সৃজনী শিল্পগ্রাম : প্রকৃতির কোলে ২৬ বিঘা জমি জুড়ে ভারতীয় শিল্পচর্চা

শান্তিনিকেতনের মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির আনন্দ নিতে কে না চায়! যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য এই মুক্তাঞ্চল আজ যাবতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে। সবুজ কমে যাচ্ছে, বাড়ছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটবাড়ি। তবে শান্তিনিকেতনের রাস্তা ধরে হাঁটলে বোঝা যায় রতন পল্লি, গুরুপল্লি, পূর্বপল্লি, শমীন্দ্র পল্লি, সুরশ্রী পল্লি, ইন্দিরা পল্লি, উদয়ন পল্লি, শান্তিপল্লির আদি বাসিন্দারা এখনও চিরসবুজ। ঘন বর্ষায় বৃষ্টি নামলে আজও শান্তিনিকেতনের আকাশজুড়ে ছেয়ে আসে, “চমকে চমকে সহসা দিক উজলি/ চকিতে চকিতে মাতি ছুটিল বিজলি/ থরহর চরাচর পলকে ঝলকিয়া/ ঘোর তিমিরে ছায় গগন মেদিনী”…। এ গান দুকূল জুড়ে সবুজ ছাড়া গাওয়া যায় না। শান্তিনিকেতন বলতেই পর্যটকদের চোখে ভাসে বিশ্বভারতী প্রাঙ্গন, আম্রকুঞ্জ, ছাতিমতলা, ভুবনডাঙার মাঠ, সোনাঝুরি আর নির্জন প্রান্তিক স্টেশনের কথা। এই শান্তিনিকেতনেই রয়েছে আরেক গন্তব্য। সৃজনী শিল্পগ্রাম। ঘটনাচক্রে এই শিল্পগ্রামের কথা আজও অনেকেই জানেন না।


কেন্দ্র সরকারের অনুদানপ্রাপ্ত পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্রের অন্তর্গত এই সৃজনী শিল্পগ্রাম, শিল্পপ্রেমীদের কাছে বেঁচে থাকার রসদ। এই শিল্পগ্রাম নির্মাণ করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির শিল্প-জীবনধারা-সাহিত্যকর্ম সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা। শুধুমাত্র একটা শিল্পগ্রাম তৈরি করাই নয়, গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সিকিম, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, ত্রিপুরার মতো উত্তর-পূর্ব ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জীবনগাথা।

ইস্টার্ন জোনাল কালচারাল সেন্টার (Eastern Zonal Cultural Centre) অর্থাৎ পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্র-এর সাংস্কৃতিক প্রয়াস এই সৃজনী শিল্পগ্রাম। প্রায় ২৬ বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত এই শিল্পগ্রাম। ইজেডসিসি-র অন্তর্গত নয়টি সদস্য-রাজ্যগুলির শিল্প ও সম্ভাবনা তুলে আনা হয়েছে নয়টি পৃথক কুঁড়েঘরের মধ্যে। অর্থাৎ জাদুঘরগুলি কুঁড়েঘরের আকারে তৈরি করা হয়েছে। শিল্পকে সম্মান জানাতে প্রত্যেকটি মিউজিয়ামের বাইরে লেখা রয়েছে, ‘অনুগ্রহ করে জুতো খুলে প্রবেশ করুন’। এই নয়টি ঘরের বাইরের দেওয়াল, উপরের ছাউনি, এমনকি ঘরের ভিতরের স্থাপত্যের নকশা চোখ জুড়নো। রয়েছে লোকচিত্রের প্রদর্শশালা আদি বিম্ব। এছাড়া আদি ক্রান্তি নামে একটি উদ্যানে পূর্ব ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহী নেতাদের (বিরসা মুণ্ডা, লক্ষ্মণ নায়ক, রানি গাইদিনলু, সিদ্ধু কানু, তিলকা মাঝি এবং তিরোত সিং) শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। প্রত্যেকটি কুঁড়েঘরে রয়েছে এক হাজারেরও বেশি প্রত্নবস্তু সংগ্রহ।

