“ইনকিলাব জিন্দাবাদ” : শতবর্ষ পূর্ণ হল এই বিপ্লবী উচ্চারণের

“ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানটি এল কোথা থেকে?

ভারতে কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিবাদী আন্দোলনের স্লোগান হয়ে উঠেছিল, “বন্দেমাতরম”। কিন্তু সারা দেশে খিলাফত আন্দোলন শুরু হলে মহম্মদ আলি জিন্না (Muhammad Ali Jinnah) রাজনৈতিক প্রতিবাদ বলে মনে করেননি। কিন্তু গান্ধিজি (Gandhi) অবিভক্ত ভারতের জাতীয় আন্দোলনের মঞ্চে মুসলমান সমাজকে অংশীদার করার তাগিদে খিলাফত আন্দোলন সমর্থন করেন। বলতে গেলে সেই সময় থেকেই “বন্দেমাতরম” (Vande Mataram) স্লোগান নিয়ে আপত্তি উঠতে থাকে।

ততদিনে এই কথাও জানাজানি হয়ে গেছে যে, বঙ্কিচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ (Ananda Math) উপন্যাসে সনিবিষ্ঠ “বন্দেমাতরম” কবিতাটি আসলে হিন্দু মূর্তি পূজারই প্রতিচ্ছবি। এই কবিতা বঙ্কিম “আনন্দমঠ” লেখার আগেই রচনা করেছিলেন। এই উপন্যাস লেখা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রথম সংস্করণ-এর পর থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র কাহিনির বয়ান বদলাতে থাকেন। এবং পঞ্চম সংস্করণে তা কার্যত একটি মুসলমান বিরোধী কাহিনিতে পরিণত হয়। সেই কারণেই কংগ্রেস নেতারাও “বন্দেমাতরম”-কে জাতীয় সংগীত হিসেবে বেছে নেননি। তাঁরা রবীন্দ্রনাথের “জনগনমন”-কেই সেই মর্যাদা দিয়েছিলেন।

এই সময়ে প্রতিবাদ মুখরতার একটা ধরতাই বুলি জরুরি হয়ে পড়েছিল। কিন্তু একথাও ঠিক অবিভক্ত ভারতে তো বটেই এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কংগ্রেস নেতা-কর্মীরা “বন্দেমাতরম” স্লোগানটি বিসর্জন দেননি। বরং স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকে আজ পর্যন্ত কংগ্রেস এই স্লোগানই ব্যবহার করে আসছে। দেখা যাচ্ছে, বিজেপিরও ওই স্লোগান অপছন্দ নয়। আর জিন্নার মুসলিম লীগ গোড়া থেকেই “আল্লাহ আকবর” ব্যবহার করে চলেছে।

ফার্সি ভাষার “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” শব্দ দু’টির অর্থ হল, “বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক”। গান্ধির অহিংস নীতির সমর্থক কংগ্রেস দলের পক্ষে এই স্লোগান অনুমোদন করা সম্ভব ছিল না।

তাহলে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” (Inquilab Zindabad) স্লোগানটি এল কোথা থেকে? এই প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। এই শব্দদুটি ফার্সি ভাষা থেকে নেওয়া। ইংরেজ ভারত শাসনকালেও এই দেশে খুব সহজে ইংরেজি শিক্ষিত কেরানি তৈরি করতে পারেনি। ফলে সারা দেশেই আরবি – ফার্সি- হিন্দি – উর্দু ভাষারও প্রচলন ছিল। এমনকি বাংলা ভাষার মধ্যেও অনেক ফার্সি শব্দ ঢুকে গেছে। এটা বিভিন্ন ভাষার একটা বৈশিষ্ট্য। সব ভাষাকেই সময়ের প্রয়োজনে loan word ব্যবহার করতে হয়। আজকাল বি বি সি-এর ইংরেজি বুলেটিনেও “পুলিশ বন্দোবস্ত” শব্দের ব্যবহার শোনা যায়।

ফার্সি ভাষার “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” শব্দ দু’টির অর্থ হল, “বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক”। গান্ধির অহিংস নীতির সমর্থক কংগ্রেস দলের পক্ষে এই স্লোগান অনুমোদন করা সম্ভব ছিল না। কারণ বিপ্লব বলতে তখন বোঝাতো, ফরাসি বিপ্লব, প্যারিস কমিউন এবং হাতে গরম রুশ বিপ্লব – যেসব রাজনৈতিক উত্থানের মধ্যে হিংসার বাতাবরণ ছিল।

