এক পুনর্ব্যবহারযোগ্য কবরস্থান করুণা কুঞ্জ
হ্যাঁ, এই ব্যস্ত শহর থেকে কিছুটা আড়ালে যেতে হবে আপনাকে। ঠাকুরপুকুর থেকে কিলোমিটার বারোর পথ। এক সবুজ ঘেরা জায়গা। জালের বেড়া। এক লোহার গেট খুলে সেখানে ঢুকলে শুনতে পাবেন ঘুমিয়ে থাকা অনেকগুলো প্রাণের অস্তিত্বহীনতার শব্দ। ঠিকই ধরেছেন। করুণা কুঞ্জ। কলকাতার বুকের দক্ষিণ দিকে একচিলতে মায়া। পেট সিমেট্রি। এক পুনর্ব্যবহারযোগ্য কবরস্থান এটি। গত আড়াই দশকে যেখানে জায়গা পেয়েছে প্রায় ৬০০০ অবলা প্রাণী। সারা বিশ্ব জুড়ে যখন পুনর্ব্যবহারযোগ্য কবরস্থানের ধারণা ঢুকছে মানুষের ক্ষেত্রে, সেই সময় দাঁড়িয়ে কলকাতায় তৈরি হয় করুণা কুঞ্জ। এমন এক পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ার দ্বারা নিজেদের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন তাঁরা।
গত পঁচিশ বছর যাবৎ ইউনাইটেড কিংডম-এর একটি মুভমেন্টের মানুষ দাবি করেন কবরে কোনওরকম সিন্থেটিক কেমিক্যাল অথবা প্রিজার্ভেটিভ না দিয়ে জৈব পচনশীল বাক্সে করে মানুষের দেহ রাখা হোক। যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটিতেই মিশে যাবে মানুষ। জায়গাটি চিহ্নিত করতে লাগানো হোক গাছ। সেই দেহ থেকে তৈরি সারেই বেড়ে উঠুক গাছ। এক প্রাণ থেকে বেঁচে উঠুক অন্য প্রাণ। এই একই ধারণা সঙ্গে নিয়ে চলছে করুণা কুঞ্জ।
সাল ২০০০, এপ্রিল মাস নাগাদ বনমন্ত্রী যোগেশ বর্মনের হাতে উদ্বোধন হয় করুণা কুঞ্জের পক্ষীশালা। যেখানে উদ্ধার করা অসুস্থ ও কিছু বিপন্ন পাখিদের আশ্রয় দেওয়া হত। এখানে তাদের আশ্রয়ের পাশাপাশি দেওয়া হয় চিকিৎসা। সুস্থ হয়ে উঠলে সম্পূর্ণ রূপে ছেড়ে দেওয়া হত পরিবেশেই। ২০০১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কলকাতা শহরে একটি দোকানের বাইরে উদ্ধার হয় বেঁধে রাখা একটি অন্ধ বানর। বনদপ্তর সেই বানরটিকে দিয়ে আসে করুণা কুঞ্জে। পরে নরেন্দ্রপুরে চিন্তামণি কর স্যাংচুয়ারি তৈরি হওয়ায় বন্ধ করে দেওয়া হয় এই পক্ষীশালা। পাখির বদলে উদ্ধার করা জন্তুদের জন্য খুলে দেওয়া হয় এই আশ্রয়। এর পাশাপাশি একটি ক্যাট শেল্টার ও একটি ডগ শেল্টার চালানো হয় এখানে।
আরও পড়ুন
এক প্রচারবিমুখ মিউজিয়াম
বহু মানুষ তাঁদের সন্তানস্নেহে বড়ো করা পোষ্যটির শেষ সময়ের জন্য এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন। এ সমাজে মানবতার চিহ্ন কমে আসছে দিনকে দিন। কোথাও কুকুরের লেজে কালিপটকা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও গরম পিচ ঢেলে দেওয়া হচ্ছে ঘুমন্ত অবলা প্রাণীর গায়ে। আর ছোটোখাটো ঢিল বা ভাতের ফ্যান ঢেলে দেওয়া তো রোজই চলছে কোথাও না কোথাও। এরপরও কিছু মানুষ ভালোবাসে তাদের। নর্দমা থেকে তুলে এনে ট্যাক্সি নিয়ে ছোটে এই ক্লিনিক সেই ক্লিনিক। নিজের সমস্ত দিয়েও শেষমেশ বাঁচাতে না পারলে তাঁর শান্তির ঘুমটুকুর ব্যবস্থা করেন এই মানুষগুলি। কেবল ভালোবাসা থেকে এই সেবা করে যাচ্ছেন গত পঁচিশ বছর। সমাজের এই নিশ্চুপ সদস্যদের কবরস্থানে একদিন পারলে ঘুরে আসুন। ক্ষতবিক্ষত এই শহরে একচিলতে মানবতা খুঁজে পাবেন সেখানে। পাবেনই…