সূত্র মারফত জানা যায়, বীরভূমের বোলপুরে এই শিল্পগ্রাম তৈরির কারণ ছিল প্রতি সপ্তাহে কুড়ি হাজারেরও বেশি দর্শনার্থী এবং তুলনামূলক অল্প বায়ুদূষণ। বিশ্বভারতীর কলাভবন থেকে দুই কিলোমিটার ব্যবধানেই রয়েছে সৃজনী শিল্পগ্রাম। প্রবেশের মাথাপিছু খরচ মাত্র কুড়ি টাকা। বিশ্বভারতীর অধ্যাপক ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছাত্রদের একটা বড়ো অংশ এখানে নিয়মিত যান। বোলপুর ছাড়াও বীরভূমের নিকটবর্তী প্রত্যন্ত গ্রামের নানান স্কুলের ছাত্রছাত্রী, এমনকি বিহার-ঝাড়খণ্ডের বহু পড়ুয়াদের নিয়ে আসা হয় এই শিল্পগ্রামে। শিল্পগ্রামের এক কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিকিট বিক্রির মাধ্যমে গড় আয় হয় প্রায় পনেরো লক্ষ টাকা। শুধু তাই নয়, বীরভূমের মানুষদের তৈরি সাজ-পোশাক, ঘর সাজাবার সামগ্রীও শিল্পগ্রামের এক অংশে বিক্রি করা হয়। পর্যটকদের জন্য তৈরি করে দেওয়া হয়েছে আখড়া। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাউলরা এখানে নিয়মিত গান করে পর্যটকদের মনোরঞ্জন করেন।

১৯৯৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর সৃজনী শিল্পগ্রাম উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ.ডি. দেবগৌড়া এবং পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর কে.ভি. রঘুনাথ রেড্ডি। রাঢ়বঙ্গের প্রায় হারিয়ে যাওয়া নানান লোকগান-নৃত্য যেমন ভাদু, ভাঁজো, চদর বদর-কে স্থান দেওয়া হয়েছে নানান ইন্সটলেশনের মাধ্যমে। সৃজনী শিল্পগ্রামের গবেষণা অনুযায়ী চদর বদর গ্রাম্যজীবনের লোকশিক্ষার অন্যতম মাধ্যম এই পুতুল নাচ। চদর বাঁধনি, সাঁওতাল ভাষায় একে বলা হয় চদর বদর। একপায়া কাঠের স্ট্যান্ডের ওপর ভর করে থাকে একটা বক্স। সেটারই তিন দিক ঘিরে থাকে চাদরে। শাড়ি দিয়ে মোড়া থাকে ধামসা মাদল সহযোগে সাঁওতালি নারী-পুরুষের সারিবদ্ধ পুতুলের দল।

বিশ্বভারতীর কলাভবন থেকে দুই কিলোমিটার ব্যবধানেই রয়েছে সৃজনী শিল্পগ্রাম। প্রবেশের মাথাপিছু খরচ মাত্র কুড়ি টাকা। বিশ্বভারতীর অধ্যাপক ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছাত্রদের একটা বড়ো অংশ এখানে নিয়মিত যান।


এই শিল্পগ্রাম নির্মাণ করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির শিল্প-জীবনধারা-সাহিত্যকর্ম সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা। শুধুমাত্র একটা শিল্পগ্রাম তৈরি করাই নয়, গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সিকিম, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, ত্রিপুরার মতো উত্তর-পূর্ব ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জীবনগাথা।

সৃজনী শিল্পগ্রামের অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য একটি লোহার দুর্গামূর্তি। লোহার ভাঙাচোরা দিয়ে দুর্গার মূর্তি তৈরি করে তাক লাগিয়েছেন বীরভূমের শিল্পীরা। পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্র একটি কর্মশালার আয়োজন করে।‌ ‘ওয়েস্ট টু ওয়ান্ডার’ শীর্ষক ওই কর্মশালায় ফেলে দেওয়া লোহা লক্কড়, টিনের পাত, ড্রাম, কড়াই, শিকল দিয়ে দুর্গার মূর্তিটি নিখুঁতভাবে তৈরি করেন শিল্পীরা। প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার ওই মূর্তি তৈরি করেন বোলপুর ও সিউড়ির পাঁচশিল্পী।

অযথা চাকচিক্য নেই, প্রকৃতিকে নিয়েই প্রকৃতির কোলে সারিবদ্ধ আম, নারকেল, সুপুরি গাছে ভরা; শান বাঁধানো পুকুরঘাট, তাতে ফুটে থাকা শাপলা সমস্ত রুক্ষতাকে ভুলিয়ে দিয়ে প্রাণের সঞ্চার করবে। এবং অবশ্যই আগামী প্রজন্মের জন্য নিজেদের শিকড় ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে সৃজনী শিল্পগ্রাম বিশেষ ভাবে সহায়তা করবে, আশা করা যায়।

__
ছবি: সুমন সাধু

Written by