
উনিশ শতকে বাংলা গানে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে পড়েছিল সামাজিক নানা উপাদান
ইতিহাস শব্দটার আগে নিষ্ঠুর বিশেষণের প্রয়োগ খুব পুরোনো। তবে ঐ নিষ্ঠুর ইতিহাসের সঙ্গে টানাপোড়েনে সচরাচর ভূমিকা নেন রাজা-রাজড়ারা। নানা ক্ষমতার অলিন্দে এক রাজা আসে, অন্য রাজা যায়। ইতিহাস মানে শাসকবদলের ইতিহাস, এটা আমরা একরকম স্বতঃসিদ্ধ ধরেই নিয়েছি। যদিও আমরা কেউই অস্বীকার করি না, রাজনীতির পালাবদলের ইতিহাসের পাশে পাশে সামাজিক ও শিল্পসাহিত্যেরও একরকম ইতিহাস থাকে। সাধারণত সেই ইতিহাসের উল্লেখে ট্রাজিক শব্দটা ব্যবহার করতে আমরা পছন্দ করি না। কিন্তু শিল্পসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু ট্রাজেডি থাকে যা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, কারণ, তার মধ্যে কোনও ক্ষমতার উত্থানপতন থাকে না। কিন্তু বেদনার উপখ্যান থাকে। বাংলা গানের যে আজ পর্যন্ত কোনও প্রামাণ্য ইতিহাস নেই, এটা এমনই এক দুঃখের কথা।
ইতিহাস লিখতে আরম্ভ করলে তার অনেক রকম গবেষণার প্রান্ত উন্মোচিত হয়, না লিখলে হয় না। বাংলা ভাষায় সাহিত্য অন্যান্য শাখাগুলির নিয়ে যে চর্চা ও গবেষণা, গান নিয়ে তেমন কিছু নেই। ফলে বাংলা গানের শরীরে সামাজিক উপাদান ঠিক কেমনভাবে ধরা দিল বা না দিল না তার কোনও স্পষ্ট হদিশ আমাদের কাছে নেই। কিন্তু আরও পাঁচটা শিল্পমাধ্যমের মতো গানও স্বয়ম্ভু নয়, যিনি বা যারা সেগুলি রচনা করেন তারা সামাজিক মানুষ – সমাজ তাঁদের মনে-মননে-অবচেতনে ছায়া ফেলে, ফেলাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ছায়া-আবছায়ার হদিশ আমরা খুঁজে দেখি না। কারণ, গান তো শুধু শোনার জিনিস! কিন্তু উনিশ শতকের নবজাগরণের আশেপাশে যখন বাবু কালচারের রোশনাই পুরোপুরি অস্তমিত হয়নি তখন লোকগান, কবিগানের একটা ধারায় সমকালীন সমাজ ছাপ ফেলেছে। কবিগানের লড়াইয়ে, জেলেপাড়ার সং-এর গানে নানা ধরনের সামাজিক ছবি প্রতিফলিত হত। বলতে গেলে এইসব গান যাঁরা বাঁধতেন (লিখতেন কথাটা ঠিক তখন প্রচলিত ছিল না), তাঁরা গানটাকে দেখতেন একটা সামাজিক উচ্চারণ হিসেবে। আর গান বাঁধা কথাটার ব্যঞ্জনা বলতে বোঝাতো গান লিখে তার প্রকাশ্য পরিবেশনার একটা পরিকল্পনাও করা। কারণ, মোটামুটি সেই সময়ে গান যারা লিখতেন, গাইতেন তাঁরাই। আর গানের উপাদান তাঁরা সংগ্রহ করে নিতেন সমকালীন সমাজ থেকে। কীর্তন, পদাবলী বা অন্যরকমের গানে যেখানে আধ্যাত্মরসের প্রাবল্য সেখানে গানের উপাদান মূলত ভক্তিরস, ধর্মতত্ত্ব, দেবদেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা। কিন্তু এই ধরনের গানের পরিসর ছিল সীমাবদ্ধ।
অন্যদিকে সামাজিক কোনও ঘটনা নিয়ে গান লিখে প্রকাশ করলে সাধারণ মানুষের তা নজরে পরে বেশি। যেমন বিদ্যাসাগর যখন বিধবাবিবাহ নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছিলেন, তখন তাঁকে বিদ্রুপ করে গান বাঁধা হয়েছে। সে গান বেশ জনপ্রিয় হয়েছে, কারণ, সাধারণ মানুষ বিধবাবিবাহের পক্ষে ছিলেন না। রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু) যখন বাংলা গানে ব্যক্তিজীবনের প্রণয়কে একেবারে লিরিকের কাঠামোয় ধরতে চাইছেন, নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিচ্ছেন এক স্বামীহারা যুবতীকে – তাঁকে বিদ্ধ করে ছুটে আসছে এক ধরনের গান। আজকের ভাষায় যা পাবলিকে বেশ খাচ্ছে। কারণ, পাবলিক মনে করে নিধুবাবু ‘নষ্ট মেয়েছেলে’কে ঘরে তুলেছেন! শ্যামাসংগীত বা কীর্তন দিয়ে এই পাবলিকে খাওয়া গান তৈরি সম্ভব ছিল না। আর জনপ্রিয় হচ্ছে বলেই তার গুণগত মানের অধোগতি নিয়ে আপশোষ করা বৃথা। কারণ, সাধারণ মানুষ সচরাচর তার চারপাশের জগতকেই যে কোনও মাধ্যমে প্রতিফলিত দেখতে চায়, তার সঙ্গে নিজেকে সহজে মেলাতে পারে। সেই কারণেই পাবলিক রোজ খবরের কাগজ পড়ে, ক্লাসিক পড়ে না, সিরিয়াল দেখে, ভালো ফিল্মের ধারকাছ দিয়েও হাঁটে না।