অথচ স্লোগানটি প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল ১৯২১ সালে আমেদাবাদের কংগ্রেস (Congress) অধিবেশনে। স্লোগানটি প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন, মওলানা হসরত মোহানী (Maulana Hasrat Mohani)। তিনি সেই সময়ে একজন প্রতিষ্ঠিত উর্দু কবি ছিলেন। ইদানিং কালের গুলাম আলি বা জগদীপ সিংও তাঁর লেখা গজল গেয়েছেন। তবে কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে হসরত মোহানীর এই স্লোগান উচ্চারণ করার একটা পটভূমি আছে।

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব নিয়ে তখন অস্পষ্টতা থাকলেও তার প্রতি অনেকেই অনুরাগী হয়ে পড়েছিলেন। সেই তালিকায় স্বামী বিবেকানন্দের ছোটো ভাই ভূপেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন ঠাকুরের নাতি সৌম্যেন ঠাকুর, স্বরোজিনী নাইডুর দাদা বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন। তাছাড়া মুজফ্ফর আহমেদ বা এস. এ ডাঙ্গেরা তো ছিলেনই। হসরত মোহানীও তখন সেই গোষ্ঠীভুক্ত ছিলেন। আমেদাবাদ অধিবেশনেই তিনি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন। যদিও গান্ধি সহ কোনো কংগ্রেস নেতাই তা অনুমোদন করেননি।

স্লোগানটি জনপ্রিয়তা লাভ করতে প্রায় এক দশক সময় নেয়। ১৯২৮ সালে ভগৎ সিং এবং তাঁর সহযোগীরা যখন কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা বিস্ফোরণ করেন, তখন তাঁরা “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগান দিয়েছিলেন।

আসলে তার আগের বছরেই ১৯২০ সালে, তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়েছে। লেনিন সেই দলকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন বাঘাযতীনের সহযোগী বারুইপুরের ছেলে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য – তিনিই পরে মানবেন্দ্রনাথ রায় বলে পরিচিত হন। রায় বিদেশে বসেই ঠিক করেন, আমেদাবাদ অধিবেশনে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব তোলা হবে। সেইমতো তাঁর এবং অবনী মুখার্জীর সই করা লিফলেট ভারতের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। সেইসব লিফলেট হয়তো পুলিশের তৎপরতার জন্য মুজফ্ফর আহমেদ বা ডাঙ্গের ঠিকানায় পৌঁছায়নি। কিন্তু আজমীরে সাম্যবাদী মনোভাবাপন্ন একটি গোষ্ঠীর হাতে সেই বিবৃতির কপি এসে পৌঁছয়। তারাই সেই বান্ডিল নিয়ে আমেদাবাদ যান। সেখানে হসরত মোহানী এবং বিপ্লবী কুমারানন্দ সহ অনেকেই তা সম্মেলনে বিলি করেন। সেই সূত্রেই মওলানার মুখ থেকে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগানটি বেরিয়ে আসে।

কিন্তু স্লোগানটি জনপ্রিয়তা লাভ করতে প্রায় এক দশক সময় নেয়। ১৯২৮ সালে ভগৎ সিং এবং তাঁর সহযোগীরা যখন কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা বিস্ফোরণ করেন, তখন তাঁরা “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগান দিয়েছিলেন। এমনকি ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগেও তাঁদের শেষ উচ্চারণ ছিল “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”। তার পর থেকেই ভারতে প্রধানত বামপন্থীদের কাছে এই স্লোগান আদরণীয় হয়ে ওঠে।

মওলানা হসরত মোহানী ১৯৫১ সাল পর্যন্ত বেঁচেছিলেন। ১৯২৫ সালে কানপুরে কমিউনিস্টরা যে সম্মেলনে মিলিত হন সেখানেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তবে হসরত মোহানী ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক করতে চাননি। একটা সময়ে তিনি মুসলিম লীগেও যোগ দেন। সেই কারণে তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু দেশভাগের পর তিনি একদিনের জন্যও পাকিস্তানে যাননি। কারণ, হসরত মোহানী বরাবর দেশভাগের বিরুদ্ধে ছিলেন।

তাঁর জীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড আজও অনেকে মনে রেখেছেন। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি ছাত্রাবাস আছে। কানপুরে রয়েছে, তাঁর নামে একটি হাসপাতাল। পাকিস্তানের করাচি শহরে তাঁর নামাঙ্কিত রাস্তা আজও বর্তমান।

১৯২১ সালে আমেদাবাদ অধিবেশনে মওলানা হসরত মোহানী দুটি ঐতিহাসিক দাবি উচ্চারণ করেছিলেন। প্রথমটি, “ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চাই” – দ্বিতীয়টি, “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”। এই বছরই ওই দুই বিপ্লবী উচ্চারণের শতবর্ষ পূর্ণ হল।

*মতামত লেখকের নিজস্ব। কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।

 

Developed by DXDasia