ভারতের বৃহত্তম নদী গঙ্গা, আজও কলকাতার লাইফলাইন

“এই যে অজস্র জলধারা প্রতিদিন চলিয়া যাইতেছে ইহা তো কখনও ফিরে না; তবে এই অনন্ত স্রোত কোথা হইতে আসিতেছে? ইহার কি শেষ নাই? নদীকে জিজ্ঞাসা করিতাম ‘তুমি কোথা হইতে আসিতেছ?’ নদী উত্তর করিত, ‘মহাদেবের জটা হইতে।’ তখন ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন বৃত্তান্ত স্মৃতিপথে উদিত হইত।”

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর এই কৌতূহল এবং তাঁর ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’ প্রবন্ধটি মনে করায় গঙ্গা নদীকে ঘিরে থাকা মিথ এবং ভৌগোলিক সত্যের কথাকে। পৌরাণিক বিশ্বাস বলে গঙ্গার উৎপত্তি নাকি মহাদেবের জটা থেকে, তবে ভূগোল বলে গঙ্গা নেমে এসেছে গঙ্গোত্রী হিমবাহের গোমুখ তুষারগুহা থেকে। তারপর ২৫২৫ কিলোমিটার পথ বেয়ে তার ধারা মিশেছে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। এই দীর্ঘ পথে গঙ্গার নাম বদলেছে বারে বারে। আর তার দুই ধারে গড়ে উঠেছে হরিদ্বার, বারাণসী, প্রয়াগরাজ, পাটনার মত ঐতিহাসিক অনেক শহর। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাও এই শহরের নামের তালিকায় সংযোজিত আরও একটি নাম।

দীর্ঘ পথে গঙ্গার নাম বদলেছে বারে বারে। আর তার দুই ধারে গড়ে উঠেছে হরিদ্বার, বারাণসী, প্রয়াগরাজ, পাটনার মত ঐতিহাসিক অনেক শহর। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাও এই শহরের নামের তালিকায় সংযোজিত আরও একটি নাম।

কলকাতার পশ্চিম ধার ধরে আপনবেগে বয়ে চলা গঙ্গা এখানে হুগলি নদী। যার দুই পাড়ে হাওড়া এবং কলকাতা এই দু’টি শহর অবস্থিত। শুধু হাওড়া এবং কলকাতা নয়, হুগলি নদীর দু’ধারে নৈহাটি, চুঁচুড়া, চন্দননগর, ব্যারাকপুর, শ্রীরামপুর, খড়দহ, কোন্নগর, পানিহাটি, দক্ষিণেশ্বর, বেলুড় প্রভৃতি সমৃদ্ধ জনপদ ইতিহাসের পাতা ছুঁয়ে ব্যবসা বাণিজ্য, শিল্পসমৃদ্ধিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। মধ্যযুগের মনসামঙ্গল কাব্যের পৃষ্ঠা উল্টাতে গেলেও খুঁজে পাওয়া যায় এর মধ্যে বেশ কিছু অঞ্চলের নাম। এই পথই ছিল বেহুলার জয়যাত্রার পথ।

কিন্তু সেদিন তো ফুরিয়েছে অনেকদিন হলো। আজ যখন রেলগাড়ির কুঁ ঝিক ঝিক, আর কালো পিচের রাস্তা দূরকে নিকট করেছে, প্রযুক্তি তার অদৃশ্য জালে বেঁধে ফেলেছে সারা বিশ্বকে তখনও গঙ্গা কিভাবে সমৃদ্ধ করছে রাজ্যের রাজধানী ও তার প্রতিবেশী জনপদগুলিকে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে দেশের অন্যতম বৃহৎ জলাধার টালা ট্যাঙ্কে। কারণ, এই ট্যাঙ্ক থেকেই প্রতিদিন পাইপ লাইনের মাধ্যমে জল পৌঁছে যায় কলকাতাবাসীর ঘরে ঘরে। আর এই জলের উৎস গঙ্গা। তাই ভারতের বৃহত্তম নদীকে এক কথায় বলা যায় কলকাতার লাইফ লাইন।

শুধু তো পানীয় জল নয়, মাছ-ভাত প্রিয় বাঙালিকে মায়ের মতই ভালোবেসে আগলে রেখেছে গঙ্গা। ইতিহাস বলছে, গঙ্গার মতই বিদ্যাধরী নদী একসময় কলকাতার পূর্ব দিক দিয়ে বয়ে চলতো। তখন তার আশেপাশের অনেক অঞ্চলে মাছের চাষ ছিল প্রসিদ্ধ। বেলেঘাটা, তপসিয়া, ট্যাংরা প্রভৃতি অঞ্চল আজও নিজের নামে বয়ে বেড়ায় সেই ইতিহাস। কিন্তু কালের প্রবাহে মিলিয়ে গেছে বিদ্যাধরী। তবে কমেনি বাঙালির মৎস্য প্রেম। তাই, আজকের কলকাতাবাসীর মাছের চাহিদা পূরণ করতে প্রতিদিন ভোরবেলায় গঙ্গার পাড়গুলিতে দেখা যায় মৎস ব্যবসায়ীদের ভিড়। পূর্ব কলকাতা জলাভূমি, বা অন্যান্য জায়গা থেকে মাছ প্রতিদিন কলকাতার বাজারে পৌঁছে গেলেও মাছের খোঁজে গঙ্গার বুকে নৌকোয় জেলেদের আনাগোনা, মাছ ধরা, তারপর সেই মাছ বিরাট হাঁড়িতে করে বাজারে নিয়ে আসার দৃশ্য কলকাতার প্রাত্যহিক ছবিগুলির মধ্যে অবশ্যই অন্যতম।

