বন্দেমাতরম, ইনকিলাব জিন্দাবাদ হয়ে আমরা এসে পৌঁছলাম জয় শ্রীরামে!

ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানের জন্ম ১৯২১ সালে, ততদিনে রুশ বিপ্লব ঘটে গিয়েছে

অনেকে মিলে কোনও একটি কাজ করার সময় এক সুরে কিছু বলার চল বহুকালের। যেমন অনেক সময়ই রাস্তায় কেবলের তার টানার সময় শ্রমিকদের গলায় ‘অউর থোড়া হেঁইও’ জাতীয় আওয়াজ শোনা যায়। আগে যখন বাড়ির ছাদকে মজবুত করতে ছাদ পেটাতে হত, তখন ছাদ পেটানোর গান শোনা যেত। এই সূত্র ধরেই বলা যায়, রাজনীতিতে স্লোগানের জন্মের ইতিহাস বহু পুরোনো। আধুনিক ভারতের রাজনীতিতে প্রথম স্লোগান ‘বন্দেমাতরম’ (Vande Mataram)। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় প্রথম শোনা গেল এই স্লোগান।

বঙ্কিমচন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ সম্পাদনা করেছিলেন ১৮৭২-১৮৭৬। এই সময় একবার তিনি টানা ৮ মাস ছুটি নিয়ে নৈহাটির কাঁটালপাড়ায় নিজের বাড়িতে ছিলেন। তখনই বন্দেমাতরম গান লেখা বলে মনে করা হয়। ‘আনন্দমঠ’ লেখা তার কিছুটা পরে। বঙ্গদর্শনে ধারাবাহিক প্রকাশিত হওয়ার পর ১৮৮২-তে আনন্দমঠ বই প্রকাশ। আনন্দমঠে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল বন্দেমাতরম গানটি। বঙ্কিমচন্দ্র সম্ভবত অনুমান করেছিলেন, বন্দেমাতরম একদিন পরাধীন ভারতে মন্ত্রসংগীত হয়ে উঠবে। কখনও বঙ্গদর্শনে লেখা কম পড়লে ‘ছাপাখানার পণ্ডিতমশাই’ বঙ্কিমের সামনে এসে দাঁড়াতেন। আর বঙ্কিম হাতে হাতে নতুন কিছু লিখে দিতেন। একবার ওইরকম ‘ছাপাখানার পণ্ডিতমশাই’ বঙ্কিমের কাছে লেখা চাইতে গেলেন। তখন টেবিলের উপর একটা কাগজে বন্দেমাতরম গান লেখা ছিল। পণ্ডিতমশাই সেটি চান। তিনি বলেন, ‘এটা মন্দ হয়নি, এটা দিন’। বঙ্কিমচন্দ্র বিরক্ত হয়ে কাগজটা দেরাজে তুলে রেখে বলেছিলেন, এটা ভাল কী মন্দ এখন তুমি বুঝতে পারবে না। কিছুকাল পরে বুঝবে। 

একবার ওইরকম ‘ছাপাখানার পণ্ডিতমশাই’ বঙ্কিমের কাছে লেখা চাইতে গেলেন। তখন টেবিলের উপর একটা কাগজে বন্দেমাতরম গান লেখা ছিল। পণ্ডিতমশাই সেটি চান। তিনি বলেন, ‘এটা মন্দ হয়নি, এটা দিন’। বঙ্কিমচন্দ্র বিরক্ত হয়ে কাগজটা দেরাজে তুলে রেখে বলেছিলেন, এটা ভাল কী মন্দ এখন তুমি বুঝতে পারবে না। কিছুকাল পরে বুঝবে। 

সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘নির্বাচিত ধ্রুবপদ’, প্রথম খণ্ডে ‘বন্দে মাতরম-এর সুর: উৎস ও বৈচিত্র্য’ নামের প্রবন্ধে অনন্তকুমার চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘নিজের কন্যাকে তিনি (বঙ্কিমচন্দ্র) একবার বলেছিলেন, ‘একদিন দেখিবে- বিশ ত্রিশ বৎসর পর একদিন দেখিবে এই গান লইয়া বাঙালা উন্মত্ত হইয়াছে- বাঙালী মাতিয়াছে’। 

 ১৮৯৪-র ৮ এপ্রিল বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যু। আনন্দমঠ প্রকাশের ১৪ বছর পর ১৮৯৬ সালে কলকাতার বিডন স্কোয়ারে, এখন যেটা রবীন্দ্র কানন, সেখানে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়েছিল। সেখানেই রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন বন্দেমাতরম গান। ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, কেউ কেউ নাকি সে গান শুনে কেঁদে ফেলেছিলেন। আর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় শোনা গেল বন্দেমাতরম স্লোগান। যাকে বলা হল দেশাত্মবোধের বীজমন্ত্র।

