানুষ বুঝে গিয়েছে, ঘোষণা দিয়ে কিছু হয় না। যে কাজ করে, ঘোষণা করার দরকার তার হয় না। “১৫ লক্ষ টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকে যাবে” – এই ঘোষণা এবং তার ফলাফল তো দেখলেনই। তাই আমি এসবের মধ্যে যাচ্ছি না। ভোটে জেতার পর মানুষকে নিয়ে বসব। মানুষ আমাকে যা পরামর্শ দেবে, সেই অনুযায়ী ঠিক করব, কোনটা আগে করা যায়, কোনটা পরে। 

বলাগড়ের মাটি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যের কথা মাঝেমাঝে খবরের কাগজে উঠে আসে। সেই দুর্নাম আপনি কতটা ঘোচাতে পারবেন? 

সে সব আমি দেখে নেব। এগুলো নিয়ে এখন ভাবছিই না। বরং ভাবছি গঙ্গার ভাঙন নিয়ে। এখানকার পেঁয়াজ খুব বিখ্যাত। পেঁয়াজ চাষিদের নিয়ে কী করা যায়, সেটাও দেখব পরে। 

বাম প্রার্থী মহামায়া মণ্ডল এবং বিজেপি সুভাষচন্দ্র হালদারের চেয়ে বলাগড়ের জনগণের কাছে আপনার বার্তা কতখানি আলাদা? 

আমার সামনে বলাগড়ের অন্য প্রার্থীদের কিছু মনে করছি না। ওরা খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। বিজেপি শুধু টাকার জোরে পতাকা টাঙিয়ে রাখছে। প্রত্যেক জনসভায় ওদের ৭-৮ জন লোক হচ্ছে। আমার সবথেকে ছোটো মিছিলেও ২ হাজারের মতো লোক হয়। ২০-২২টা র‍্যালি করলাম। প্রত্যেকটায় ৩-৪-৫ হাজার লোকের ভিড়। ওদের সবক’টা র‍্যালি মিলিয়ে এরকম একটা করতে পারবে? আমার নিজস্ব যে পরিচিতি, তার সামনে বিজেপি কিংবা সিপিএম প্রার্থী দাঁড়াতে পারবে? 

নির্বাচনে আপনার জন্য শুভেচ্ছা রইল।

আমি তো জিতবই। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি হারবেই। ওরা প্রার্থী পাচ্ছে না, বুথের এজেন্ট পাচ্ছে না। এমপিদের ভোটে দাঁড় করাতে হচ্ছে। টাকা দিয়ে সব কিনে নেওয়া যায় নাকি? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার ক্ষমতায় আসবেন। 

 

Developed by DXDasia