আবার এই গঙ্গার পথ ধরেই প্রতিবছর কলকাতার ঘাটে ভিড়তো খড়, বাঁশের নৌকো। এই পথ ধরে এঁটেল মাটি আজও পৌঁছে যায় পালপাড়ার, কুমোরটুলির ঘরে ঘরে। শুরু হয় ব্যস্ততা, প্রতিমা বানানোর। পুজোর শেষে, উৎসব শেষে মহাসমারোহে যে প্রতিমাগুলিকে বিসর্জিত করা হয় গঙ্গার বুকে, তাদের জন্মকথাও জানে এই নদী। গঙ্গার তীরেই গড়ে উঠেছে কলকাতার কুমোরটুলি। শুধু কুমোরটুলি নয়, অন্যান্য অনেক স্থানের ‘পালপাড়ার’ ঠিকানা লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে তাদেরও অবস্থান গঙ্গার আশেপাশেই। গঙ্গার তীরেই জন্ম আবার তার বুকেই বিসর্জন এ যেন ক্ষণস্থায়ী শিল্পের সম্পূর্ণ জীবনচক্র।

হাতে কিছুটা সময় থাকলে ভোরবেলা বা বিকেলে, গঙ্গার ধারে গিয়ে বসলে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত ছাড়াও চোখে পড়ে আরো বেশ কিছু নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। উল্টো পাড়ের ধোঁয়া ওঠা চিমনি জানান দেয়, বস্ত্রশিল্প, পাটশিল্পের মত ভারী শিল্পও গড়ে উঠেছে গঙ্গার পাড় ধরে। সময়ের চাহিদায় আজ অনেক কারখানা বন্ধ হলেও সেই জমিতেই গড়ে উঠেছে বিরাট বিরাট বহুতল। আর সেই বিরাট বহুতল গুলির বিজ্ঞাপনেও গঙ্গার কাছাকাছি হওয়ার কথা উল্লেখ করায় বোঝা যায় এই নদীর সঙ্গে কলকাতাবাসী তথা বাঙালির আবেগ ঠিক কতটা!

গঙ্গাকে আবার দূষণমুক্ত ও স্বচ্ছ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও প্রচার চললেও মানুষের সুস্থ চিন্তার থেকে কার্যকর ওষুধ আর কিছুই হতে পারে না।

শুধু অর্থনৈতিক চাহিদা যোগানের সম্পর্ক নয়। গঙ্গা বয়ে চলেছে ধর্মপ্রাণ মানুষের সংস্কারের শিরা-উপশিরায়। তাঁদের কাছে পবিত্রতার আরেকটি নাম গঙ্গাজল। সেই বিশ্বাস বোতলবন্দী হয়ে বিক্রি হয় গঙ্গা থেকে দূরের দশকর্মার দোকানে এমনকী ডাক বিভাগের বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গেও। ধর্মীয় বিশ্বাস আর শিল্প মনস্কতা গঙ্গার পাড়ে নির্মাণ করেছে বহু সুদৃশ্য মন্দির, যাদের গঠনশৈলী শুধু ধর্মপ্রাণ নয় সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষদেরও টেনে নিয়ে যায় মন্দির প্রাঙ্গণে। কলকাতার এই ঘাটগুলি উনিশ শতকে নবজাগরণে সদ্য জাগ্রত বাঙালির নতুন আলো দেখার সাক্ষী। ব্রিটিশ আমলে তীর ধরেই গড়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবন। কলকাতা বন্দর আজও গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল।

চন্দ্র-সূর্যের মহাজাগতিক খেলায় দিনে দু’বার নদীতে জোয়ার-ভাটা হলেও গঙ্গা নামের বাঙালি আবেগে শুধুই জোয়ার, সেখানে ভাটার কোন অস্তিত্বই নেই। তাই চক্ররেল গঙ্গার পাড়ে পৌঁছে গেলে যাত্রীরা যে কাজেই ব্যস্ত থাকুন না কেন একবার অন্তত গঙ্গাকে না দেখে থাকতে পারেন না। আবার, নৌকায়, বা ব্রিজের উপর দিয়ে নদী পারাপার করার সময়, কিংবা হাল আমলে পাতাল রেলের মাধ্যমে গঙ্গার তলা দিয়ে হাওড়া থেকে কলকাতা বা কলকাতা থেকে হাওড়ায় যাতায়াতের সময় নীল আলো দেখলে বা জলদগম্ভীর স্বরে গঙ্গার নিচ দিয়ে ট্রেন যাওয়ার ঘোষণা শুনলে মানুষের উত্তেজনা উদ্দীপনা বেড়ে যেতে বাধ্য। কারণ শহরবাসী এবং গঙ্গা যেন একে অপরের পরিপূরক।

তবু মানুষের বিবেচনাহীন কাজকর্ম এই আবেগের জলকেই করে তুলছে দূষিত। গঙ্গা দূষণ ও তার প্রতিকার তাই দেশ জুড়ে সমস্ত শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গঙ্গাকে আবার দূষণমুক্ত ও স্বচ্ছ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও প্রচার চললেও মানুষের সুস্থ চিন্তার থেকে কার্যকর ওষুধ আর কিছুই হতে পারে না। এই ওষুধে গঙ্গা নদীর রোগ সারলে কিছুটা উপশম হবে দূষণ রোগে আক্রান্ত গঙ্গামাতৃক কল্লোলিনী আর তার প্রতিবেশী শহরগুলিরও।

Written by