কিন্তু ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখলে বাংলা গানের মধ্যে সামাজিক উপাদানের যে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে পড়া, তার সূত্রপাত হয়েছিল উনিশ শতকেই। আরেকটু পরে, একদিকে ব্রাহ্মধর্মকে কেন্দ্র করে যে ধর্মসংস্কার আন্দোলন ও পরে আবার হিন্দুধর্মের যে পুনরুত্থান, এই দুই ক্ষেত্রেই গানের ভূমিকা আছে। ধর্মসংস্কারকে যারা সমাজসংস্কারের প্রত্যঙ্গ বলে ভেবেছেন, তাঁদের গানে তার ছাপ আছে। রাজা রামমোহন রায় বা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ যেসব ব্রহ্মসংগীত রচনা করেছেন তার মধ্যে সরাসরি হয়তো সমকালীন সময় নেই, কিন্তু তেত্রিশকোটি দেবদেবীর বিস্ফারিত সংখ্যার বিপরীতে ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ ব্রহ্ম-উপাসনালয় আসলে একটা প্রচলিত পথের বিরুদ্ধতা ছিল, তাই তার সঙ্গে সম্পর্কিত গানকেও এইভাবে দেখা যায়। অন্তত দেখলে ভুল হয় না। ব্রহ্ম-উপাসনার গানের আবহে রবীন্দ্রনাথের গানের শুরু হলেও গান নিয়ে বরাবরই তাঁর একটা স্বতন্ত্র, স্বচ্ছ ও উজানি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ফলে নিজের কবিতার মতোই গানকে তিনি নিজের আত্মপ্রকাশের উচ্চারণ হিসেবেই দেখতে থাকলেন। যদিও সমকালীন রাজনৈতিক সামাজিক স্রোত থেকে যেহেতু তিনি নিজেকে বিযুক্ত করেননি, ফলে জাতীয়তাবাদ উন্মেষের সেই উজ্জ্বল প্রত্যুষে রবীন্দ্রনাথের গান সমকাল থেকে খুঁজে নিল ধুলোমাটি, তাঁর গানের প্রতিমায় জোয়ার এল রাজনৈতিক সংকল্পের, দীক্ষার মন্ত্রের। যদিও এতকিছুর পরেও রবীন্দ্রনাথের গানে তাঁর সমকালের চাপ সচেতনভাবেই কম, কারণ তিনি অবজেক্টিভলি গানকে তাঁর নিজের মর্মস্থলের আত্মপ্রকাশের আয়োজন হিসেবেই দেখেছেন। “নিশিদিন ভরসা রাখিস হবেই হবে” বা “যদি তোর ভাবনা থাকে ফিরে যা না”-র পাশাপাশি “কী ফুল ঝরিল বিপুল অন্ধকারে” বা “ঘাটে বসে আছি আনমনা”-র মতো গান একেবারে তাঁর ভিতরের কথাই বলে, প্রত্যক্ষত যার মধ্যে সমাজতত্ত্বের ছায়া খোঁজার কোনো মানেই হয় না।
অথচ স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমিতে মুকুন্দ দাসের গান সরাসরি দেশের কথা মানুষকে জানিয়ে তাকে আলোড়িত ও প্রণোদিত করার কথাই ভাবে, সে গানের কোনো অন্তর্মুখ নেই। পরের সময়ে কাজী নজরুলের একটা পর্বের গানে আবার সেই স্বদেশবাসীকে মাতিয়ে তোলার আহ্বান – সমকালীন স্বদেশ থেকে একেবারে দু’হাত ভরে তুলে নিচ্ছেন তিনি তাঁর গানের উপাদান। কাছাকাছি সময়ে অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও রজনীকান্ত সেন সময়ে ছুঁয়ে থেকেও আবার ঢুকে পড়ছেন যে যার অন্তর্জগতে। সে পৃথিবীতে উচ্চারণ করা যায় “বঁধু, নিদ নাহি আঁখিপাতে” বা “একা মোর গানের তরী ভাসিয়েছিলেম নয়নজলে”। এই পর্যায়ে বরং তাঁরা অনেকটাই রবীন্দ্রনাথের অনুবর্তী আর এখানে সমাজচেতনা খুঁজে বেড়ানোর কোনো মানে হয় না। বাংলা কবিতার ‘আমি’-র অস্তিত্ব যেমন ধারাবাহিক স্রোতে পরিণত হতে হতে কবিতার স্থায়ী সম্পদে পরিণত হয়েছে, বাংলা গানেও সেই ‘ব্যক্তি আমি’র লিরিক এগিয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে। পাশাপাশি, গানের মধ্যে সামাজিক ও সময়ের স্রোতকে ঠাঁই দিতে তিনি অনিচ্ছুক নন, যদিও গান মানেই সামাজিক ভাবনার নির্যাস, এই দর্শনে আদৌ তার পক্ষপাত নেই।
(চলবে)