আরও একটা কথা এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে। বঙ্গদর্শনে যখন আনন্দমঠ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তখন ‘বন্দে’ এবং ‘মাতরম’ ছিল আলাদা দুটো শব্দ। আনন্দমঠ উপন্যাসের পঞ্চম সংস্করণ পর্যন্ত সেটাই ছিল। তার পর থেকে হয় একটি শব্দ, ‘বন্দেমাতরম’।

এই ‘বন্দেমারতম’, দেখা যাচ্ছে পিছু হটছে হিন্দুত্ববাদীদের আমলে। পিছু হটছে কারণ, হিন্দুত্ববাদীদের অতীত ইতিহাসে এমন একজন নেতা-কর্মীও নেই যিনি দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বন্দেমাতরম বলতে বলতে ফাঁসির মঞ্চে প্র্রাণ দিয়েছিলেন। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই ইতিহাস তাঁরা ভুলে যেতে চান। ভুলে থাকতে চান। সে কারণেই জয় শ্রীরাম স্লোগানে তারা মুখরিত করে তুলতে চাইছেন সারা ভারত।

ইনকিলাব জিন্দাবাদ (Inquilab Zindabad) স্লোগানের জন্ম বন্দেমাতরমের কিছুটা পরে ১৯২১ সালে। ততদিনে রুশ বিপ্লব ঘটে গিয়েছে। তখন পৃথিবী জুড়ে সাম্যবাদের স্বপ্ন। এই রকম সময়ে সমাজতন্ত্রী, স্বাধীনতা সংগ্রামী কবি মৌলানা হসরত মেহানির কলম থেকে বেরোয় এই স্লোগান। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। যার অর্থ বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক। বিপ্লব অবশ্য খুব একটা দীর্ঘজীবী হয়নি। রুশ বিপ্লবের পতন হয় ১৯৯১ সালে। পতনের পর সে দেশের মহাফেজখানা থেকে যে সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে তাতে সোভিয়েতে জীবনের ভয়ঙ্কর অমানবিক এক শাসন ব্যবস্থার কথাই স্পষ্ট হয়েছে। অন্য দিকে চিনে চলছে গণতন্ত্রহীন বাজার নির্ভর একনায়কতন্ত্র। যা দেখে নতুন করে করে কোনও তরুণ বা তরুণীর চিনের মতো সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখার সম্ভাবনা কম। এই স্বপ্নের মৃত্যু এক শূন্যতার জন্ম দিয়েছে সন্দেহ নেই। বিপরীতে দেশে দেশে জন্ম নিচ্ছে ‘ইলেক্টেড অটোক্র্যাসি’। ‘মেজরিটারিয়ান স্টেট’, ‘এথনিক ডেমক্র্যাসি’। 

সম্প্রতি পাঞ্জাবে আপ নির্বাচনে জেতার পর কেজরিওয়ালকে দেখা গেল ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান দিচ্ছেন। এত দিন এই স্লোগান বামপন্থীদের মধ্যেই আটকে ছিল। হসরত মোহানি  ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানের জন্মদাতা হলেও বিভিন্ন লেখা এবং বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে এই স্লোগানকে জনপ্রিয় করেছেন শহিদ ভগৎ সিং।

সম্প্রতি পাঞ্জাবে আপ নির্বাচনে জেতার পর কেজরিওয়ালকে দেখা গেল ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান দিচ্ছেন। এত দিন এই স্লোগান বামপন্থীদের মধ্যেই আটকে ছিল। হসরত মোহানি (Maulana Hasrat Mohani) ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগানের জন্মদাতা হলেও বিভিন্ন লেখা এবং বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে এই স্লোগানকে জনপ্রিয় করেছেন শহিদ ভগৎ সিং। ভগৎ সিংদের রাজনৈতিক সংগঠন ‘হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোশিয়েশনের স্লোগান ছিল ইনকিলাব জিন্দাবাদ। একই সঙ্গে এটা ছিল অল ইন্ডিয়া আজাদ মুসলিম কনফারেন্সের স্লোগান (সূত্র: ইনকিলাব জিন্দাবাদ, লেখক, প্রথমেশ শিরভাতে)। ১৯২৯-এ দিল্লির সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে বোমা ছোড়ার পর ভগৎ সিং-এর মুখে ছিল এই স্লোগান, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। দিল্লি হাইকোর্টে বিচারের সময়ও তাঁদের গলায় ছিল এই আওয়াজ। জয় শ্রীরাম (Jai Shree Ram) নয়।

যদিও মানতেই হবে, বন্দেমাতরম, ইনকিলাব জিন্দাবাদ হয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছি জয় শ্রীরামেই।

*মতামত লেখকের নিজস্ব। কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।

Developed by DXDasia